মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৭ পিএম

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া জনগণের শ্রম ও ঘামের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। পরিতাপের বিষয়, মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, দায়িত্ব বণ্টন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সরকারি অর্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ সংস্থা ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে’ (ইইডি) চলছে নানান অনিয়ম। একশ্রেণির প্রকৌশলী এই প্রতিষ্ঠানটিকে টাকা কামানোর মেশিনে পরিণত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারদের সঙ্গে তাদের যোগসাজশে নিম্নমানের উপকরণে নির্মিত হচ্ছে ভবন। অবস্থা এমন যে, উদ্বোধনের আগেই কোনো কোনো ভবন হেলে পড়ছে। কোথাও বছর না যেতেই খসে পড়ছে প্রতিষ্ঠানের পলেস্তারা।

গত রবিবার দেশ রূপান্তরে “১১ নির্বাহী প্রকৌশলীর ‘সৌভাগ্য’” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অন্য জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে দপ্তরপ্রধানের কাজ চালানো হচ্ছে। কিন্তু তারা অতিরিক্ত দায়িত্বের জোনে তেমনভাবে সময় দিতে পারছেন না। এতে এসব জোনের স্কুল-কলেজের নির্মাণকাজে ধীরগতির পাশাপাশি মান নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জানা যায়, নির্মাণকাজে ঠিকাদারদের কমিশন দেওয়া একটা অবধারিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি কাজে তিন থেকে ছয় শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করে সংশ্লিষ্ট জোন। এর বড় অংশই পান ওই জোনের দপ্তরপ্রধান, অর্থাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী। কাজে কোনো অনিয়ম থাকলে কমিশনের পরিমাণ বেড়ে যায়। তবে, হাতেগোনা কিছু প্রকৌশলী আছেন, যারা সেভাবে কমিশন নেন না। এ পরিস্থিতিতে ইইডিতে সৌভাগ্যবান ১১ নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যেকে একেকটি অতিরিক্ত জোনের দায়িত্বে আছেন। ফলে তাদের দ্বিগুণ হারে কমিশন আদায়েরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সূত্র জানায়, সারা দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য ইইডির ৬৫টি জোন রয়েছে। এসব জোনে নিয়মিত দায়িত্বে আছেন মাত্র ২৮ জন নির্বাহী প্রকৌশলী। চলতি দায়িত্বে আছেন ২৬ জন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সহকারী প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী হতে হলে নিয়োগবিধি অনুযায়ী ৭ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। এর কিছুটা ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাউকে কাউকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, অন্তত সাড়ে তিন বছর অভিজ্ঞতা থাকলে চলতি দায়িত্ব দেওয়া যাবে। তবে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কেউ এখনো সাড়ে ৩ বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি।’ এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে ১১টি জোন চালানোয় যারা জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রকৌশলী আছেন, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। যদি ২৬ জনকে চলতি দায়িত্ব দেওয়া যায়, তাহলে বাকি ১১ জনকে দেওয়া যাবে না কেন? সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কারও কারও অভিজ্ঞতা সামান্য কম থাকলেও সেটা সমন্বয় করে চলতি দায়িত্ব দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্যদিকে, জানা যায়, ইইডির প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নিয়োগবিধি যথাযথ অনুসরণ না হওয়ায় পুরো নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পরস্পরবিরোধী অভিযোগ এবং নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনায় যথাযথ বিধি অনুসরণ না করায় আটকে গেছে ১ হাজার ৪৫৬ পদে চলমান নিয়োগ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে একটি চক্র আছে। বছরের পর বছর তারা প্রধান কার্যালয়ে প্রায় ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। যে কারণে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া সহজ হয়েছে। ইইডিতে চলমান বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয় অবগত। গত ৪ নভেম্বর এ সংস্থার এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রকৌশলীদের সততা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মুহাম্মদ দেলোয়ার বখত বলেছেন ‘যেকোনো কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতি রোধ সম্ভব হবে না। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মকর্তা সবার প্রতিটি কাজেই স্বচ্ছতা রাখতে হবে।’ রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে জনপরিসরে রাষ্ট্রীয় যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা হয় তার অন্যতম হলো দুর্নীতি। বলা বাহুল্য দুর্নীতির অভিযোগের কম সংখ্যক ঘটনারই যথাযথ তদন্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দোষী হিসেবে প্রমাণ হওয়ার পরও দুর্নীতিতে যুক্তদের বিচার হয়নি। এর অনিবার্য ফল হিসেবে সংশ্লিষ্ট সবাই যাতে সুবিধাভোগী হতে পারেন সেটা নিশ্চিত করা হয়। সর্বশেষ দেখা গেল, সরকারের একটি অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়ের বিধিবিধান ও নিয়োগবিধি লঙ্ঘন করে নিজেদের মতো ছক কেটে দুর্নীতির এক অভিনব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তৈরি করে নিয়েছে। একাধিক জোনের দায়িত্ব পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলীদের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা ভোগ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুর্নীতির লাগাম টানতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত