বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তৃণমূলে অচেনা ৮৫% নেতা!

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০১:২৭ এএম

কক্সবাজার জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে তিন বছর আগে। এই কমিটির ৮৫ ভাগ নেতাকেই চেনেন না বিএনপির তৃণমূলের কর্মীরা। এছাড়া ৯০ ভাগ নেতাই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিষ্ক্রিয়। এমনটাই দাবি করছেন কক্সবাজার জেলা বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের তৃণমূলের কর্মীরা।

তারা বলছেন, গত ১৩ বছরে জেলা বিএনপির সম্মেলন হয়নি। বর্তমান কমিটির কারণে দলীয় কার্যক্রম যেমন ঝিমিয়ে পড়েছে, তেমনি ভেঙে পড়েছে সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড। দলে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে নতুন কমিটি না হওয়ায় নেতৃত্বে আসতে পারছেন না অসংখ্য ত্যাগী কর্মী। যে কারণে হতাশ হয়ে তাদের অনেকেই রাজনীতি থেকে দূরে সরে রয়েছেন।

দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২০ নভেম্বর কক্সবাজারের শহীদ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে জেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন হয়। অবশ্য সেই সম্মেলনও দলের বিবদমান দুটি পক্ষের মারামারিতে পণ্ড হয়ে যায়। পরে কেন্দ্র থেকে শাহজাহান চৌধুরীকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নাকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই থেকে জেলা বিএনপি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তৃণমূলে দেখা দেয় ক্ষোভ। ওই কমিটির ৮ বছর পর সম্মেলন ও কাউন্সিল ছাড়াই ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর ফের শাহজাহান চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্নাকে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। সেই কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়েছে তিন বছর আগে। তৃণমূলের কর্মীরা বলছেন, ২০০৯ সাল থেকে আজ অবধি কোনো সম্মেলন না হওয়ায় ভেঙে পড়েছে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো। তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই জেলা নেতাদের। এই কমিটির অধিকাংশ নেতাদেরই চেনেন না তারা।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার শহর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কানন বড়ুয়া বিশাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে একটি বিতর্কিত কমিটি জেলা বিএনপির নেতৃত্বে। এদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কোনো যোগাযোগ নেই। করোনাকাল কিংবা বন্যা পরিস্থিতিতে জেলা বিএনপি সাংগঠনিকভাবে জনগণের জন্য কিংবা দলীয় কর্মীদের জন্য কিছুই করেনি। এই কমিটির কারণে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক নেতাকর্মী নিজেদের বিএনপির রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বছর ধরে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অথচ জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির ৮৫ ভাগ নেতাকে আমরা চিনিই না।’

দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির অর্থ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘জেলায় বর্তমানে বিএনপির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, এতে লুকিয়ে রাখার কিছু নেই। সম্মেলন হলে দলে গতি আসবে। ত্যাগী নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হবেন।’

নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে জেলায় বিএনপির অবস্থা নাজুক বলে স্বীকার করেন দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৯ সালের সম্মেলনে আমি জেলা বিএনপির সভাপতি প্রার্থী ছিলাম। সেই কারণে জেলা বিএনপির কোনো পদে তখন থেকে আমার ঠাঁই হয়নি। এটা নিয়ে আমার দুঃখ নেই। তবে নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে জেলায় বিএনপির নাজুক অবস্থা মেনে নিতে কষ্ট হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় দুজনের হাতে জেলা বিএনপির ক্ষমতা কুক্ষিগত রয়েছে। তাদের পছন্দের লোকজনকে কমিটিতে স্থান দিয়ে ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন করছেন।’

দলীয় কার্যক্রম তেমন একটা না থাকায় বহু নেতাকর্মী সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন জানিয়ে আলমগীর ফরিদ বলেন, ‘বর্তমানে জেলা বিএনপির দলীয় কার্যক্রমও নেই বললেই চলে। অনেকে চরম হতাশায় নিষ্ক্রিয়। কেউ জড়িয়ে পড়েছেন ব্যবসায়। কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন। আবার অনেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছেন।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক কক্সবাজার-রামু আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘জেলা বিএনপির কমিটির বিষয়ে কী হবে না হবে সেটা কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। আমি বিষয়টি কেন্দ্রকে কয়েকবার অবহিত করেছি। কিন্তু কেন্দ্র কোনো নির্দেশনা দেয়নি। নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেব। আমরা কেন্দ্রের নির্দেশনা পেলেই সম্মেলন দিতে প্রস্তুত।’

জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটির ৮৫ ভাগ নেতাকে তৃণমূলের কর্মীরা চেনেন না এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে আছি। সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে যারা নেতাদের চেনে না তারা বিএনপিই করে না।’

কক্সবাজার জেলা বিএনপি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহাবুবুর রহমান শামীম। কিন্তু তিনি কক্সবাজার জেলা বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহাজাহান বলেছেন, ‘সারা দেশে নতুন করে বিএনপির সম্মেলন ও কমিটি করা হচ্ছে। কক্সবাজারও এর বাইরে থাকবে না। তবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির বিষয়টি দেখভাল করছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান শামীম। তিনিই এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত