বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সংখ্যালঘুপ্রেমে গরিষ্ঠ চাপ

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৩২ এএম

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক কর্মিসভায় দলিত, মুসলিমসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। এ ছাড়া সংখ্যালঘু সমাজের বিরুদ্ধে যারা বিতর্কিত মন্তব্য করছেন, তাদেরও সতর্ক করে দিয়েছেন মোদি। ছয় মাসের মধ্যে গত মঙ্গলবার দ্বিতীয়বারের মতো নিজের ও তার দলের রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীতে গিয়ে পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের সার্বিক উন্নতির প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। প্রথম দফায় তার বক্তব্য নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও এবার বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। বিশেষ করে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সঙ্গে মোদির ভূমিকা নিয়ে করা বিবিসির একটি তথ্যচিত্র প্রকাশিত হওয়ার পরই আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে গোটা বিশ্বে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, ‘ইন্ডিয়া : দ্য মোদি কোশ্চেন’ নামে দুই পর্বের তথ্যচিত্র প্রচারের পরপরই তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তথ্যচিত্র নির্মাতাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি এবং দেশটির মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যকার ‘উত্তপ্ত সম্পর্ক’ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় মোদির ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধান করা হয়েছে।

আর বিবিসি বলেছে, তারা খতিয়ে দেখেছে, কীভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদির শাসনে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একের পর এক বিতর্কিত নীতি নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হয়েছে। নাগরিকত্ব আইন করা হয়েছে, যেখানে অনেকেই বলেছেন মুসলিমদের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। বিবিসির দাবি, তথ্যচিত্রটি তারা ‘ব্যাপক গবেষণা করেই’ বানানো হয়েছে। তাতে বিজেপির লোকজনসহ ‘বিস্তৃত পরিসরে’ মানুষজনের কথা বলা ও মতামত নেওয়া হয়েছে। বিবিসির এক মুখপাত্র বলেন, আমরা ভারতের সরকারকে এ তথ্যচিত্রে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা সেই সুযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে বলছে, বিবিসির এ তথ্যচিত্রে যুক্তরাজ্যের তদন্ত প্রতিবেদনও দেখানো হয়েছে, যেখানে গুজরাটের দাঙ্গার দায়ভার সরাসরি মোদির ওপর চাপানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, তথ্যচিত্রে দেখানোর আগপর্যন্ত যুক্তরাজ্য সরকারের ওই তদন্ত প্রতিবেদন কখনোই জনসমক্ষে আসেনি। অথচ তদন্তকারী দলের দাবি ছিল, মুসলিমদের লক্ষ্য করে হওয়া ওই সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে মোদি মানা করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দাঙ্গায় হস্তক্ষেপ না করতে মোদি প্রশাসনকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্যচিত্রের বিষয়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেছেন, বিবিসির এ তথ্যচিত্র ভারতে দেখানো হয়নি। এ তথ্যচিত্রে ভারতের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের সম্পর্কে ইচ্ছেমতো বর্ণনা করা হয়েছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের সম্পর্কে নিন্দা করা হয়েছে, যা রীতিমতো পক্ষপাতদুষ্ট। এটি একপেশে, এখানে কোনো বস্তুনিষ্ঠতা নেই। আর খোলাখুলি বললে বলতে হয়, এখানে ঔপনিবেশিক মানসিকতার স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে উঠেছে।

বিবিসির এ প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে যুক্তরাজ্যের হাউজ অব লর্ডসের সদস্য রমি রেঞ্জার বলেছেন, ‘বিবিসি নিউজ শতকোটি ভারতীয়কে কষ্ট দিয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ভারতের পুলিশ এবং দেশটির বিচার বিভাগকে অপমান করেছে। আমরা দাঙ্গা, প্রাণহানির নিন্দা করি। আবার সেই সঙ্গে একপেশে রিপোর্টেরও নিন্দা জানাই।

একই কথা বলেছেন দেশটির ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকও। সুনাক বলেন, তথ্যচিত্রটিতে যেভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তুলে ধরা হয়েছে এর সঙ্গে তিনি একমত নন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। আর এ অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কোনো ধরনের নিপীড়নের আমরা সহ্য করব না। কিন্তু এখানে সম্মানিত ব্যক্তি যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে আমি তার সঙ্গে একেবারে একমত নই।’

২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গার সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। দাঙ্গার জন্য তিনি বা তার দল ক্ষমা চায়নি। বরং ধারাবাহিকভাবে মুসলমানবিরোধী প্রচার করেছেন। কিন্তু এখন ধারাবাহিকভাবে মুসলমান সমাজকে কাছে টানার কথা বলছেন, সেটা এখনো খুব স্পষ্ট নয়। তবে ঠিক এ সময়েই বিবিসির বিতর্কিত সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসায় মোদি ও বিজেপি যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে, তাতে কোনো সংশয় নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত