বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাদক উদ্ধারে গিয়ে মিলল অস্ত্রগুদাম

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২২, ০২:৫২ এএম

মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে সন্ধান মেলে ভারী বিদেশি অস্ত্রের গুদামের। আর সেই অস্ত্র উদ্ধার করতে গিয়েই গত সোমবার রাতে বান্দরবানের তমব্রু সীমান্তে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান প্রেষণে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে (ডিজিএফআই) কর্মরত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর স্কোয়াডন লিডার রিজুওয়ান রুশদী। একই হামলায় গুরুতর আহত হন র‌্যাব সদস্য সোহেল বড়ুয়া এবং নিহত হয়েছেন সদ্য মা হওয়া সাজেদা বেগম (২০) নামে এক রোহিঙ্গা নারী।

এ ছাড়া ডিজিএফআই ও র‌্যাবের যৌথ ওই অভিযান দলের সদস্যদের ওপর চালানো হামলায় ভুল তথ্য দিয়ে উত্তেজিত করে সাধারণ রোহিঙ্গাদেরও অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এমনটাই দাবি করেছে তমব্রু সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অনেক সাধারণ রোহিঙ্গা।

এদিকে সোমবার রাতের ওই হামলার পর থেকে তমব্রু ও এর আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। পাশাপাশি তমব্রু সীমান্ত এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা হয়েছে।

পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং তমব্রু সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ সাধারণ রোহিঙ্গাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যায় ডিজিএফআই ও র‌্যাব সদস্যরা সাদা পোশাকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো পয়েন্ট) মাদকবিরোধী অভিযানে যান। ওই দলে ছিলেন নিহত ডিজিএফআই কর্মকর্তা রিজুওয়ানসহ ১২-১৩ জন। অভিযানের শুরুতেই বিপুল পরিমাণ আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি সিগারেট জব্দ করা হয়। এরপর দলটি উদ্ধার করে নানা ধরনের বিদেশি মদ। অভিযানের একপর্যায়ে দলটির সদস্যরা জানতে পারেন যে, অভিযানস্থল থেকে সামান্য দূরেই অবৈধ দেশি-বিদেশি ভারী অস্ত্রের একটি গুদাম রয়েছে। এরপর গোয়েন্দা তথ্যে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যৌথবাহিনী ওই গুদামের কাছাকাছি পৌঁছলে তাদের ঘিরে ধরে শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। তখন অভিযান দলটির সদস্যরা নিজেদের র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) দেখালেও শান্ত হয়নি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির সদস্যরা। উল্টো কিছু বুঝে ওঠার আগেই যৌথবাহিনীকে ঘিরে ধরা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া শুরু করে। তাদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ডিজিএফআই কর্মকর্তা রিজুওয়ান রুশদী এবং সদ্য মা হওয়া রোহিঙ্গা নারী সাজেদা। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন পুলিশ থেকে প্রেষণে র‌্যাবে যুক্ত হওয়া সোহেল বড়ুয়া।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) আশিকুর রহমান জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য সোহেল বড়ুয়াকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া তাদের হাসপাতালে সীমান্তের ঘটনায় নিহত কারও মৃতদেহ আনা হয়নি।

হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তমব্রু সীমান্তে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নেতা দোভাষী দিল মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি দুঃখজনক। সাধারণ রোহিঙ্গারা এ ঘটনায় ব্যথিত ও লজ্জিত।’

কারা ওই ঘটনা ঘটিয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘র‌্যাব সদস্যরা সাদা পোশাকে অভিযানে আসার বিষয়টি সাধারণ রোহিঙ্গারা বুঝতে পারেনি। সন্ত্রাসীরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভুল তথ্য দিয়ে র‌্যাবকে ঘেরাও করায়। পরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোলাগুলি শুরু হয়।’

এদিকে হামলার ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল বাড়ানো হয়েছে।

তমব্রু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা যে ঘটনা ঘটিয়েছে, তা ভাবাচ্ছে এলাকার স্থানীয়দের।’

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘সোমবার রাতে তমব্রু এলাকার লোকজন ঘুমায়নি। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) সকাল থেকে আতঙ্ক বিরাজ করছে সবার মধ্যে। ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ, বিজিবি, আর্মড পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনী নিরাপত্তাবলয় জোরদার করেছে। বহিরাগত লোকজনকে সীমান্তে যেতে নিষেধ করা হচ্ছে। কারণ সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তপ্ত।’

উখিয়া থানার ওসি মেখ মোহাম্মদ আলী জানান, সোমবার রাতের ঘটনার পর থেকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাতে সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান জানান, নিহত ডিজিএফআই কর্মকর্তা রিজুওয়ান রুশদীর মরদেহ ঢাকায় নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রাতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।

ঢামেকে র‌্যাব সদস্য সোহেল বড়ুয়ার অস্ত্রোপচার : আহত র‌্যাব সদস্য সোহেল বড়ুয়াকে (২৭) গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

হাসপাতালে খালাতো ভাই অশোক বড়ুয়া জানান, সোহেলের বাড়ি চট্টগ্রামের আকবরশাহ থানা এলাকায়। বাবার নাম রাখাল বড়ুয়া। তিনি পুলিশ সদস্য। বর্তমানে র‌্যাব-১৫-তে কর্মরত রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, সোমবার রাত ৩টার দিকে সোহেলকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তার মাথায় আঘাত রয়েছে। এ ছাড়া ডান পায়েও আঘাত রয়েছে। সকালে জরুরিভাবে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।

হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ফজলে এলাহী (মিলাদ) জানান, সোহেল বড়ুয়ার মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। এ ছাড়া ডান পায়েও আঘাত রয়েছে। তবে এখন তার অবস্থা স্থিতিশীল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত