বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পাটে সোনালি উদ্যোগ

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:১৮ পিএম

বাংলাদেশের যে কয়টি গর্ব করার বিষয়, তার মধ্যে অন্যতম পাট ও পাটশিল্প। বহুকাল বিশ্বের বুকে এ ভূখণ্ডের মর্যাদার অন্যতম প্রতীক ছিল সোনালি আঁশ নামে পরিচিত এ কৃষিপণ্য। কেবল অর্থকরী ফসল বলে নয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে পাটের ভূমিকা একটি স্বীকৃত ইতিহাস। সেই গর্বের অতীত না থাকলেও পাট এখনো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি হয়েছিল ৫ হাজার ২০৮ কোটি ২৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ছিল ১১২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। যা ওই বছর মোট রপ্তানি আয়ের ২ দশমিক ১৭ শতাংশ। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ পণ্যের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১২৮ কোটি ডলার। পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় হলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রথম। বর্তমানে বাংলাদেশ পাট দিয়ে ২৮২টি পণ্য উৎপাদন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। চলতি অর্থবছরে পণ্য ও সেবা রপ্তানি করে ৫৮ বিলিয়ন ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাট ও পাটজাত পণ্য বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘সোনালি আঁশে অফুরান আশা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী ৫ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক সিটিতে ‘এনওয়াই নাও উইন্টার শো’ নামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাণিজ্যমেলায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ১৪টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পাটজাত পণ্য প্রদর্শন করা হবে। এটি আমাদের জন্য দারুণ একটি সুযোগ। পাট ও প্রাকৃতিক আঁশ জাতীয় পণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশে প্রচুর পাট উৎপাদন হলেও পাটজাত পণ্য প্রস্তুতকারকদের মধ্যে বৈশি^ক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও এর প্রয়োগের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে পাটের উৎপাদনও কমছে। ফলে অনেক এসএমই উদ্যোক্তা পাটভিত্তিক পণ্য উৎপাদন করলেও বিবাজারে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। বাংলাদেশ হর্টিকালচার অ্যাকটিভিটির এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় এসএমই প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী পণ্য দেখার, এ-সম্পর্কে শেখার এবং পণ্যের ডিজাইন করা ছাড়াও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফরমে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ পাবেন। এই আয়োজনে বাংলাদেশের পাটপণ্য প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া সংস্থা ও উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ প্রাপ্য। পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের আন্তর্জাতিক পরিম-লে উদ্যোগ ও আয়োজন আরও প্রয়োজন।

একুশ শতকে এসে সারা বিশ্বে সিনথেটিক ফাইবারের বদলে পাট এবং পাটের মতো অর্গানিক ফাইবারের কদর এবং চাহিদা দুটোই উত্তরোত্তর বাড়ছে। অথচ এই যুগে এসেই একদা সোনালি আঁশের দেশ খ্যাত বাংলাদেশে সব সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাটশিল্পের ধারাবাহিক ক্রমাবনতি কোনো যুক্তিতেই ধোপে টেকে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এবং দেশের বেসরকারি পাটকলগুলোও লাভজনক। আর প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে লোকসানের অজুহাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট খাত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, যে দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কার করতে পারেন, যে দেশকে বহির্বিশ্ব সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে চেনে, সেই দেশে ফের পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা কঠিন নয়। অন্যদিকে, ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ এর প্রয়োগ পাটশিল্পকে বাঁচাতে ভূমিকা রাখতে পারে। পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উদ্ভাবন, ব্যবহার সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠিত করতে পাট ও পাটজাত পণ্য অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। কারণ আমাদের আছে দক্ষ পাটচাষি, আছে আধুনিক উপযোগী জাত, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা, আর আছে বহুমুখী ব্যবহারের বিভিন্ন পাটপণ্য এবং ব্যবহারের বিভিন্ন উপযোগী ক্ষেত্র। সরকারি-বেসরকারি সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পাট চাষ ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যম দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, দারিদ্র্যবিমোচন এবং সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আরও বহুদূর। পাটের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। পাটের উৎপাদক, পাটকল মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সমুন্নত রেখে পাট খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত