রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিশু আয়াতের ছবি ও অপরাধপ্রবণতা

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৬ পিএম

আর্জেন্টিনার জার্সি পরা শিশু আয়াতের ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবির ক্যাপশন মনুষ্যত্বকে একবার হলেও নাড়া দিচ্ছে। আয়াতকে হত্যার পর শরীর ছয় টুকরো করার খবর প্রায় সমস্ত দৈনিক পত্রিকার প্রধান শিরোনাম হয়েছে। আয়াত ১৫ নভেম্বর বিকেলে পড়তে গেলে আর বাসায় ফিরে আসেনি। খবর নিয়ে আয়াতের বাবা-মা জানতে পারে তাদের মেয়ে পড়তে যায়নি। খুঁজে না পেয়ে কাছাকাছি থানায় সাধারণ ডায়েরি করার ১০ দিন পর শিশু আয়াতকে তার পরিবার খুঁজে পায় কিন্তু জীবিত নয়, ছয় খন্ড অবস্থায়। আবীর নামে একজন ১৯ বছরের তরুণ এই হত্যাকান্ড ঘটায়। আবীর শিশু আয়াতকে প্রথমে অপহরণ করে মুক্তিপণের জন্য। কিন্তু আয়াতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ক্রাইম পেট্রোল দেখার অভিজ্ঞতা থেকে আয়াতকে হত্যার পর ছয় টুকরো করে সাগরে ভাসিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, আবীর নামের এই তরুণটির কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না।

শিশু অপহরণ, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, হত্যা এবং হত্যার পর শরীর টুকরো টুকরো করার খবর কি আয়াতই প্রথম? যদি প্রথম না হয়ে থাকে তবে এমন জঘন্যতম অপরাধ দিনে দিনে চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলছে কেন? এর জন্য কি সমাজ দায়ী? যদি সমাজ দায়ী হয়ে থাকে তবে কেমন করে? আজ আমরা পথেঘাটে কী দেখছি? আমরা দেখছি ৫/৭ জন্য কিশোর বা তরুণকে একসঙ্গে দেখলেই মানুষ আশঙ্কা প্রকাশ করে এই ভেবে যে, না জানি তারা কী অপরাধ করে বসে। এই ভাবনা কি হঠাৎ একদিনে তৈরি হয়েছে? না, হয়নি। হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসা কিশোর গ্যাংয়ের জঘন্যতম অপরাধগুলো প্রতিনিয়ত ঘটার ফলে। শিশুদের নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, শিশুহত্যার সংখ্যা ও ধরন উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিচারহীনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে এসব বাড়ছে।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় এক দম্পতির মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই ঝগড়ার জের ধরে বাবার বাড়ি চলে যান স্ত্রী। স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে শ্বশুরবাড়িতে আসেন স্বামী। সেখানেও তাদের ঝগড়া বাধে। স্বামী ক্ষিপ্ত হয়ে একপর্যায়ে সাত মাস বয়সী ছেলেকে নলকূপের সঙ্গে আঘাত করেন। এতে শিশুটির মৃত্যু হয়। ঘটনাটি ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বরের। ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণের আশায় প্রতিবেশীদের হাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে পাঁচ বছরের রিফাত হোসেনকে প্রথমে অপহরণ, পরে খুন করা হয়। ঘটনাটি ২০১৮ সালের জানুয়ারির। ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর মিরপুরে শামনুন নামের চতুর্থ শ্রেণির এক স্কুলছাত্রকে অপহরণের পর হত্যা করেছে অপহরণকারীরা। ২০২১ সালে ১২ জানুয়ারি ময়মনসিংহের তারাকান্দায় দিনেদুপুরে বাড়ির উঠান থেকে সানজিদা আক্তার নামের এক সাত বছরের শিশুকে অপহরণ করা হয়। এর তিনদিন পর পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এরকম একটার পর একটা ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে ১৩ হাজার ১২ শিশু। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ১ হাজার ৫২৬ শিশু। নিপীড়নের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ শিশু। ২০১৭ সালে শিশু হত্যা ৩৩৯। ২০১৮ সালে সে সংখ্যা ছিল ৪১৮। ২০১৯ সালে ৪৪৮ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২০২০ সালে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছিল ৭৭৬ জন শিশু। ২০২১ সালে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার ৯০১ শিশু। অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডসহ জঘন্যতম অপরাধের পরিমাণ দিনে দিনে কীভাবে বেড়ে চলেছে তা এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে।

এ ধরনের জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের কি কখনো স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাবে না যে, তারা যা করে চলেছে তা আইনের চোখে জঘন্যতম অপরাধ এবং বিবেকের কাছে মনুষ্যত্বহীন, মূল্যবোধহীনতার পরিচয়! রাষ্ট্রযন্ত্র কি এর দায় এড়াতে পারে? বিচারহীনতার সংস্কৃতিও কি এসব বেড়ে চলার কারণ নয়? রাষ্ট্রের সর্বত্র ভূমিকা পালন করতে হবে। আর তার জন্য পাঠ্যবইয়ে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সঠিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব তৈরিতে গঠনমূলক লেখা প্রকাশ করা প্রথম স্টেপ মনে করছি।

এসব জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে না পারলে সমাজ তথা দেশ বর্বর সমাজে পরিণত হবে। ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১৫ বছরের (২০০২-১৬) ধর্ষণসংক্রান্ত পাঁচ হাজারের মতো মামলার পরিস্থিতি অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধর্ষণজনিত মৃত্যু ও হত্যার ২১ শতাংশ মামলা ১১ থেকে ১৫ বছর ধরে ঝুলে ছিল। আর ধর্ষণসংক্রান্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। সমাজের বিবেকবান মানুষেরও এক্ষেত্রে চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। এরকম জঘন্যতম অপরাধ আজ আয়াতের সঙ্গে হয়েছে, আগামীকাল যে আপনার এবং আপনার পরিবারের সঙ্গে ঘটবে না গ্যারান্টি কী? শিশু অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা এবং হত্যার পর শরীর টুকরো করার মতো জঘন্যতম অপরাধ বৃদ্ধির কারণগুলো অনুসন্ধান করে মূল সমস্যার সমাধান করতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও লেখক

[email protected]

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত