বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অনড় নেতৃত্বে অগতি

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২২, ০২:৪৭ এএম

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে দেশের বামপন্থি দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। এসব আন্দোলনের ক্ষেত্রে বামপন্থিরা কখনো প্রকাশ্য আবার কখনো নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। ইতিহাসের বাঁকবদলের এসব আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, মোহাম্মদ ফরহাদদের মতো বাম ও উদারপন্থি নেতার আবির্ভাব ঘটেছে। এখনো রাশেদ খান মেনন, আব্দুর রব, হাসানুল হক ইনুর মতো নেতা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি তৈরি হয়েছে, যারা বাম আন্দোলনকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এমন আলোচনা আছে রাজনৈতিক মহলে।

এমনও আলোচনা আছে যে, ঘুরে ঘুরে দুই-একজন নেতার হাতে দলের নেতৃত্ব থাকায় দলীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

দেশের সব আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুরদের অবদান সবসময়ই বেশি ছিল। এই সংগঠনগুলোতে বামপন্থিদের প্রভাব থাকায় একদিকে আন্দোলন যেমন বেগবান হয়েছে তেমনি বামপন্থি দলগুলোও জনগণের কাছাকাছি যেতে পেরেছিল। বর্তমান সময়ে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। দেশে কৃষক-ক্ষেতমজুরদের কোনো কার্যকর আন্দোলন নেই, শ্রমিক সংগঠনগুলো পুরোপুরি আওয়ামী-বিএনপির দখলে চলে গিয়েছে। এইসব পেশাভিত্তিক গণ-সংগঠনগুলোই ছিল বামপন্থি দলগুলোর জনগণের মধ্যে কাজ করা এবং প্রভাব বিস্তার করার মূল মাধ্যম। ফলে কোনো গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না দলগুলো।

বামদলগুলোর নেতারা মনে করেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পরে দেশের বাম রাজনীতিতে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা আসেননি। যারা রয়েছেন তাদের মধ্যেও  দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই নিজেদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতার স্বাদ পেতে জোট করেছেন ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর সঙ্গে। এ নিয়ে দলগুলোর ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা আছে। বড় কথা বাম দলগুলো সাংগঠনিক শক্তি হারাচ্ছে। জনগণের মনোযোগও আর আকর্ষণ করতে পারছে না।

সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাম দলের নেতৃত্ব তৈরি হয় শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের বামপন্থিরা এটা ভুলে গেছে। শ্রেণিসংগ্রাম তো সমাজের চালিকাশক্তি, কিন্তু সেই শ্রেণিসংগ্রামই নেই। বর্তমানে বামপন্থিদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। তাদের যে পথ, সেখান থেকে তারা সরে আসছে। ঐতিহ্যকে ধারণ করে আন্দোলন-সংগ্রাম অগ্রসর করেনি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সারা বিশ্বেই বাম রাজনীতি হোঁচট খেয়েছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একটা গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পরিবর্তন আসা উচিত। বিশেষ করে বাম দলগুলোতে নেতৃত্বের এই পরিবর্তন অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। কিন্তু তা না হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পদ-পদবি আগলে ধরে রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বামদলগুলো ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাম রাজনীতির সফলতা নির্ভর করে নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও সততার ওপর।

বাম দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২৮ বছর ধরে দেশের অন্যতম বড় বামপন্থি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। অন্যদিকে, ৩৬ বছর আহ্বায়ক এবং পাঁচ বছর সাধারণ সম্পাদক, সব মিলিয়ে গত ৪১ বছর ধরে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতৃত্বে ছিলেন খালেকুজ্জামান। সম্প্রতি কংগ্রেসের মাধ্যমে দুই দলের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

একই অবস্থা ১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির। দলটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ৩৭ বছর ধরে মূল নেতৃত্ব রয়েছেন। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাসানুল হক ইনু ৩৫ বছর ধরে নেতৃত্বে রয়েছেন। গত বছর নেতৃত্ব জটিলতায় দলটি আবারও ভাঙনের মুখে পড়ে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব ৩৭ বছর, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ৃয়া ৩৪ বছর ধরে নিজ নিজ দলের নেতৃত্বে আছেন।

বাসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ সময় বিশেষ চাহিদা বা প্রয়োজন দেখা দেয়। তার ভিত্তিতে নেতৃত্ব সেভাবে সংগঠিত হওয়া দরকার। যদি কেউ  সেটা অনুসরণ না করে তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার শুধুমাত্র নিয়ম করে পরিস্থিতি না বুঝে দলের নেতৃত্ব অদল-বদল করলে দলের অগ্রগতি হয় না। আবার প্রয়োজনের তাগিদে সাড়া না দিয়ে শুধুমাত্র একই নেতৃত্ব বহাল থাকলেও দল বা আন্দোলন অগ্রসর হয় না।’ তিনি বলেন, ‘এটা মূলত নির্ভর করে একটা বিপ্লবী সংগ্রামের বিকাশ, দলের প্রয়োজন এবং সার্বিক সাংগঠনিক প্রয়োজনের ওপর। তার নিরিখে নেতৃত্ব নির্বাচিত হওয়া দরকার এবং রদবদল হওয়া দরকার।’

খালেকুজ্জামান আরও বলেন, ‘শুধুমাত্র নাম করা নেতা হলেই একটা আন্দোলন বিকশিত হয়, তা না। নীতিগত সংগ্রামের বিকাশের মধ্য দিয়ে নেতা তৈরি হয়।’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য আনিসুর রহমান মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই সময়টাতে পৃথিবীজুড়ে বামেরা লড়ছে। বিভিন্ন দেশে লাল ঝা-া উড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা পারছি না। এটা আমাদের বড় ব্যর্থতা। আমরা যে কিছু করতে পারি, এই বুঝটা আমাদের মধ্যে নেই।’

তিনি বলেন, ‘দেশের বাম গণতান্ত্রিক শক্তি কখনোই দুর্বল ছিল না। সমস্যা হলো আমাদের শক্তি নিয়ে জনগণের কাছে যেতে পারছি না। এখানে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। কারণ আমরা সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দিকনির্দেশ করতে পারিনি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত