রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কারাগারে বসেই পরিকল্পনা

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ০১:৫০ এএম

ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা হয়েছিল কাশিমপুর কারাগারের ভেতর থেকেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ১৮ থেকে ২০ জন অংশ নিয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। কিছুদিন আগেও স্বজন সেজে তারা পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে দেখা করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গতকাল সব কটি কারাগারে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এদিকে বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে পলাতক জঙ্গিদের সন্ধানে মাঠে নেমেছে পুলিশের একাধিক ইউনিট। তাদের ধরতে পুলিশের ইউনিটগুলো রেড অ্যালার্ট জারি করেছে। এমনকি ইন্টারপোলেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ছিনতাইকালে ব্যবহৃত পিপার স্প্রে কেবলমাত্র পুলিশ বাহিনীর কাছে থাকে। কিন্তু এটি কীভাবে জঙ্গিদের হাতে গেল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথা আগেই জানানো হয় কারাগারে আটক শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান ও সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাবসহ চারজনকে। গত সপ্তাহের শুরুতে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে তাদের সঙ্গে দেখা করে এই পরিকল্পনার কথা জানান জঙ্গিদের দুই স্বজন। তাদের খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার সময় তাদের কি করণীয় থাকবে তারও নির্দেশনা দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী, রবিবার দুপুরে আদালতে অপারেশন চলে। জঙ্গিদের লক্ষ্য ছিল চারজনকে ছিনিয়ে নেওয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা ইমরান ও সাকিবকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়। শাহিন আলম ওরফে কামাল ও শাহ আলম ওরফে সালাউদ্দিনকে ছিনিয়ে নিতে ব্যার্থ হয়। ছিনিয়ে নেওয়ার মিশনে তিন ভাগে ভাগ হয়ে অন্তত ২০ জন সদস্য অংশ নেয়। ঘটনার পর তারা জনসাধাণের সঙ্গে মিশে যায় বলে তদন্ত তদারক সূত্রে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের ব্যবহৃত পিপার স্প্রে জঙ্গিদের হাতে কীভাবে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ কারণে পলওয়েল মার্কেটের কয়েকজন দোকানদারকেগোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। কারণ হাতকড়াসহ পুলিশের ব্যবহৃত সাধারণ মালামাল একমাত্র ওই মার্কেটেই পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকে ক্রেতাদের একটা তালিকা পাওয়া গেলে তদন্তে তা সহায়ক হবে।

কাশিমপুর কারাগার  পার্ট-২-এর ডেপুটি জেল সুপার আলী আফজাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কারাগারে সব সময় নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে। তবে রবিবারের ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে আরটি চেকপোস্টে পাঁচ-ছয়জন দায়িত্বে থাকলেও এখন ১০ জন নিয়োজিত করা হয়েছে। কারাগারে আসামি পাঠানোর ক্ষেত্রেও বিশেষ নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। রবিবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সাত সদস্যকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তাদের শুনানির দিন ধার্য ছিল।’

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে জঙ্গির সংখ্যা প্রায় সাত হাজারের বেশি। জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের অনেকেই আবার উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামিনে থাকা জঙ্গিদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা দিচ্ছে না। এ জন্য আমরা তাদের ধরতে পুলিশের সব কটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের ধরতে অনেকটা ইন্টারপোলের মতোই রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।’

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রপান্তরকে বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের ধরতে পুলিশের সব কটি ইউনিট কাজ করছে। যারা মাস্টারমাইন্ড, তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পলাতক জঙ্গিদেরও ধরার চেষ্টা চলছে। কারাগারে থাকা জঙ্গিদের বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।’  

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘দুই জঙ্গি সদস্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত সবাই নজরদারিতে রয়েছে। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। তারা যাতে পালাতে না পারে, সে জন্য ইতিমধ্যে পুলিশপ্রধান সারা দেশে রেড অ্যালার্ট জারি করেছেন। যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, আদালত প্রাঙ্গণ, অন্যান্য জায়গা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা কার্যক্রম চলমান। একইভাবে পালিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গির আগের অপরাধের ধরন, তাদের আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন সময় চলাচলসহ সবকিছু র‌্যাব পর্যালোচনা করছে। পলাতক জঙ্গিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে র‌্যাবের সব ইউনিট ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ঘাপটি মেরে থাকা জঙ্গিরা প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে। শীর্ষ জঙ্গি বা তাদের নেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। জেএমবি, নব্য জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর, আনসারউল্লাহ বাংলা টিমসহ অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর অন্তত পাঁচ শতাধিক জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাদের মধ্যে জেএমবি, হুজি ও হিযবুত তাহরীরের সংখ্যাই বেশি। দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রের সহায়তা নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। ইতিমধ্যে পুলিশ ও র‌্যাব একটি তালিকা তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামিন পাওয়া জঙ্গি নিয়ে আমরা দুশ্চিতায় আছি। তাদের আদালতে নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা তা করছে না। আর এ জন্য আমাদের সতর্কতা আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের এলাকা থেকে অর্থ আসছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। যারা অর্থ পাঠাচ্ছে, তাদের পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।’

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত