বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিধ্বস্ত নয়াপল্টন কার্যালয় খুলল

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:৩৭ এএম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চার দিন নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় তালাবদ্ধ করে রাখার পর গতকাল রবিবার দুপুরে খুলে দিয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ে দুপুর সোয়া ১টার দিকে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক ও বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। কার্যালয়ের প্রতিটি ফ্লোরে ঘুরে দেখা গেছে, সব ফ্লোরের দরজা-জানালা ভাঙা, টেবিলের ড্রয়ার ভাঙা। কার্যালয়ের স্টাফরা জানান, প্রতিটি ফ্লোরে বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনগুলোর কার্যালয় তছনছ করেছে পুলিশ। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করছেন তারা।

 বিকেলে দেশ রূপান্তরকে এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বরের আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনে যেমন বাংলাদেশে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল, তেমনি ১০ ডিসেম্বরে বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশকে সামনে রেখে গত ৭ ডিসেম্বর পুলিশ তা-বলীলা চালায় আমাদের নয়াপল্টনের কার্যালয়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কার্যালয়ে ঢোকার পথে ডানদিকে রাখা কাচঘেরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ম্যুরালের কাচ ভেঙে ফেলে। ওপরে যেতে যেতে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নাশকতার জন্য কিছু রেখে গেছে কি না তা পরীক্ষার জন্য ডগ স্কোয়াড আনার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। লন্ডভন্ড কার্যালয় ঠিক করতে এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে।’

কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পুরো কার্যালয়ের তান্ডবলীলা চালানোর বিষয়ে বিএনপি কোনো আইনি উদ্যোগ নেবে কি না জানতে চাইলে প্রিন্স বলেন, ‘আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করছেন। কার্যালয়ে অভিযানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে আমরা উদ্যোগ নেব।’

বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেল ৪টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান এসেছিলেন কার্যালয় পরিদর্শনে। তিনি কার্যালয় ঘুরে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

কার্যালয়ের ভেতরের অবস্থা : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কার্যালয়ে ঢোকার পর তাদের অভিযানের একটি ভিডিও বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেইসবুক পেজে ভাইরাল হয়। এতে দেখা গেছে, কার্যালয়ে প্রবেশের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠি দিয়ে আঘাত করে কাচ ভাঙছে। এ ছাড়া একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেখা গেছে তাদের। বিএনপি নেতাদের দাবি, ওই প্লাস্টিকের ব্যাগে পুলিশ বোমা নিয়ে ঢুকেছে।

কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অফিস কক্ষ ও পাশে মহিলা দলের কার্যালয়ের দরজা ভাঙা, অফিসের আসবাবপত্র ও কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তৃতীয় তলায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অফিস কক্ষ। মহাসচিবের রুমে ঢোকার যে কাঠের গেট তা ভাঙা। সোফার ওপর ভাঙা কাঠ জড়ো করা। অফিসের কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। মহাসচিব যে চেয়ারে বসেন তার সামনের টেবিলের কাচ ভাঙা। রিজভীর রুমের সবকিছু ভাঙা এবং ড্রয়ার খুলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে গেছে পুলিশ। চতুর্থ তলায় যুবদল ও ছাত্রদলের অফিস। দুই অফিসের কম্পিউটারের হার্ডডিস্কও নিয়ে গেছে পুলিশ। পঞ্চমতলায় শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক দলের অফিসের একই অবস্থা। ষষ্ঠতলায় বিএনপির লাইব্রেরি রুম। সেই রুমের সবকিছু লন্ডভন্ড দেখা গেছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে পোড়া কাগজ, পানির বোতল, কারও ভাঙা চশমা, অফিসে খাবারের জন্য আনা বিভিন্ন ধরনের খাবার। প্রতিটি ফ্লোরে থাকা সংগঠনের অফিসগুলোর স্টাফরা অফিসের ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান লিখছেন।

ক্ষয়ক্ষতির তালিকা হচ্ছে : প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো অফিসে পুলিশের তান্ডবলীলা চলে। এখন নতুন করে এগুলো সংস্কার করতে হবে। তার তালিকা করছি আমরা। কার্যালয়ের ফ্লোরগুলোর সিসিটিভি খুলে নিয়ে গেছে। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে তালিকা করা হচ্ছে। কম্পিউটারের মনিটর ক্রয় করতে হবে। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কোনো এক্সপ্লোসিভ রেখে গেছে কি না তা পরীক্ষা করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ডগ স্কোয়াড দিয়ে চেক করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’

বেলা ১১টার পর নয়াপল্টনের দুই পাশের রাস্তার ব্যারিকেড তুলে নেয় পুলিশ, শুরু হয় যান চলাচল। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে কার্যালয় খুলে দেওয়ার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হায়াতুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘কার্যালয় খুলে দিয়েছি। এখন থেকে কার্যালয়ে দলীয় কার্যক্রম চালাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর কোনো বাধা নেই। এ জন্য তাদের সহযোগিতা করা হবে।’

কার্যালয় না খুললেও সকাল থেকেই নয়াপল্টনে কার্যালয় সামনে ও আশপাশের এলাকায় ভিড় জমাতে থাকেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কার্যালয় খুলে দেওয়ার পর তাদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। তবে বিধ্বস্ত কার্যালয়ে সাধারণ নেতাকর্মীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

গত ৭ ডিসেম্বর বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এদিন রাত থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। এ সড়কের উভয় পাশে যান চলাচলও বন্ধ করে দেয়। তবে গতকাল সকাল থেকে নয়াপল্টন এলাকার ভিআইপি সড়কে আগের মতো যান চলাচল শুরু হয়। কার্যালয় ছেড়ে গেলেও কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড়ে রাস্তার পাশে পুলিশের জলকামানসহ অন্যান্য গাড়ি দেখা গেছে সেখানে। এ ছাড়া অসংখ্য পুলিশ সেখানে দেখা গেছে।

এ বিষয়ে ডিএমপি মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হায়াতুল ইসলাম খান বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর বিএনপির যে গণসমাবেশ হয়েছে, সেটি কেন্দ্র করে বিএনপির পার্টি অফিসকেন্দ্রিক গত ৭ ডিসেম্বর অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হয়। এতে বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হয়। মামলার কার্যক্রম ও ক্রাইমসিনের জন্য বিএনপির কার্যালয় এক দিনের মতো বন্ধ ছিল। পরে কার্যালয়ের চাবি তাদের (বিএনপি নেতাদের) কাছে দিয়ে দেওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয় তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল।’

‘দুদিন আগে কার্যালয়ের স্টাফদের কাছে চাবি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে’ ডিএমপির মতিঝিল জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হায়াতুল ইসলাম খানের এমন বক্তব্যের জবাবে প্রিন্স বলেন, ‘তাদের কথা মানুষ বিশ্বাস করে না। দুদিন আগে চাবি দিলে আমি নাইটিঙ্গেল মোড় দিয়ে কার্যালয়ে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দিয়েছিল কেন? সমাবেশের আগের দিন আমাদের মহাসচিব কার্যালয়ে যেতে চাইলে একই জায়গায় পুলিশ বাধা দিয়েছিল কেন?’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত