সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অ্যাভোকাডোর ছোঁয়ায় মরক্কো রূপকথা

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:১২ এএম

আগস্টের শুরুতে ভাহিদ হালিদহোদিচ যখন বরখাস্ত হলেন, এর পর থেকেই উঠে যায় প্রশ্ন। তিন মাসেরও কম সময় পর কাতার বিশ্বকাপ। তার আগে বসনিয়ান কোচের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন? মরক্কোকে কে দেখাবেন দিশা? সংক্ষিপ্ত তালিকায় জাদরেল বেশ ক’জন ভিনদেশি কোচের সঙ্গে ছিল তার নাম। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা ভিনদেশিতেই আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন মরোক্কান ফুটবল সংস্থাকে। তবে সে পথে না হেঁটে এমএফএ দায়িত্ব দিল ওয়ালিদ রেগরাগুইকে। মরক্কোর সাবেক ফুটবলারকে গুরুদায়িত্ব দেওয়াটা পছন্দ হয়নি ফুটবল ক্রিটিকসদের। অনেকেই হেয় করেছেন ৪৬ বছর বয়সী কোচকে। এমনকি একজন তো তাকে ‘অ্যাভোকাডো হেড’ নাম দিয়ে বসেছিলেন। সমালোচকদের কেউই ভাবেননি এই অ্যাভোকাডো হেডের ছোঁয়াতেই আমূল বদলে যাবে মরক্কো। ইতিহাস গড়ে তারা নাম লেখাবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে!

প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়ে মরক্কো গড়েছে ইতিহাস। একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে তারা পা রেখেছে শেষ চারে। ১৪ ডিসেম্বর তাদের সামনে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। সেই ম্যাচে কী হতে পারে, তা সময় বল দেবে। কাতার বিশ্বকাপে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মরক্কো যেসব কীর্তি গড়ে চলেছে, তা তো সেই অ্যাভোকাডো হেডের ক্যারিশমায়। দলটিতে মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পের মতো মহাতারকা নেই। এমনকি আফ্রিকার বড় বিজ্ঞাপন মোহাম্মদ সালাহ, সাদিও মানের মতোও তারকা নেই। অথচ তারা একের পর এক চমক সৃষ্টি করে চলেছে। কীভাবে ভোজবাজির মতো বদলে গেল মরক্কো? কোন জাদুবলে তারা সেয়ানে সেয়ানে টেক্কা দিচ্ছে বিশ্ব ফুটবল শাসন করাদের সঙ্গে? সেই উত্তরটা খুঁজতে বেশ ক’জন মরক্কো সমর্থকের সঙ্গে কথা হলো। তাদের প্রায় প্রত্যেকের এক জবাব, এই বদলের নায়ক ওয়ালিদ রেগরাগুই।

আটলান্টিক মহাসাগরের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মরক্কোকে আর দশটি আফ্রিকান দেশের সঙ্গে ঠিক মেলানো যাবে না। একটা সময় মরক্কো ছিল ফরাসি কলোনি। তবে আরবের প্রভাব হাজার বছর ধরেই ব্যাপক। ফলে এক মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের বাস সেখানে। তাদের ভাষাও আরবি। মুসলিম রাষ্ট্র হলেও মধ্যপ্রাচ্যের মতো তারা ততটা রক্ষণশীল নয়। বরং কৃষি ও পর্যটন খাতকে অধিক প্রাধান্য দিয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এ সুবাদেই অনেক ভিনদেশি ঘাঁটি গেড়েছে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে গড়ে ওঠা দেশটির মানুষ অত্যন্ত পরিবারমুখী। মরোক্কানরা সেই মিশ্র সংস্কৃতিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে চলছেন দোহার স্টেডিয়াম, মেট্রো স্টেশন থেকে শুরু করে অলিতে-গলিতে। আরব ও আফ্রিকার সমান প্রভাব থাকায় সমর্থনটাই পাচ্ছে তারা। একে তো মুসলিম রাষ্ট্র বলে মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ গলা ফাটাচ্ছে তাদের হয়ে। আবার আফ্রিকার নানা প্রান্তের মানুষও গর্বিত মরক্কোর কীর্তিতে। আর এই সীমাহীন আনন্দের উপলক্ষটা এনে দিয়েছেন রেগরাগুই মাত্র আড়াই মাস দলটির সঙ্গে কাজ করে।

এফ গ্রুপে মরক্কোর স্বপ্ন যাত্রার শুরুটা হয় গতবারের রানার্স-আপ ক্রোয়েশিয়াকে রুখে দিয়ে। পরের ম্যাচে বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারিয়ে আরও বড় অঘটনের জন্ম দেয় তারা। গ্রুপের শেষ ম্যাচে কানাডাকে ২-১ এ হারিয়ে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপের গেড়ো খুলতে পারে মরক্কো। সেটাও আবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। চমকের এখানেই শেষ নয় দ্বিতীয়পর্বে তারা টাইব্রেকারে ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী স্পেনকে আর কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে পর্তুগালকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে। এবার তাদের ফ্রান্সকে চমকে দেওয়ার পালা।

যে বিশ্বাসে তারা স্থানীয় একজন কোচকে দলের দায়িত্ব দিয়েছিল, সেই একই বিশ্বাসে ভর করে সমর্থকরা মনে করেন এই দলের আরও অনেক কিছু অর্জনের সামর্থ্য আছে। ৩০ বছরের আহমেদ যেমন বললেন, ‘আসলে বিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। ওয়ালিদ রেগরাগুই সেই বিশ্বাসটাই বুকে ধারণ করে দলটাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন। আমরা ১৯৭৬ সালে একবারই আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স জিতেছিলাম। সেই দলেরই এক সদস্য কোচ হয়ে ২০০৪ সালে মরক্কোকে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনালে। তবে তিউনিসিয়ার কাছে সেবার হেরে গিয়েছিলাম। সেই দলের সদস্য ছিলেন ওয়ালিদ। আপনি কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার খরচ করে হাই প্রোফাইল বিদেশি কোচ নিয়োগ দিতে পারতেন। তবে তার সবকিছু বুঝি নিতেই অনেক সময় লেগে যেত। ওয়ালিদের সেই সমস্যাটা হয়নি। মরক্কোর ফুটবলের নারীনক্ষত্র তার জানা। খেলোয়াড়দের মস্তিষ্ক পড়ে ফেলার অসামান্য শক্তি আছে তার। মাত্র আড়াই মাসে তিনি দল নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। তাতেই দলটা বদলে গেছে।’ পাস থেকে রাসুল খালিদ যোগ করলেন, ‘আমরা যে শীর্ষ পর্যায়েও লড়াই করতে জানি তা প্রথম বোঝা গেছে চার বছর আগে রাশিয়া বিশ্বকাপে। সেবার আমরা স্পেন আর পর্তুগালের সঙ্গে একই গ্রুপে ছিলাম। ইউরোপের দুই শক্তিশালী দলের সঙ্গে অনেক ভালো খেলেও শেষ পর্যন্ত হেরে যাই। সেবারের বুক চিতিয়ে লড়াইটাই আমাদের এবার অনেক উজ্জীবিত করেছে। আর আমাদের দলে বড় কোনো তারকা নেই। এ দলের সবাই রাজা। তাই দলটা অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।’ এই ঐক্যের সংগীতটা বেঁধে দিয়েছেন ওয়ালিদ, ঠিক করে দিয়েছেন সুর-তাল-লয়। সেটাই তটস্থ করে হাকিম জিয়েচ, ইয়াসিন বোনো, এন-নেসরিরা গেয়ে চলেছেন বিজয় সংগীত। তাতেই সমালোচকদের মুখে চুন-কালিটা লেপে দিতে পারছেন মরক্কো কোচ। অ্যাভোকাডো ফলের ভেতরে একটা ছোট্ট ফুটবল ঢুকিয়ে, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোজও দিয়েছেন, ‘এই নামটা আমার বেজায় পছন্দ। তবে এই অ্যাভোকাডোর ভেতরে বীজ নেই, আছে শুধুই ফুটবল।’ ওয়ালিদের চুলহীন মাথায় এখন কাজ করছে জন্মস্থানকে হারানোর ভাবনা। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া, বেড়ে ওঠা, ফুটবল ক্যারিয়ারের বড় একটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এবার কষছেন এমবাপ্পেকে থামানোর ছক। মোহাম্মদদের মতো তরুণদের বিশ্বাস এই ওয়ালিদই পারবেন, মরক্কোকে স্বপ্নের ফাইনালে নিয়ে যেতে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত