রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না মা-বাবা

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৩২ এএম

আইন আছে মা-বাবাকে দেখতে হবে। তাদের ভরণপোষণ করতে হবে। আইনটি বহুল আলোচিত। কিন্তু আলোচিত হলেও আইনটির কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। আইনটির রয়েছে নানা ফাঁকফোকর। এসব ফাঁকফোকর দিয়ে বাবা-মায়ের ‘দুষ্টু’ ছেলেরা পার পেয়ে যায়।

২০১৩ সালে পিতা-মাতার ভরণপোষণের আইন করে সরকার। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আইনটি হয়। এত দিন হয়ে গেলেও আইনটি কার্যকর করা যায়নি কেনজানতে চাইলে কর্মকর্তা, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা জানান, আইনটির প্রধান সমস্যা হচ্ছে ভরণপোষণের দাবিতে সন্তানের বিরুদ্ধে বাবা-মাকেই মামলা করতে হবে। অন্য কারও অভিযোগ আমলে নেওয়া যায় না। দেশের সামাজিক মূল্যবোধ অনুযায়ী, সন্তানের বিরুদ্ধে মা-বাবা সাধারণত মামলা করেন না। ভরণপোষণের প্রশ্ন তখনই আসে, যখন তারা কর্মক্ষমতা হারান। ওই সময় বৃদ্ধ মা-বাবাই সন্তানের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন। এ অবস্থায় আদালতে মামলা করা অনেক সাহস ও সামর্থ্যরে ব্যাপার। তাই বৃদ্ধ বয়সে তাদের পক্ষে মামলা করা সম্ভব হয় না। ছেলের স্ত্রীকে ভরণপোষণের দায়িত্বের বাইরে রাখা হয়েছে। অথচ অনেক পরিবারে স্ত্রীদের অশান্তি সৃষ্টির জন্য দায়ী করা হয়। আইনটি কার্যকর করতে হলে ছেলের স্ত্রীকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আইনটি যথাযথভাবে কার্যকর করার জন্য বিধিমালাও প্রয়োজন। অথচ আইন প্রণয়নের ৯ বছর পরও এর বিধিমালা হয়নি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধিমালার কাজ চলছে। আশা করি শিগগিরই হয়ে যাবে। ভেটিংয়ের (আইনি মতামত) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

গত ৯ বছরেও কেন হয়নি জানতে চাইলে সচিব বলেন, ‘করোনার কারণে অনেক কাজই আটকে ছিল। এই বিধিমালার অনেক স্টেক হোল্ডার (অংশীজন)। তাদের সঙ্গে বৈঠক করা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হলে আইন মন্ত্রণালয় থেকেও অনেক সংযোজন-বিয়োজনের পরামর্শ দেওয়া হয়। মোটকথা, বিধিমালা না হলেও কাজের প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিল।’

আইনে বলা আছে, প্রত্যেক সন্তানকে মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভরণপোষণের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন তারা। প্রত্যেক সন্তানকে মা-বাবাকে নিয়ে একই স্থানে বসবাস করতে হবে। কোনো সন্তান মা-বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও আলাদাভাবে বসবাসে বাধ্য করতে পারবেন না। প্রত্যেক সন্তান মা-বাবার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেবেন। তাদের চিকিৎসাসেবা বহন করবেন ও পরিচর্যা করবেন। মা অথবা বাবা আলাদা বসবাস করলেও সন্তানকে খোঁজ নিতে হবে। আইনে মা-বাবার অবর্তমানে দাদা-দাদি, নানা-নানির ভরণপোষণের কথাও বলা হয়েছে। আইনের এসব বিধান মানা সন্তানদের জন্য বাধ্যতামূলক। না মানলে বাবা-মায়েরা ভরণপোষণের দাবিতে আদালতে মামলা করতে পারবেন। দোষী সাব্যস্ত হলে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৩ মাসের কারাদন্ডের বিধান আছে। ভরণপোষণবিষয়ক এ মামলা আপস ও জামিনযোগ্য। আর মামলা হবে আদালতে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভরণপোষণের আইনটি একটি ব্যতিক্রমী ও অস্বাভাবিক আইন। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এ ধরনের আইনের নজির পাওয়া যায় না। দুঃখজনক হলেও আমাদের দেশে এ ধরনের একটি আইন করতে হয়েছে। আমাদের দেশে বাবা-মায়েরা জন্মের পর থেকে লেখাপড়া ও স্বনির্ভর হওয়া পর্যন্ত সন্তানদের সমর্থন দিয়ে যান। তারপরও বৃদ্ধ বয়সে অনেক পিতা-মাতা অনাদর আর অবহেলায় থাকেন। কোথাও কোথাও তারা নির্যাতনেরও শিকার হন। উন্নত বিশ্বে সন্তানদের ১৮ বছর হলেই বাবা-মায়ের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা আছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইনবিদ শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও। রাষ্ট্র তা কতটা করছে, সেটাও দেখতে হবে। পিতা-মাতা বা সিনিয়র সিটিজেনদের (বয়স্ক নাগরিকদের) ভরণপোষণের জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে উদ্যোগী হতে হবে।’

আইন প্রণয়নের পর থেকে এ পর্যন্ত একটি মামলার খবর জানেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। মামলাটি হয় ২০১৭ সালে কক্সবাজারে। এরপর আর কোনো মামলার খবর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পাননি। কিন্তু মা-বাবাকে ভরণপোষণ না করার খবর তারা হরদম পান। বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। করোনা মহামারীতে অসুস্থ পিতা-মাতাকে জঙ্গলে, অচেনা জনপদে ফেলে আসা হয়েছে। 

আইনজীবী মনজিল মোরশেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনের চেয়ে বেশি দরকার সামাজিকভাবে বিষয়টি সুরাহা করা। আইন করে পারিবারিক শান্তি আনা যায় না। ছোটবেলা থেকেই মূল্যবোধ শেখাতে হবে। সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এ ধরনের আইনের প্রয়োজন হবে না। আইন আছে অথচ মামলা হয় নানিশ্চয়ই এর ভেতর সমস্যা আছে। তা না হলে আইন প্রণয়নের এত বছরে মাত্র একটি মামলা হলো কেন। এসব সমস্যার সমাধান করে আইনটির ব্যাপক প্রচার দরকার।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, যেকোনো অবস্থাতেই পিতা-মাতাকে ভরণপোষণ করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় চলবে না। কিন্তু বিষয়টি ঘটছে এবং দিন দিন বাড়ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আসছে। তারা অনেক অভিযোগ পান। কিন্তু তাদের কিছু করার এখতিয়ার আইনে নেই। ভরণপোষণ না দিলে পিতা-মাতাকে আদালতে যেতে হবে। কিন্তু তারা আদালতে যেতে চান না। শত অপরাধ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত