রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

যাপনের না চাওয়া ভুলগুলো

আপডেট : ০৬ মে ২০২২, ১১:১৬ পিএম

খাবারে অনাগ্রহ, ফাস্টফুডে আসক্তি, অনিদ্রা, সকালে ঘুম থেকে উঠতে না পারা, ওবেসিটি, ইন্টারনেট আসক্তি, পরিবারের সঙ্গে সময় না কাটানো এগুলো আজকাল অনেকেরই চেনা সমস্যা। এর ফলাফল দূরত্ব বা ভুল বোঝাবুঝির শিকার হওয়া। এসব সমস্যা থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবেন তা জানা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

দেরিতে ঘুম ও দেরিতে ওঠা

শরীর ও মন সতেজ রাখতে দরকার পর্যাপ্ত ঘুম। ঘুম শরীরের আরাম ও মনের শান্তির চাবিকাঠি। রাতে ঠিকঠাক ঘুম না হলে পরদিন সকালে শরীর ম্যাজম্যাজ, মেজাজ খারাপ, মাথা ঠিকমতো কাজ করে না, রোজকার কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। এর কারণ রাতে ভালো ঘুম না হলে শরীর এবং মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় বিশ্রাম পায় না। ফলে কার্যক্ষমতা কমে যায়। প্রয়োজনীয় ঘুমের সময় নির্ভর করে একজন মানুষের বয়স, শারীরিক সুস্থতা, সারা দিন তিনি কতটা পরিশ্রম করছেন তার ওপর। সাধারণভাবে সাত ঘণ্টা ঘুম একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু অনেক পরিবারে এমন একজন দুজন আছেন যারা মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকেন এবং খুব দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন। যার ফলে দিনের অনেকটা সময় তাদের চলে যায়। এর প্রভাব পড়ে শরীর ও মনে।

আবার অনেকে আছেন দিনে ৩০ মিনিটের মতো ঘুমিয়ে নেন। ফলে শরীর ও মন সতেজ হয়, মেজাজ ভালো থাকে এবং কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে। তবে দিনের এই ঘুম কিন্তু আমাদের রাতের ঘুমের পরিপূরক নয়। রাতে যে সাত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। ভালো ঘুমের জন্য কিছু নিয়মও মেনে চলতে হবে। ঘুমানোর আগে ভারি, তৈলাক্ত মসলাদার খাবার খাওয়া যাবে না। ক্যাফেইন অর্থাৎ চা-কফি ও নিকোটিন জাতীয় দ্রব্যও এড়িয়ে চলতে হবে।

এ ছাড়া ঘুমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা দরকার। শোয়ার ঘরের তাপমাত্রা যেন খুব কম বা বেশিও না হয়। ঘুমের পোশাক যেন আরামদায়ক কাপড়ের এবং ঢিলেঢালা হয়। বিছানার চাদর, বালিশের কভারের ফেব্রিকস যেন আরামদায়ক হয়। উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলা । টিভি, সেলফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি যন্ত্রপাতি ঘুমের ৩০ মিনিট আগে বন্ধ বা বিছানার আশপাশে না রাখা। এসব ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। এ ছাড়া একটা বেডটাইম রুটিন গড়ে তোলা। রোজ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমতে যাওয়া ও ওঠা দরকার। সপ্তাহান্তে বা অন্যান্য ছুটির সময় নানা কারণে আমাদের ঘুমাতে যেতে দেরি হয়ে যায়। এটা না করাই ভালো। অভ্যাসে ছেদ পড়ে।

খাবারে অনাগ্রহ

তরুণদের মধ্যে ডায়েট করার প্রবণতা থাকে। আর ডায়েট মানেই তো এটা খাবেন না, ওটা বাতিল। ওজন কমাতে, ঠিক রাখতে কিংবা ওবেসিটি এড়াতে স্বাভাবিক নিয়মে ডায়েট করতে হতে পারে। ওজন কমানোর সঙ্গে না খেয়ে থাকার কোনো যোগাযোগ নেই। বরং সঠিক খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ফাস্টফুড খাওয়া যেমন কমাতে হবে, তেমনি কিছু খাবারে বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। সঠিক কার্বোহাইড্রেট খাওয়া জরুরি। কারণ এতে থাকে কম ক্যালরি অথচ পেটভর্তি থাকে অনেকক্ষণ। সঙ্গে মেটাবলিজমও বেড়ে যায়। রেস্তোরাঁয় বা বাইরে খেতেই পারেন।

ওজন কমাতে ক্র্যাশ ডায়েট করলে নিজের ক্ষতি হয়। ওজন অত্যধিক বেড়ে গেলে হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিস, ক্যানসারের মতো অসুখ হতে পারে। ওজন কমানোর জন্য ভরসা ফাইবার আর প্রোটিনের যথাযথ অনুপাত, তাহলে ওজন কমবেই। পাশাপাশি একবেলার খাবার বাদ দিলে শরীরে সুগার লেভেল কমে যায়। ফলে হঠাৎ প্রচণ্ড ক্ষুধা পায়। এর ফলে বিঞ্জিং আর জাংকফুড খাওয়ার চাহিদা তৈরি হয়। মোটামুটি খাওয়ার দুই ঘণ্টা পর ব্লাড সুগার লেভেল আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে। তাই দিনে অন্তত ৪টি ছোট ছোট মিল খাওয়া আবশ্যক। ব্রেকফাস্ট (ঘুম থেকে ওঠার পর এক ঘণ্টার মধ্যে), লাঞ্চ, স্ন্যাক আর ডিনার (প্রতিটি খাবারের মধ্যে ৪-৫ ঘণ্টার গ্যাপ থাকতে পারে, তার বেশি কখনোই নয়।)

প্রতিদিন ব্যায়াম

সুস্থ থাকতে ব্যায়ামের বিকল্প নেই। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই মাত্র পাঁচ মিনিটের ফিটনেস রেজিম মেনে চললেই দিব্যি তরতাজা থাকা যায়। বিছানাতেই শুরু করা যেতে পারে ব্যায়াম। প্রত্যেকদিন সকালে উঠে ক্যালরি বার্ন করা থেকে শুরু করে ব্যথার উপশম, এনার্জি বুস্ট করা এবং সতেজ এবং অ্যালার্ট থাকা সম্ভব হবে এই পাঁচ মিনিটের এক্সারসাইজে। এই পাঁচ মিনিটের এক্সারসাইজে আপনি যা করতে পারেন তা হলো ওভারহেড স্ট্রেচ, নি টু চেস্ট স্ট্রেচ, হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেচ, নি রোলস, ট্রাংক রোটেশন ও চেস্ট স্ট্রেচ। এর ফলে বিছানা থেকে ওঠার আগেই তরতাজা মন আর শরীর তৈরি হয়ে যাবে। সব কটি এক্সারসাইজে কিন্তু ব্রিদিং ঠিকভাবে হওয়া জরুরি। এ ছাড়া যারা খুব বেশি সময় বসে কাজ করেন তারা প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার চেষ্টা করুন। সপ্তাহে অন্তত তিনদিন সাইকেল ও সাঁতারও কাটতে পারেন। এ ছাড়া মেডিটেশনও করাও জরুরি।

জাংক ফুড

ফাস্টফুড শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। জাংক ফুডের প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা ক্যালরির হিসাব কষতে বলি। অথচ আমরা হয়তো অনেকেই জানি না এ ধরনের খাবার আর্লি এজিংয়েরও অন্যতম কারণ। আধুনিক জীবনযাত্রায় বাড়তি ওজনের সমস্যায় নাজেহাল অনেকেই। ওজন ক্রমেই বাড়তে থাকলে শুধু যে দেখতে খারাপ লাগে তা-ই নয়, বাড়তি ওজনের সঙ্গে বয়স বাড়ার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এ ধরনের খাবার সময়ের আগেই চেহারায় বয়সের ছাপ ফেলে। সুস্থ থাকা এবং চেহারায় তারুণ্য ধরে রাখার জন্য খাবার নির্বাচন যতটা জরুরি, খাবার খাওয়ার অভ্যাসও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে আছেন টিভি দেখতে দেখতে ডিনার করেন। এর ফলে ওজন বাড়ে। টিভি দেখতে দেখতে খাওয়ার সময় মন থাকে টিভির দিকে। ফলে অজান্তেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাওয়া হয়ে যায়। সিনেমা কিংবা খেলা দেখতে দেখতে চিপস, কোল্ড ডিংকস, পপকর্ন খাওয়া তো আছেই। দৈনন্দিন জীবনে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এ রকম কিছু বিশেষ অভ্যাসের কারণে ওজন বাড়তে থাকে, এর সঙ্গে যোগ হয় অসময়ে বলিরেখা, শুষ্ক ত্বক, ডার্ক সার্কল, পাকা চুলের মতো সমস্যা। অথচ খাবার নির্বাচন এবং খাওয়া-দাওয়ার কিছু অভ্যাস বদলে ফেললেই কিন্তু এ সমস্যাকে সহজেই দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব। পছন্দের খাবার খান, কিন্তু কখন খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, কীভাবে খাচ্ছেন এগুলো যদি একটু মাথায় রাখেন তাহলে কিন্তু সঠিক ওজন বজায় রাখা এবং তারুণ্য ধরে রাখা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। জেনে রাখুন অতিরিক্ত ফাস্টফুড চেহারায় খুব তাড়াতাড়ি বয়সের ছাপ ফেলে। আসলে ফাস্টফুডে বেশিমাত্রায় ট্রান্স ফ্যাট থাকে। এই ট্রান্স ফ্যাট শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারক। ডিপ ফ্রায়েড খাবারে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ থাকে সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের খাবার বেশি খেলে শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর ক্ষতি হয়, ফ্রি র‌্যাডিকেলের আধিপত্য বাড়ে, যা কি না দ্রুত চেহারায় বয়সের ছাপ ফেলে। তাই বলে ফাস্টফুড বাদ দিতে হবে তা নয়। খাবেন, কিন্তু বুঝেশুনে। বাইরে খেতে গেল সব সময় ভাজাভুজি না খেয়ে কখনো স্যান্ডউইচ, সালাদ বা হেলদি স্যুপ খেতে পারেন। তাহলে সমস্যা এতটা প্রকট হয়ে উঠবে না। অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার ত্বকেরও নানা রকম ক্ষতি করে। তাই কোমলপানীয় ও চিনি যতটা সম্ভব কম খান। চিনির পরিবর্তে মধু, ফলের রস খেলে উপকার হবে। সকালে ভারী নাস্তা করুন। ১-২ ঘণ্টা পর একটা ফল খান। দুপুরে লাঞ্চ করুন। বিকেলে ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে হালকা নাস্তা খেতে পারেন। রাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডিনার করে নিন। ৯টার মধ্যে ডিনার করতে পারলে খুব ভালো হয়। সেটা যদি সম্ভব নাও হয় তাহলে চেষ্টা করুন বাড়ি এসে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিতে। এতে হজমও ভালো হবে।

ইন্টারনেট আসক্তি

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকলেও চলবে না এ কথা অনস্বীকার্য। ইন্টারনেট দৈনন্দিন জীবনটা অনেক সহজ করে দিয়েছে। যেকোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, অবসর কাটাতে, প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডায় কিংবা ভার্চুয়াল জগতের খোঁজ নিতে ইন্টারনেটের বিকল্প নেই। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন প্রায় প্রত্যেকেই অবসরযাপনের অনেকটা সময়ই ব্যয় করি ইন্টারনেটে বুঁদ থেকে। তা সে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, স্মার্টফোন যাই হোক না কেন। যার ফলে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। ইন্টারনেটে আসক্তি কাটানোর ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যতটা সম্ভব মোবাইলের ব্যবহার কমানো। ক্লাস বা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। আপনি কতক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন তার একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে নিন। সবাইকেও জানিয়ে রাখুন একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর তাকে অনলাইনে যেন না খোঁজে। অতি জরুরি না হলে ফোন না করতে। মোটকথা ইন্টারনেট ব্যবহারে একটা রুটিন মেনে নিন। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

পরিবারের সঙ্গে সময়

যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, দিনের কোনো একটা সময় পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটান। সকালের নাশতা কিংবা রাতের খাবারটা পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়ার চেষ্টা করুন। সেখানে সারা দিনের গল্প করুন। এ সময়টুকু মোবাইল, ব্যক্তিগত কাজ করা থেকে দূরে থাকুন। এতে পরিবারের সবার সঙ্গে সুন্দর বন্ডিং গড়ে উঠবে। দীর্ঘ সময় এক নাগাড়ে কাজের ফলে পরিবার, প্রিয়জনকে সময় দেওয়ার মতো সময় থাকে না বহু মানুষের হাতে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যক্তিগত জীবন। তাই পরিবার, প্রিয়জনদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই ছুটি কাটাতে কাছে পিঠের কোথাও যেতে পারেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত