সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘কফি হাউজ’-এর সুরকারের সঙ্গে দেশ রূপান্তর

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:১৪ পিএম

সুঠাম দেহের গড়ন; শ্যামবর্ণ, লম্বাটে। মুখভর্তি ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কাঁচা-পাকা। তীক্ষ্ন দুই চোখ। দুই চোখে সৃষ্টির আগুন; তাতে মায়া আছে, ভালোবাসা আছে। তবু...

ঢাকা এসেছিলেন গীতিকার পান্না লাল দত্তের আমন্ত্রণে। ফিরে গেছেন কলকাতা। সোমবার সকালে কথা হলো।

গুলশানের বাসায় ঢুকতেই হাসিমুখে সোফায় বসালেন পান্না লাল দত্ত। বললেন বসো, সুপর্ণ আসছে ...

তিনি এলেন। পরনে প্যান্ট-ট্রাউজার। বসলেন, মুখোমুখি সোফায়। বললেন বলো, কী জানতে চাও?

- সুপর্ণকান্তি ঘোষ সম্পর্কে জানার তেমন কিছু বাকি নেই। শুধু শুনতে চাই আপনার মুখ থেকে।

- কী, বলো! (মুচকি হাসলেন)

- সুরের নেশায় জীবনটা পার করে দিলেন। আর কতদূর হাঁটতে চান?

- প্রাণখোলা হাসি তার। (হাসির আওয়াজে ড্রইংরুম যেন কাঁপছিল) বললেন জানি না। ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড় করাবে। কিচ্ছু জানি না।

- আপনার তো কথা ছিল ডাক্তার হওয়ার। এম.কম করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ভীষণ প্রয়োজন ছিল সুরকে ভালোবাসার!

- সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কীভাবে, কার টানে, কীসের নিয়ন্ত্রণে যেন কিছু ‘বিষয়’ এগিয়ে যায়। সুরের ভুবনটাও তা-ই। বাবা নচিকেতা ঘোষ। তিনি ছিলেন চিকিৎসাবিদ। কিন্তু চিকিৎসা পেশায় জড়াননি। সংগীত ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। ঠাকুর দা সনৎ কুমার ঘোষ। তিনিও চিকিৎসক ছিলেন। যদি ডাক্তার হতাম, তাহলে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ কীভাবে পেতে? আমাকে তো চিনতেই না। হাহাহা...

- আপনিই গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে অনুরোধ করে গানটি লিখিয়েছিলেন। এ বিষয়ে একটু বলবেন?

- একটি বিশেষ সফরে প্যারিসে যাই। প্যারিসের একটু দূরে ‘মোমার্ত’ নামের একটা জায়গা আছে। সেখানে দেখতে পাই বেশকিছু টিলার মতোন জায়গা। টিলাতে কয়েকটি কফিশপ। গাইড জানায়, সেখানে আড্ডা দিতেন আর কফি খেতেন পিকাসো, পাবলো নেরুদা, সালভাদর দালিসহ অনেকেই।

ফিরে আসি কলকাতায়। বিষয়টা কিন্তু মাথায় গেঁথে থাকে। একদিন গৌরী কাকাকে (গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার) বলি। তিনি হেসে উড়িয়ে দেন। বলেন এসব নিয়ে আবার গান হয় নাকি! আমি বলি কেন হবে না? এই কলকাতাতেই তো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি কফিশপে আড্ডা দেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অপর্ণা সেনসহ অনেকে। কফি খেতে খেতে তর্ক করেন। হাসি-ঠাট্টাও করেন। তুমি তো এই বিষয় ধরে একটা গান লিখতে পার ...

গৌরী কাকা কিছুক্ষণ ভাবলেন। বললেন বিষয়টা কিন্তু মন্দ বলিসনি। নে, কলম ধর! চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। বললেন, লিখ! তিনি বলছেন, আমি লিখছি

কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

আজ আর নেই

কোথায় হারিয়ে গেলো সোনালি বিকেলগুলো সেই

আজ আর নেই।

নিখিলেশ প্যারিসে, মঈদুল ঢাকাতে

নেই তারা আজ কোনো খবরে,

গ্রান্ডের গিটারিস্ট গোয়ানিস ডি সুজা

ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে।

কাকে যেনো ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে

পাগলা গারদে আছে, রমা রায়

অমলটা ভুগছে দুরন্ত ক্যান্সারে

জীবন করেনি তাকে ক্ষমা, হায়...।

গানটি লেখা হলো ২০ মিনিটের মধ্যে আর সুর হলো ৫ মিনিটের মধ্যে।

মান্না দে’র গাওয়া ৫৬টি গানে সুর করেছেন তিনি। তার সুরারোপিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ভূপেন হাজারিকা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, আরতি বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীকান্ত আচার্যসহ অনেক শিল্পী। এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০-৫০০ গানে সুর দিয়েছেন।

১৯৫৮ সালের ৬ নভেম্বর কলকাতায় জন্ম নেওয়া সুপর্ণকান্তি ঘোষ মা-বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান। তিনি শুধু সংগীতজগতের মানুষ নন। মনে হলো, একজন দার্শনিকও!

মানুষের জীবনের গতি কেমন?

বলেন মানুষের জীবন থেকে ছন্দ হারিয়ে গেছে। মানুষ ছন্দে চলে। প্রকৃতিও ছন্দে চলে। মানুষ চিঠি লিখতে ভুলে গেছে। বই পড়তে ভুলে গেছে। গান শুনতে ভুলে গেছে। মানুষ এখন গান দেখে! আমাদের খাওয়ার মধ্যে একটা ছন্দ আছে। আমাদের বড় হওয়ার মধ্যে একটা ছন্দ আছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা আছে। পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের জীবনবোধ এখন শূন্য। আমাদের বিবেক মরে গেছে।

কথায় কথায় অনেক সময় গড়িয়ে যায়।

শেষে জানতে চাওয়া হয় তার স্ত্রী-সন্তানের কথা। তিনি এক ঝটকায় পাশ ফেরেন। ঘাড় ঘুরিয়ে, নাক ফুলিয়ে, চোয়াল শক্ত করে বলেন, আমার কেউ নেই। আমি বিয়ে করিনি। আমি একা।

শেষের বাক্যে লুকিয়ে আছে নীরব, ইস্পাত কঠিন অভিমান অথবা ভয়ংকর অজানা ক্রোধ, যা কেবল নিজেকেই পোড়ায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত