রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গণমাধ্যমে বিকশিত হোক ইসলামের বার্তা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:১৪ এএম

সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমও বিকশিত হচ্ছে। গত দুই-তিন দশকে এদেশের সংবাদমাধ্যমে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী গণমাধ্যমের অবয়ব পাল্টে গেছে, যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন আধেয়। এই ধারাবাহিকতায় ধর্মও গণমাধ্যমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সংবাদপত্রে ধর্মপাতা বা বিভাগের শুরুটা অন্তত তিন দশক আগে। তবে প্রথম দিকে সংবাদপত্রে ধর্ম বিভাগের উপস্থিতিটা তেমন গুরুত্ব পেত না। গত কয়েক বছর ধরে ধর্মের উপস্থিতিটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃহৎ কলেবরে বাজারে আসা বেশ কিছু সংবাদপত্র ধর্ম বিভাগকে মোটামুটি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথম দিকে যেখানে সপ্তাহে একদিন বা দুই দিন ধর্মপাতা থাকত এখন শীর্ষ বেশ কয়েকটি দৈনিকে প্রতিদিন ধর্মীয় কনটেন্ট থাকছে। কেউ পুরো পাতা, কেউ অর্ধেক, কেউ কোয়ার্টার পাতা দিচ্ছে। অন্তত একটি লেখা হলেও থাকছে। আবার অনেকে শুরুতে ধর্ম বিভাগ চালু না করলেও পরবর্তী সময়ে পাঠকের চাহিদার কথা বিবেচনা করে তা চালু করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মূলত ধর্ম এদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া একটি উপসর্গ। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ধর্মকর্ম ততটা পালন করেন না বটে, তবে ধর্মীয় আবেগ এবং এর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তার মধ্যে কাজ করে। যেহেতু এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম স্বাভাবিকভাবেই তারা সংবাদপত্রের পাতায়ও জীবনের অনুষঙ্গ ধর্মকে খুঁজে ফেরেন। অন্য দশটি বিষয়ের সঙ্গে ধর্মের প্রয়োজনীয় আলোচনাও থাকুক সেটা তারা চান। আর পাঠকের এই চাওয়া থেকেই সংবাদপত্রগুলো ধর্মীয় কনটেন্টের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। সংবাদপত্র শিল্পের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক দিক।

ইসলাম নিছক ধর্ম নয়, পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন বিধানের নাম। এখানে একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনের সব দিক সম্পর্কেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা ইসলামের সেই নির্দেশনাটুকু পেতে চান। সংবাদপত্রের পাতায়ও তারা সঠিক ইসলামের সন্ধান করেন। এজন্য গণমাধ্যমের উচিত গণমানুষের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া। ইসলামের বিস্তৃত ব্যাখ্যা যেমন আছে তেমনি আছে কিছু অপব্যাখ্যাও। ইসলামের নামে আছে নানা বিভক্তিও। সংবাদপত্র যেহেতু বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, দল-মত নির্বিশেষে সবার শেখার পাঠশালা, এজন্য এখানে ইসলামের মৌলিক বিষয়াদির প্রকৃত ব্যাখ্যাটুকুই উপস্থাপন করা জরুরি। খন্ডিত মত, দুর্বল ব্যাখ্যা কিংবা সমাজকে বিভক্ত করে এমন অদরকারি বিষয়াদি এখানে আলোচনায় না আনাই ভালো। এসব নিয়ে আলোচনার জন্য গবেষণা জার্নাল কিংবা গবেষণাপত্র রয়েছে। জ্ঞানমূলক বিতর্ক খারাপ কিছু নয়, তবে সেটা সর্বসাধারণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।

ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে সংবাদপত্রের ধর্মপাতা হতে পারে দাওয়াতের একটি উর্বর ক্ষেত্র। পবিত্র কোরআনে দাওয়াতের মূলনীতি বর্ণনা করে বলা হয়েছে ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান করো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বিতর্ক করো।’ [সুরা নাহল, আয়াত-১২৫] লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে ইসলামের দাওয়াতকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাপক রাখা হয়েছে। এতে দাওয়াতের সব মাধ্যম ও উপকরণ অন্তর্ভুক্ত। এই আয়াত অবলম্বনে একথা বলা যায় যে, বর্তমান প্রযুক্তির যত ধরন হতে পারে সবকিছু ইসলামে দাওয়াতে ব্যবহার করা যুগের দাবি। বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. লিখেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.) যে যুগে যে পরিবেশে বড় হয়েছিলেন; সে যুগে যত ধরনের প্রচারপদ্ধতি ছিল তার সর্বোচ্চ প্রয়োগ তিনি করেছেন। তার নবুয়তি দাওয়াতের প্রচারের ক্ষেত্রে সে যুগের সর্বোচ্চ প্রচারপদ্ধতি ছিল কোনো বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করতে হলে পাহাড়ে উঠে দাওয়াত দেওয়া। আর রাসুল (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে সে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

প্রচারমাধ্যমের গুরুত্বকে নবী করিম (সা.) কখনো খাটো করে দেখেননি। বরং মিডিয়াযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সে যুগের প্রচলিত প্রচারমাধ্যমকে সময় ও সুযোগ মতো পূর্ণাঙ্গরূপে ব্যবহার করেছেন। ইসলামপূর্ব যুগে কাবার দেয়ালকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সুরা কাউসার অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম (সা.-এর কাছে চ্যালেঞ্জে অবতীর্ণ হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। দরবারে নবুওয়াত থেকে অনুমতি পাওয়ার পর ভাষাশৈলী ও অলংকারের সর্বোচ্চ মানে উন্নীত মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সবচেয়ে ছোট সেই সুরাটি অন্যান্য কবিতার পাশে খানায়ে কাবার দেয়ালে লিখে রাখলেন। ফলে তৎকালীন সেরা কবিরা নিজ হাতে তাদের কবিতা মুছে ফেলে লিখে দিলেন ‘মা হাজা কাওলুল বাশার’ ‘এটা নয় কোনো মানুষের কালাম।’ এটা আরবের বিখ্যাত কবিদের পক্ষ থেকে নিজেদের পরাজয়ের প্রথম ঘোষণা। এর দ্বারা কোরআনে কারিমের সত্যতার বড় স্বীকৃতি যেমন আদায় হয়েছিল তেমনি এটা ছিল মিডিয়াযুদ্ধে ইসলামের প্রথম বিজয়।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা বৈরী প্রচারের শিকার। এজন্য গণমাধ্যমে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষ এখন ধর্ম সম্পর্কে জানতে চান। শুধু শোনার ওপর ভিত্তি করে তারা ধর্মকর্ম পালন করতে চান না। এজন্য সংবাদমাধ্যমে প্রকৃত ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত