রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ছয় বছরের মধ্যে ভয়ংকর জানুয়ারি

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৫৩ এএম

রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় বায়ুদূষণ গত এক সপ্তাহ ধরে চরম বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। দিনের বেশিরভাগ সময় ধুলা ও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে পুরো শহর। যেখানে একিউআই স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে বাতাসের মান নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া হয়। সেখানে সপ্তাহজুড়ে ঢাকার একিউআই স্কোর ছিল ২০০ এর বেশি। যা খুবই অস্বাস্থক্যর বলে ধরে নেওয়া হয়।

গতকাল রবিবারও বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে ছিল ঢাকা। সকাল ৯টায় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ছিল ২০৬। যা খুব অস্বাস্থ্যকর। ১০১ থেকে ২০০ এর মধ্যে একিউআই স্কোরকে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ এর মধ্যে থাকা একিউআই স্কোরকে খুব অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর ৩০১ থেকে ৪০০ এর এর মধ্যে থাকা একিউআই ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

স্ট্যামফোর্ড বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বায়ুমান সূচকের গড় হচ্ছে ২৮৬। গত বছর বায়ুর মান ছিল ২২১। যা এ-বছর ২৯ ভাগ বেশি। অন্যদিকে গত ৬ বছরের তুলনায় বায়ুদূষণ ১৭ ভাগ বেড়েছে। গত ছয় বছরে বায়ুদূষণের হার ছিল ২৪৪।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ২৯ দিনের ভেতরে ২০ দিন বায়ুর মান ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর। এর মধ্যে ৯ দিন ছিল দুর্যোগপূর্ণ। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ঢাকায় জানুয়ারি মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছেÑ এর আগে কোনো বছরেই এত বেশিদিন অস্বাস্থ্যকর বায়ু সেবন করতে হয়নি ঢাকাবাসীকে। ক্যাপসের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে বায়ুদূষণের দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা ছিল ১ দিন, ২০২১ সালে ছিল ৭ দিন, ২০২০ সালে ৪ দিন, ২০১৯ সালে ৪ দিন, ২০১৮ সালে ৪ দিন আর ২০১৭ সালে ৫ দিন ছিল।

গতকাল রবিবার বিকেল ৪টায় রাজধানীর বাংলামোটরের আকাশ ছিল ধুলায় আচ্ছন্ন। দৃষ্টিসীমা নেমে আসে ৩০০ মিটারের নিচে। মোড়ে দাঁড়িয়ে অদূরের ফ্লাইওভারও দেখা যাচ্ছিল না। রাস্তার পাশের দোকান, পথচারীরা কিংবা যাত্রীরা মুখ চেপে অথবা মাস্ক পরে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

হাবিব নামের এক মোটর মেকানিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে বাংলামোটর থেকে মগবাজারের রাস্তা ও ড্রেনের কাজ চলছে। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তায় প্রচণ্ড ধুলা। দিনের অর্ধেক সময় কাজ করলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। চোখও জ্বলছে। যদি দ্রুত কাজ শেষ করে তাহলে আমাদের জন্য ভালো হয়।

মোটর পার্টস ব্যবসা ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, এই সড়কে সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই থাকে। গত বর্ষায় তারা ড্রেনের কাজ শুরু করেছে। এখনো শেষ হয়নি। সারা দিন মুখ ঢেকে রাখতে হয়। কিছুদিন শ্বাসকষ্টে ভুগেছি। ডাক্তার দেখানোর পর এখন ঠিক আছি। এখন আবার নতুন করে চোখ জ্বালা করছে। পানিও বের হয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে হলেও এই কাজগুলো দ্রুত শেষ করা উচিত। শুধু বাংলামোটর বা পল্টনই নয় এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে, রাজধানীর তেজগাঁও, শাহবাগ, মিরপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, আগারগাঁও, মতিঝিল ও সংসদ ভবন এলাকায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়ি, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি, সিটি করপোরেশনসহ সেবা সংস্থাগুলোর উদাসীনতায় নগরজুড়ে ধুলাবালুতে এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যানবাহন ও কল-কারখানার কালো ধোঁয়া। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে গাছপালা নিধনের কারণে নগরীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে।

রাজধানীতে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব কাজের ধীরগতিতে এমনিতেই জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে। অনেক এলাকায় চলছে সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ। ভাঙাচোরা সড়ক আর চলমান নির্মাণকাজের মধ্যে চলাচলের সময় যানবাহনের চাকায় উড়ছে ধুলা, বালু। চলন্ত যানবাহনের পেছনে কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে উড়ছে তা, খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরও ঢাকার মানুষের একদিনের জন্যও ভালো বায়ু সেবন করার সৌভাগ্য হয়নি। চলতি বছরেও একই অবস্থা। বায়ুমান বেশিরভাগ সময় ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় ছিল। ঢাকা শহরে বিকেল ৪টার পর থেকে বায়ুদূষণের মান খারাপ হতে শুরু করে এবং রাত ১১টা থেকে ২টার মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়।

বায়ুদূষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ক্যাপস প্রধান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি- শুষ্ক মৌসুমের এ চার মাসে বছরের ৬০ ভাগের বেশি বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। এর মধ্যে আবার জানুয়ারিতে দূষণের পরিমাণ থাকে সবচেয়ে বেশি।

তিনি বলেন, অন্যান্য বছর জানুয়ারি মাসে যে পরিমাণ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছিল তার মধ্যে চলতি বছরের মতো কখনই ছিল না। জানুয়ারি মাসে প্রায় ৩৩ শতাংশ দিন দুর্যোগপূর্ণ ছিল।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, পরিবেশ দূষণ রোধে ২০১৯ সালে হাইকোর্ট একটা রায় দিয়েছিল। কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখছি না। রাজধানীবাসীদের রক্ষা করতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। তবে সে জন্য সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপৎকালীন সময়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের জরুরি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যেসব এলাকায় দূষণের মাত্রা বেশি সেখানে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও সিটি করপোরেশন কিছু কিছু জায়গায় পানি দিচ্ছে কিন্তু সেটা অপর্যাপ্ত। এই মুহূর্তে ওয়াটার থেরাপি ছাড়া কোনো উপায় নেই।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত