বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিতর্কহীন নেতৃত্বের প্রত্যাশা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:৩৪ এএম

ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের অন্যতম বড় সংগঠন ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন আজ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এ সংগঠনটির ৩০তম জাতীয় সম্মেলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। এ ছাড়া সামনে রয়েছে জাতীয় নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ গঠিত হয়। সংগঠনটির বয়স বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যোগ হয়েছে নানা বিতর্ক। নানা সময়ে বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ডে সংগঠনটির গৌরবোজ্জ্বল অতীত ম্লান হয়েছে। ছাত্রলীগের নামে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, খুনোখুনি, দখলবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে পদ হারাতে হয়েছে সংগঠনটির সাবেক শীর্ষ দুই নেতা শোভন-রাব্বানীকে।

এ অবস্থায় সম্মেলন ঘিরে ছাত্রলীগের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করছেন সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতারা। তাদের চাওয়া, এমন নেতৃত্ব খুঁজে বের করা উচিত যারা ঘুণে ধরা ছাত্রলীগকে গৌরবের ছাত্রলীগে রূপান্তর করবে। বৈষয়িক নেতার চেয়ে আদর্শিক নেতা বেরিয়ে আসবে। মোটাদাগে বিতর্কহীন নেতৃত্ব এ সংগঠনের নেতৃত্ব দেবে।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাহালুল মজনুন চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রলীগকে অবশ্যই দেশের মানুষের জন্য কাজ করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিত। আমাদের সময়ে ছাত্রনেতারা সংগঠনের আদর্শ, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলে ছাত্রলীগ করতে উদ্বুদ্ধ করতেন। এখন সেই কর্মকান্ড নেই। এখনকার নেতাদের মধ্যে সুবিধা নেওয়ার বিষয় কাজ করে, যেটা আমাদের সময় ছিল না।’

ছাত্রলীগের ২৯তম সম্মেলন হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। ওই বছরের ৩১ জুলাই শোভন ও রাব্বানীর হাতে সংগঠনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পদচ্যুত হন শোভন-রাব্বানী। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্যকে। পরের বছর ২০২০ সালের ৪ জানুয়ারি তারা পূর্ণ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

আজ মঙ্গলবার ৩০তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগে নতুন নেতৃত্ব আসবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক দিনের এ সম্মেলন হবে। এর আগে সংগঠনের জাতীয় সম্মেলন হতো দুদিনব্যাপী।

ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০০ সালের পর থেকে যারা সংগঠনের নেতৃত্বে এসেছেন তাদের হাত ধরে বিতর্কের শুরু। সর্বশেষ নেতৃত্ব জয় ও লেখক সংগঠনকে আরও বেশি বিতর্কিত করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংগঠনের এখনকার নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, পদবাণিজ্য থেকে শুরু করে শিবির-ছাত্রদল করার অভিযোগ থাকা ছাত্রদেরও এ সংগঠনে বড় পদ দিয়েছেন তারা। টাকার সুবিধা নিয়ে নেতা বানিয়ে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন এ দুজন। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গত অক্টোবরে রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। গত রবিবার রাতে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জয়কে অবরুদ্ধ করেন। জানতে চান, সংগঠনকে কেন বিতর্কিত করেছেন তারা। অবশ্য, পরে জয়কে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সম্মেলন না করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে টাকা লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। তবে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘টাকা খেয়ে কমিটি, পদবাণিজ্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সম্মেলন ছাড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কমিটি না দিতে সংগঠনটিকে আওয়ামী লীগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। নতুন কমিটি না দিলেও গত কয়েক দিন ৩১ জুলাইয়ে স্বাক্ষরে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির পদ পেয়েছেন দাবি করে অনেকই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দিয়ে জানাচ্ছেন। গত ৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সজীবুর রহমান সজীব ও সাধারণ সম্পাদক আবু ইউসুফ হল শাখার সহসভাপতি মীর লায়েককে কারণ ব্যাখ্যার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘গত ৪ ডিসেম্বর আপনার ফেইসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে আপনি ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক মনোনীত হয়েছেন। কিন্তু গত ১১ সেপ্টেম্বর হল কমিটির পদের জন্য দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে বিষয়টি উল্লেখ ছিল না।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কমিটি গঠনের বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরে করোনা মহামারীর কারণে সব স্থবির হয়ে যায়। ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের চার নেতা ছাড়াও আমাদের অভিভাবক শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে কমিটি নির্ধারণ করেছি।’

পুরনো তারিখ দিয়ে নেতা বানানোর যে অভিযোগ উঠেছে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানান ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

বর্তমান কমিটির নেতাদের নামে এত নানা সমালোচনা-বিতর্ক থাকলেও তাদের অনেকেই জনকল্যাণমূলক কাজ করে আলোচনায় এসেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী অন্যতম। ডাকসুর সম্পাদকীয় পদে শিক্ষার্থীদের বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। করোনা মহামারীতে যখন অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছিল তখন সাদের নেতৃত্বে সংগঠনের কর্মীরা ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা’ নিয়ে পথেঘাটে ঘুরেছেন। চাল-ডাল নিয়ে অসহায় মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন। সাদকে ‘ছাত্রলীগের অক্সিজেন’ হিসেবেই সারা দেশের মানুষ চেনে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে গেছেন। হায়দার মোহাম্মদ জিতু গণমাধ্যমে লেখালেখি করে পরিচিতি লাভ করেছেন। সবুর খান কলিন্স, তানভীর রহমান মাহিদ ও বরিকুল হাসান বাঁধন সামাজিক বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত থেকে ছাত্রলীগের সুনাম রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে গত সম্মেলনে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বয়সসীমা অনূর্ধ্ব ২৯ বছর ছিল। দুই বছর মেয়াদি কমিটির সম্মেলন চার বছর সাত মাস পর হওয়ায় এবারের সম্মেলনে বয়সসীমা কত হবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

এবার ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থিতার ফরম জমা দিয়েছেন ২৫৪ জন। এর মধ্যে সভাপতি পদে ৯৬ এবং সম্পাদক পদে ১৫৮ জন। দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, তারা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে তারা সংক্ষিপ্ত তালিকা দেবেন। তিনি সেগুলো থেকে যাচাই-বাছাই করবেন। তার বাইরে থেকেও নেতা নির্বাচন করা হতে পারে। তবে বয়স নিয়ে ছাড় চান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলেন, যোগ্য নেতৃত্ব বের করতে হলে বয়সের ব্যাপারটি ছাড় দেওয়া উচিত। আর গঠনতন্ত্রে দুই বছর মেয়াদে সম্মেলন হওয়ার নিয়ম আছে। সেখানে চার-পাঁচ বছর পর সম্মেলন হয়। সে ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সম্মেলন না হলে শুধু বয়সের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র মানতে হবে। সেটি ঠিক হবে না।

ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘বয়সের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, কিন্তু এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এবারে যেহেতু করোনাসহ বিভিন্ন ক্রাইসিস সময় আমরা পার করছি তাই এ ব্যাপারে নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে।’

৬ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ নেতার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতার নাম ঘোষণা করার সম্ভাবনা রয়েছে। পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন সোহান খান, সাদ্দাম হোসেন, সৈয়দ আরিফ হোসেন, ইয়াজ আল রিয়াদ, কামাল খান, মাজহারুল ইসলাম শামীম, তাহসান আহমেদ রাসেল, সাদ বিন কাদের চৌধুরী, বরিকুল ইসলাম বাঁধন, তানভীর হাসান সৈকত, ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী সজীব, আবু হাসনাত সরদার হিমেল, ফুয়াদ হোসেন শাহাদাত, হায়দার মোহাম্মদ জিতু, আবদুল্লাহ হীল বারী, রনি মুহাম্মদ, তিলোত্তমা শিকদার, ফরিদা পারভীন, তানভীর রহমান মাহিদ, জয়দীপ দত্ত (জয়াজিৎ), খাদিমুল বাশার জয়, আরিফুজ্জামান ইমরান, শেখ ওয়ালী আসিফ (ইনান), ফাল্গুনী দাস তন্বী, তারেক আজীজ, শেখ মেহেদী হাসান, রফিকুল ইসলাম সবুজ, শরীফ বায়েজিদ ইবনে মাহমুদ কোতওয়াল ও ইমরান জমাদ্দার।

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি সম্পাদক অসীম কুমার উকিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ছাত্রলীগের ইতিহাস। নেতৃত্ব নির্বাচন করে সেই জায়গা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে, এটাই প্রত্যাশা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত