রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ কার পায়ে

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:৪২ এএম

বিশ্বকাপের চরিত্রটাই এমন। অচেনাকে চিনিয়ে দেওয়া, পড়তে থাকা তারকাকে তুলে ধরা অথবা সেরা তারকাদের মাটিয়ে নামিয়ে আনা। অ্যান্তোইন গিজমান ও হাকিম জিয়েচের ক্ষেত্রে হয়েছে মাঝেরটা। এই বিশ্বকাপের আগে ক’জন ফ্রান্স বা মরক্কোর হয়ে জ্বলে ওঠার সার্টিফিকেট দিতেন এ দুই ফুটবলারকে? অথচ সেমিফাইনালের আগে প্লে-মেকার হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তাদের নিয়েই। দায়িত্বে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, কিন্তু পুরো মাঠজুড়েই বিচরণ করে খেলার গতিবিধি বদলে দিয়ে কাতার বিশ্বকাপকে নিজের জন্য স্মরণীয় করে রাখছেন দুজন। আজ মুখোমুখি হওয়া দু’দলের লড়াইয়ে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দেওয়ার মূল ভূমিকা তাদের পায়েই।

কিন্তু বিশ্বকাপের আগে হারিয়েই গিয়েছিলেন গ্রিজমান ও জিয়েচ। তরতর করে বেড়ে ওঠা ক্যারিয়ার যেন মুহূর্তেই ধসে পড়ছিল। হাকিম জিয়েচকে তো অবসরই নিতে হয় ফেব্রুয়ারিতে। এরপর চেলসির হয়ে এ বছর একটিও শুরুর একাদশে খেলার সুযোগ না পাওয়া। গোপন খবর জানায় ক্লাব থেকে তাকে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়। ওদিকে গ্রিজমান নিজের উত্থানের ক্লাব আতলেতিকোতে ফিরেছেন বটে, কিন্তু আগের মতো কিছুই পাচ্ছিলেন না। বার্সেলোনার নানা নিষেধাজ্ঞায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুরুর একাদশে খেলার সুযোগই হচ্ছিল না। সেই আক্ষেপ এবার ভুলিয়ে দিলেন বিশ্বকাপের দ্যুতিতে।

নেদারল্যান্ডসে এক মরোক্কান পরিবারে জন্ম জিয়েচের। তাই ডাচ অথবা মরক্কো জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল। বাবা-মা নেদারল্যান্ডসে থাকেন বলে দেশটির ফুটবলের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। কিন্তু ২০১৪ সালে মরক্কো বিদেশে জন্ম তবে মরোক্কান যোগ আছে এমন প্রতিভাবান ফুটবলারদের দেশটির হয়ে খেলতে উৎসাহিত করে। ওই সময় অন্য অনেকের মতোই সাড়া দেন জিয়েচও। নয়তো ২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের হয়েই খেলার কথা ছিল। বয়সভিত্তিক পর্যায়ের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ডাক পেয়েছেন নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও লাটভিয়ার বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচে খেলার কথাও ছিল তার। খেলেছেন ডাচ ক্লাব হেরেনভিন ও এফসি টোয়েন্টিতে। মরক্কো জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর খেলেছেন আয়াক্সে। এই ক্লাবেই সবচেয়ে বেশি ১১২ ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৮ গোল। ২০২০ থেকে আছেন চেলসিতে। কিন্তু ৫১ ম্যাচে মাত্র ৬ গোল করায় জিয়েচকে চেলসিতে ফ্লপ ধরা হয়। তবে এই বিশ্বকাপে কানাডার বিপক্ষে একটি গোল, বেলজিয়ামের বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট ও স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে লক্ষ্যভেদ করেন। মরক্কোর আগের কোচ ভাহিদ হালিল হোদজিক জিয়েচসহ বিদেশি যোগ আছে এমন ফুটবলারদের বাইরে রেখেছিলেন। জাতীয় দলে ডাক না পেয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়ে নেন ২৯ বছর বয়সে। কিন্তু আগস্টে রাগ্রেগুই দায়িত্ব নিয়েই ওই সব ফুটবলারকে ফিরিয়ে আনেন। জিয়েচও তার কথায় অবসর ভেঙে ফিরে আসেন। এ নিয়ে খুব সমালোচনায় পড়েছিলেন রাগ্রেগুই। কিন্তু এখন সেসবের রেশ মাত্র নেই। রাগ্রেগুই জানান, ‘যেসব ফুটবলার জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনে জন্ম নেয় এবং সেখানেই ফুটবলের সঙ্গে বেড়ে ওঠে ওদের এই খেলাটির ঐতিহ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেশি থাকে। আমি নিজেও ফ্রান্সে জন্মেছি। আমরা সবাই একসঙ্গে মিলে সবার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটা দারুণ মিশ্রণ তৈরি করেছি। যা এই বিশ্বকাপে কাজে লেগেছে।’ মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদও বলেছেন, ‘মরোক্কানদের আশা ও স্বপ্ন পুরো বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে।’ সাবেক ইংলিশ তারকা ইয়ান রাইট বিশ্বকাপে জিয়েচকে দেখে মুগ্ধ। তার মতে চেলসিতে ম্যাচ সুযোগ না পাওয়া জিয়েচ দেশের হয়ে নতুন উদ্যমে ফুটে উঠেছেন।

গ্রুপ পর্বে মোট সাতটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন জিয়েচ। ডি বক্সে মোট ৪৩ বার বল পঠিয়েছেন আর সরাসরি স্ট্রাইকার বা অন্য ফরোয়ার্ডদের ডি বক্সে পাস বাড়িয়েছেন ১৭ বার। অন্য কোনো মরোক্কান ফুটবলার এই সংখ্যার কাছেও যেতে পারেননি। তবে এসব জিয়েচকে আলাদা করতে পারবে না। যা পারবে তা হলো দলের প্রতি দায়বদ্ধতা, সতীর্থদের প্রতি সহমর্মিতা আর মাঠে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। জিয়েচ হানেরভিনে খেলার সময় তার কোচ ছিলেন ডাচ গ্রেট মার্কো ফন বাস্তেন। এই ফরোয়ার্ডকে নিয়ে বাস্তেনের মন্তব্য ছিল ‘আনম্যানেজেবল’ (যাকে সামলানো যায় না)। কিন্তু রাগ্রেগুই বলেন, ‘অনেকেই ওকে নিয়ে বাজে কথা বলে। সমালোচনা করে। কিন্তু আসল কথা হলো জিয়েচকেব স্বাধীনতা ও ভালোবাসা দিলে সে আপনার জন্য মরতেও প্রস্তুত।’

জিয়েচের মতো জ্বলে ওঠা আরেকজন গ্রিজমান। দুই বিশ্বকাপ আগে তাকেই ধরা হচ্ছিল ফ্রান্সের সেরা ফরোয়ার্ড। সেই পথে হেঁটে দেশটির সেরা স্কোরারদের তালিকায় তিনে আছেন। অথচ তার ক্যারিয়ারের গ্রাফটা কেমন যেন ওপর থেকে নিচের দিকে। ক্যারিয়ারে স্ট্রাইকার ও পরে ফরোয়ার্ড হয়ে শুরু করা গ্রিজমানের পথচলা থেমে গিয়েছিল বার্সেলোনায় গিয়ে। মেসি ও সুয়ারেজের সঙ্গে পজিশনের লড়াইয়ে নিজের জায়গাটা পাচ্ছিলেন না। ফর্ম পড়তির দিকে যাওয়ায় আবারও চলে আসেন আতলেতিকো মাদ্রিদে ধারে। পুরনো ক্লাবে ফিরলেও নিজেকে ফিরে পাননি গ্রিজমান। কিন্তু বড় মঞ্চের তারকারা বড় মঞ্চেই জ্বলে ওঠেন। গত বিশ্বকাপ জয়ী গ্রিজমানও জ্বলে উঠলেন বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। তার কাঁধে চড়ে ভরসা রাখছে ফ্রান্স।

নতুন ভূমিকায় এ বিশ্বকাপে সেরা পারফর্মটা দেখালেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে। নিখুঁত ও কার্যকর পাসের দারুণ প্রদর্শনী গড়েছিলেন গ্রিজমান। নিজের ডান পাশে থাকা উসমান দেম্বেলে ও রাইট ব্যাক জুলেস কুন্দের সঙ্গে পাস দেওয়া-নেওয়ায় দারুণ ত্রিভুজ তৈরি করেন। ম্যাচে আক্রমণ গঠনে কুন্দে ও গ্রিজমানের পাসের পরিমাণ যথাক্রমে ৪৯ ও ৪৮। ইংল্যান্ডের উঠতি তারকা ও এই বিশ্বকাপে সেরা তরুণদের একজন জুড বেলিংহামের সঙ্গে পজিশন ডুয়েল ছিল গ্রিজমানের। তবে তরুণ বেলিংহাম অভিজ্ঞতার কাছে হার মানেন।

গ্রিজমানের এই নতুন ভূমিকায় ফ্রান্স শক্তির চেষ্টা নয় বরং গাণিতিক পরিকল্পনায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলাতেই নজর দিচ্ছে। দেশমের এই নতুন ‘ছায়া মিডফিল্ডার’ তাকে লক্ষ্য পূরণের পথে নিয়ে চলেছে। গ্রিজমানের কারণে দেশম বিপক্ষের চিন্তায় আরও একজনকে রাখার সুযোগও পেয়েছেন। এখন এমবাপ্পে-জিরুর পাশাপাশি মরক্কোকে গ্রিজমানের ভূমিকা নিয়েও ভাবতে হবে। এতে সুবিধা কোচ দেশমের। এক দুই গুটি সামনে রেখে পেছনের গুটি দিয়ে বিপক্ষের অর্ধে হামলা দেওয়ার চাল চালতে পারছেন। শুরু থেকে না হলেও কোয়ার্টারে এই নতুন গুটির চালে দারুণ সফল দেশম। এবার সেমিতে সফল হওয়ার পালা। এই বিশ্বকাপে গ্রিজমানকে ব্যাখ্যা করে লেকিপ লিখেছে, ‘প্রতি ম্যাচে আতলেতিকো মাদ্রিদ ম্যান যেন একেক ধাপ ওপরে উঠছেন। ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচে ফেরায় একাধিক কাউন্টার অ্যাটাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পোল্যান্ডের বিপক্ষে মধ্যমাঠ থেকে গোল হয়ে ঘুরেছেন। সহযোগিতা করেছেন ডিফেন্ডারদেরও। আর থ্রি লায়নদের বিপক্ষে ওদের সেরা পরিকল্পনাকেও এলোমেলো করে দিয়েছেন। গ্রিজু’র গ্রেটনেসটা এখানেই। সময়ের সঙ্গে ওয়াইনের মতো সুপেয় হয়ে ওঠেন। অনুষ্ঠানের (খেলার) সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতা বাড়ান এবং সেরা মুহূর্তের বিশেষ বস্তু হয়ে ওঠেন।’

একই অবস্থানে থেকে জ্বলে উঠেছেন দুই তারকা। শেষ হাসিতে এই অগ্রযাত্রা শেষ করতে চান দুজন। তার আগে একই পজিশনে আজ মাঠ নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে গ্রিজমান ও জিয়েচকে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত