বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ধর্মঘটের অধিকার প্রতিবাদের অধিকার

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৬ পিএম

দাবি আদায়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মানুষের সংগঠিত হওয়া, প্রতিবাদ জানানো কিংবা ধর্মঘট অন্যতম গণতান্ত্রিক অধিকার। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেখানে শোষণ-বঞ্চনা ও শ্রেণি বৈষম্য প্রকট, সেখানে এই অধিকারকে সংকুচিত করার সুযোগ নেই। এসবে জনভোগান্তি তৈরি হলেও অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায্য দাবি আদায় ও অন্যায়ের প্রতিবাদে কর্মবিরতি, হরতাল, ধর্মঘটের মতো চূড়ান্ত কর্মসূচিতে যাওয়া ছাড়া উপায়ও থাকে না। তবে অনেক সময় এসব কর্মসূচি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে ভিন্ন কোনো মহলের স্বার্থকে হাসিল করতে দেওয়া হয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘খর্ব হচ্ছে ১৯ সেক্টরে ধর্মঘটের অধিকার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এসব সেক্টরে ধর্মঘট, লে-অফ, লকআউটের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা আইন, ২০২২’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে জনজীবন ব্যাহত হয়এমন কোনো ক্ষেত্রে ইচ্ছা করলেই আর ধর্মঘট বা হরতাল ডাকা যাবে না। নতুন আইনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি সরকারের কাছে আবেদন করে নিজেদের অত্যাবশ্যকীয় সেবায় যুক্ত করতে চায়, তাহলে তারা সেই সুযোগ পাবে। অর্থাৎ বেসরকারি যেসব বন্দর আছে বা তৈরি পোশাক খাতও নিজেদের অত্যাবশ্যকীয় সেবা ঘোষণা করে এর আওতায় আসতে পারবে। 

কর্মসংস্কৃতি বলতে একটি বিষয় আছে। গুরুত্ব বিবেচনায় অনেক পেশার সঙ্গেই থাকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের শর্ত, অনেক ক্ষেত্রে বাঁচা-মরার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। ফলে সব পেশায় চাইলেই সেবাদান বন্ধ করা যায় না। অন্যদিকে ন্যায্য দাবি আদায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর অধিকার সব শ্রেণির সব পেশার মানুষেরই রয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশে জরুরি সেবা খাতে এ ধরনের কর্মসূচি কালেভাদ্রে দেওয়া হয় বলেই দেখা যায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশে ‘জরুরি সেবা’ সংশ্লিষ্ট খাতে হরহামেশা ডেকে বসা কর্মবিরতি, ধর্মঘট ও এর ফলে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, এসব কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্টদের দাবিদাওয়ার চাইতে জনভোগান্তির চিত্রই বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। এতে একদিকে মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামের অধিকার অন্যদিকে জনগণের জরুরি সেবা পাওয়ার অধিকার উভয়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে মূলত কায়েমি কোনো স্বার্থ হাসিল করা হয় বলে প্রতীয়মান।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অনেকবার বলেছে বাংলাদেশের শ্রম আইন দুর্বল। বিভিন্ন খাতের শ্রমিক শোষণ ও তাদের বঞ্চনার কথা আমাদের সবারই জানা। বিভিন্ন সময় যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্যই তাদের পথে নামতে হয়। অত্যাবশ্যক পরিষেবা আইন পাস হলে শ্রম আইন আরও দুর্বল হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের কর্মসূচিকে সামনে রেখে দেওয়া পরিবহন ধর্মঘটে সৃষ্ট দুর্ভোগকে ‘রাজনৈতিক জনভোগান্তি’ বলে মনে করারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একপক্ষ বলছে, বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়, নিজেদের নিরাপত্তা ও দাবিদাওয়া আদায়ে বাস ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। অপরপক্ষ বলছে, মালিক ও শ্রমিকের নাম দিয়ে ধর্মঘটের কথা বলা হলেও এর সঙ্গে সরকারই সম্পৃক্ত। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব ধর্মঘটে বিআরটিসি বাসও বন্ধ ছিল। রাজনীতি বিশ্লেষক ও যাত্রী কল্যাণে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপির আমলেও এ ধরনের কর্মসূচি দেখা গেছে। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবেএ কথা সবাই বলেন, কিন্তু রাজনৈতিক সমাবেশ এবং পরিবহন ধর্মঘটের ঘটনা যে ঘটেই চলেছে তা দেশের মানুষকে কী বার্তা দেবে? ক্ষমতা দেখানোর এই সংস্কৃতির অবসান হবে? অন্যদিকে, স্বজনের মৃত্যুতে চিকিৎসক ও হাসপাতালের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনা এবং এর প্রতিবাদে চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে যাওয়াসহ অ্যাম্বুলেন্স চালক ও নার্সদের ধর্মঘটের খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। এ ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের ক্ষমতা প্রদর্শনের সংস্কৃতি যেমন দায়ী, তেমনি জরুরি ও বিশেষ মুহূর্তে অসহায় মানুষের অভিযোগ জানানোর সুযোগের অভাবও দায়ী। সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। একদিকে প্রকট শ্রেণি বৈষম্য, শ্রমিক শোষণ, অন্যায্য মজুরি; অন্যদিকে মালিক-কর্তৃপক্ষের স্বার্থপরতা, পেশাজীবীদের যূথবদ্ধ স্বার্থ ও সর্বোপরি অপরাজনীতি। ফলে অত্যাবশ্যক পরিষেবার নামে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার ও ধর্মঘট করার গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেবল আইন করে হবে না, সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিভিন্ন সেবা খাতের পেশাজীবী, মালিক-শ্রমিক এবং সেবা গ্রহীতা জনগণের মধ্যে সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অর্জনেও সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চিত সংস্কৃতি বড় প্রভাব রাখে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত