মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিল্পের ফ্রান্স না রূপকথার মরক্কো

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:৩১ এএম

উত্তর আফ্রিকার আটলান্টিক তীরবর্তী দেশ মরক্কো। এক পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে এটলাস পর্বতমালা। সেখানেই বাস দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিমান সিংহের। মরোক্কানদের কাছে পর্বতের পাদদেশে বাস করা ভয়ংকর প্রাণীটি গর্বের প্রতীক। এই বিশ্বকাপে তাদের ফুটবলার একেকজন যেন একেকটা এটলাস লায়ন্স। একেবারে হিসাবের বাইরে থেকে তারা জন্ম দিয়ে চলছে একের পর এক বিস্ময়। হিংস্র সিংহের থাবায় একে একে রক্তাক্ত করেছে ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম, স্পেন, পর্তুগালের মতো ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের। এবার পালা ফ্রান্সের। সেমিফাইনালে আজ তাদের ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারলেই নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হবে গোটা বিশ্ব। তবে এটলাস লায়ন্সদেরও ভয় আছে। ফরাসি ভা-ারে আছে ভয়ংকর এক ক্ষেপণাস্ত্র। নাম তার কিলিয়েন এমবাপ্পে। যিনি শুরু থেকেই বিস্ফোরিত হচ্ছেন। ৬০ বছর আগে ব্রাজিলের গড়া টানা দুই শিরোপা জয়ের স্বপ্ন বুকে লালন করে ২৩ বছরের ফরাসি রাজা ছুটছেন দুর্বার গতিতে। এর মধ্যেই করে ফেলেছেন পাঁচ গোল। ফ্রান্সের শেষ ১৫ ম্যাচে তার ১৬ গোল। খুনে এই ফরোয়ার্ডের নান্দনিক পায়ে এটলাস লায়ন্সদের বসাতে হবে মরণ কামড়। তাতে অবশ্য দাঁত ক্ষয়ে যাওয়ারও আছে ঝুঁকি। এই এমবাপ্পেকে বেঁধে রাখতে পারেনি বিশ্বের অনেক বড় বড় দলের শক্তিশালী রক্ষণভাগ। প্রতিপক্ষরাই স্বীকার করে নিয়েছেন এমবাপ্পে মানুষ নন, এলিয়েন।

এই এলিয়েন ২৩ বছর বয়সেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন সবাইকে ছাড়িয়ে বিশ্বসেরা হওয়ার। চার বছর আগে রাশিয়ায় করেছিলেন ৪ গোল। যার তিনটিই নকআউটপর্বে। এবার ৫ গোল করে গোল্ডেন বুটের রেসে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। গ্রুপপর্বে ডেনমার্কের বিপক্ষে জোড়া গোলে দলকে জেতানোর পর ও দ্বিতীয়পর্বে পোল্যান্ডের বিপক্ষেও তার জোড়ায় কোয়ার্টারে আসে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ৯ গোলে তিনি ছাড়িয়েছেন ম্যারাডোনাকে। আজ হেরে গেলেও তৃতীয়স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলার সুযোগ থাকবে। তার মানে আরও দুই ম্যাচে এমবাপ্পের সামনে সুযোগ নিজের গোল সংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়ার।

ডান দিক চেপে খেলেন বলেই এমবাপ্পেকে থামানোর মূল দায়িত্বটা থাকবে ইয়াহিয়া আতিয়াত ও রোমান সাইসের। তবে একের পর এক ম্যাচে ভয়ংকর গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং-এ যেভাবে বল্গাহীন হয়ে উঠেছেন পিএসজি তারকা, তাতে মরোক্কানদের এতদিনের সব প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আচ্ছা ধরে নিন, গেল পাঁচ ম্যাচে মাত্র এক গোল হজম করা মরক্কোর রক্ষণ রুখে দিল এমবাপ্পেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড যেমন তাকে গোল করতে দেয়নি। তাতে কি খুব ক্ষতি হয়েছে ফ্রান্সের? সে দলে যে গোল করার মানুষের আকাল পড়েনি। অলিভিয়ে জেরুদ ছুটছেন ঠিক তার পেছন পেছন। এই অভিজ্ঞ স্ট্রাইকারের নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে চার গোল। আচ্ছা না হয় জিরুদও পারলেন না। আন্তোইন গ্রিজমান, অরলিয়েন শুয়ামেনি, আদ্রিয়ের রবিয়ট, উসমান দেম্বেলেদের আটকাবেন কী করে? এমবাপ্পে-জিরুদ ঝড় আটকাতে ব্যস্ত থাকা মরক্কোর রক্ষণভাগ কতদিক সামলাবে?

তাই বলে তো আর আশা ছেড়ে দিলে চলবে না। পুরো আসর জুড়েই আশার পালে চড়েই তো বড় বড় সব তারকাখচিত দলকে ঘায়েল করে আজ সেমিফাইনালের মঞ্চে মরক্কো। সেটাও আফ্রিকা অঞ্চলের প্রথম কোনো দল হিসেবে। সুতরাং এই মরক্কোতে বাজি ধরতেই পারেন। দলটির ৪৭ বছর বয়সী কোচ ওয়ালিদ রেগরাগুই তার দলটাকে মাত্র আড়াই মাসে অজেয় রূপ দিয়েছেন। অদম্য মনোবলের জোরে তারা বিশ্বকে চমকে দিচ্ছে বারবার। এ দলের ফুটবলারদের একটা বড় অংশের জন্ম ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। সে সব দেশের ফুটবল আস্বাদনে তাদের বড়ে ওঠা এবং ফুটবলার হয়ে ওঠা। আর সব শক্তিকে একীভূত করে একতাবদ্ধ হয়ে খেলার মন্ত্রটা তাদের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছে ফ্রান্সেই জন্ম নেওয়া কোচ রেগরাগুই। স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে ইয়াসিন বোনোর বীরত্বে জিতেছিল মরক্কো। দলটির নিরেট রক্ষণের নেতৃত্ব দেন পিএসজি তারকা এবং এমবাপ্পের বন্ধু আশরাফ হাকিমি। এই রাইটব্যাকের ঠিক ওপরে আক্রমণে দায়িত্বে থাকেন চেলসি ফরোয়ার্ড হাকিম জিয়েচ। নাম্বার নাইন পজিশনে ইউসেফ এন-নাসেরির গোলে পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনালে কাঁদায় দলটি। এছাড়া মাঝমাঠের দখলের মূল দায়িত্বে সুফিয়ান আমরাবাত। আজও ওয়ালিদকে ভয়ংকর হয়ে ওঠা ফরাসি আক্রমণভাগকে রুখতে নিতে হবে আক্রমণাত্মক কৌশল। যে....... কাজে লাগিয়েই এতদূর আসা তাদের। তারপরও এমবাপ্পে নেতৃত্বাধীন ফরাসি ফরোয়ার্ড লাইনের কাছে তাদের দিতে হবে অগ্নিপরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ফরাসি গোলকিপার হুগো লরিসকে পাল্টা পরীক্ষায় ফেলার আগে ফরাসি রক্ষণের মুখোমুখি হতে হবে হাকিম জিয়েচ, ইউসেফ এন-নাসেরিদের। এত এত পরীক্ষা উতরেই তাদের পেতে হবে কাক্সিক্ষত জয়। যে জয়ে হয়তো বদলে দেবে ফুটবল নিয়ে দেশটির দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্বকাপ মঞ্চে দুদলের এটি প্রথম সাক্ষাৎ। ২০০৭ সালে সর্বশেষ মুখোমুখি লড়াইটা শেষ হয়েছিল ২-২ ড্রয়ে। বিশ্বকাপের আগে তাই মরক্কো ছিল বড্ড অজানা। তবে সময় যত গড়িয়েছে দলটি নিজেদের চিনিয়েছে। আর এই চেনার কাজটা গত দুদিন খুব বেশি করতে হয়েছে ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমকে। তার সংবাদ সম্মেলনের আগে মরক্কো কোচ ওয়ালিদ দিয়ে গেছেন সতর্কবার্তা। ২০০৮-এ দেশম নিজেকে সেরা প্রমাণ করাটা তার কাছে এখন কিছু যায় আসে না। এ কথা শুনে দেশম হেসে বলেছেন, ‘এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে আমিও খুব বন্ধুপরায়ণ থাকব না (হাসি)। এটাই স্বাভাবিক যে তারাও চাইবে ফাইনাল খেলতে। দলটির রক্ষণভাগ অনেক শক্তিশালী। এখন পর্যন্ত কেউই তাদের গোলের দরজা খুলতে পারেনি। আশা করছি আমরা সেই সমস্যার সমাধান আগামীকাল পেয়ে যাব। পরিসংখ্যান হয়তো তাদের পক্ষে কথা বলবে না, তবে সবকিছুরই একটা বৈপরীত্য থাকে। ছোট ছোট ভুলগুলোই হয়তো ম্যাচের নির্ধারক হয়ে দাঁড়াবে। গ্যালারি থেকে তাদের অনেক সমর্থন থাকবে। আমাদের নিজেদের খেলাটাই খেলতে হবে। ছেলেরা সতর্ক হয়েই মাঠে নামবে।’

ওয়ালিদ সাফ জানিয়েছেন, তারা বিশ্বকাপ জিততে চান। কথাটায় আপনি ঔদ্ধত্য খুঁজে পেতে পারেন। তবে ৪৭ বছরের মাস্টারমাইন্ড তার কথায় অবিচল, যেন গোটা এটলাস পর্বতমালাটাই বুকে ধারণ করেছেন মরোক্কান কোচ, ‘আমরা বিশ্বকাপ জিততে চাই। এটা শুধু বলার জন্য বলা নয়। আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। হয়তো এরকম সুযোগ আমরা আর কখনো পাব না। আমরা হয়তো ফেভারিট নই। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী। হয়তো এটাই আমাকে খ্যাপাটে করে তুলেছে। তবে কখনো কখনো খ্যাপাটে হওয়ার প্রয়োজন আছে।’ ওয়ালিদের ভাবনায় এমবাপ্পে আছেন ফ্রান্সের আর দশজন খেলোয়াড়ের মতোই, ‘আমরা আসলে চাইব নিজেদের খেলাটাই খেলতে। আর তার জন্য বিশেষ একজনকে নিয়ে বাড়তি কোনো পরিকল্পনা করার প্রয়োজন নেই। নিজেদের কাজটা করি আগে, এরপর দেখা যাবে মাঠে কী হয়।’

এমনধারা কথা ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে সব দলের কোচই বলেন। ইংল্যান্ড শিবির থেকেও শোনা গিয়েছিল একই কথা। তবে মাঠে দেখা গেছে এমবাপ্পেকে বোতলবন্দি করার গ্যারেথ সাউথগেটের বিশেষ কৌশল। সেটা ঠিকঠাক হলেও রোখা যায়নি অন্যদের। তাই আরেকবার বিদায়ের সাগরে ভাসতে হয়েছিল ইংলিশদের।

মরক্কোর কোচও বলছেন একই কথা। তবে তার কথায় কেন যেন আছে এক অদৃশ্য শক্তি। সত্যিই যদি আরেকবার রাতটা এটলাস লায়ন্সদের হয়, ফরাসি আস্ফালন যদি এটলাস পর্বতে থমকে যায়, এ সময়ের মহাতারকা এমবাপ্পেকে রুখে দিয়ে আশরাফ হাকিমি, এন-নাসেরি যদি আবারও আলো কেড়ে নেন, সেটাকে নিশ্চয় আর অঘটন বলবেন না? কারণ অঘটন ঘটিয়ে একটা-দুইটা ম্যাচ জেতা যায়, বিশ্বকাপ নয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত