বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

টানা পার্টির ৭২ ‘কুতুব’ সক্রিয়

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:২৬ এএম

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে টানা পার্টির সদস্যরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এক সময় ছিঁচকে চোর ছিল। বেশি লাভের আশায় তারা পেশা বদল করে নাম লেখায় টানা পার্টিতে। বিশেষ করে তারা ঢাকায় বেশি সক্রিয়। পুলিশের তালিকায় তারা ‘কুতুব’ হিসেবেই পরিচিত। ৭২টি গ্রুপ সক্রিয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। একেকটি গ্রুপে ৮ থেকে ১০ জন করে সদস্য কাজ করছে। তারা আবার বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। টার্গেট করা লোকদের সহজেই কাবু করে ফেলতে পারছে সদস্যরা। চলন্ত যানবাহন থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান জিনিসপত্র। তবে বেশিরভাগ ভুক্তভোগী পুলিশকে অবহিত করছেন না। ফলে পুলিশ থাকে অনেকটা অন্ধকারে। তবে পুলিশই নানা সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান চালায়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে হতবাক তদন্তকারী সংস্থাও। প্রায় প্রতিদিনই লোকজনই হেনস্তার শিকার হচ্ছেন টানা পার্টির হাতে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ জোনের উপপুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানুষ যেমন পেশা বদল করে, ঠিক অপরাধীরাও তাদের পেশা বদল করে। ছিঁচকে চোর থেকে এখন অনেকে টানা পার্টি, বমি ও মলম পার্টিতে নাম লেখিয়েছেন। এরা সাধারণত যানজটের সময়কে বেছে নিয়ে অপকর্ম করে থাকে। বিশেষ করে যানজটে পড়া ব্যক্তিরা এ সময় বাস অথবা প্রাইভেট কারে বসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এ সুযোগে হঠাৎ জানালা দিয়ে ছোঁ মেরে মোবাইল নিয়ে যায়। আবার অনেক সময় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ছাদের প্লাস্টিক কেটেও গুরুত্বপূর্র্ণ মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশ। আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই তাদের নির্মূল করা সম্ভব হবে। একই কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার পাশাপাশি সবকটি জেলাতেই টানা পার্টি সক্রিয় আছে। টার্মিনাল ও রেলস্টেশনকেন্দ্রিক তৎপরতা বেশি এসব চক্রের। সারা দেশে ৭২টি চক্র জড়িত। তাদের মধ্যে নাটের গুরু আছে ২৫ জন। যারা চক্রের সদস্যদের লালনপালন করে এবং কমিশন পায়। বিপদে পড়লে তারাই এদের জেল থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব নেয়। নাটের গুরুদের নামের তালিকাও উদঘাটন হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, দুই ধরনের টানা পার্টির সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি গ্রুপ ভোররাতে তৎপর থাকে। তারা প্রাইভেট কার অথবা মোটরসাইকেলে এসে রিকশা আরোহী যাত্রীদের ব্যাগ টান দিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। আবার অন্য একটি গ্রুপ রয়েছে যারা কর্মস্থলে যাওয়া এবং বাসায় ফেরার সময়কে টার্গেট করে। যানজটের সময়ে তারা জানালা দিয়ে ছোঁ মেরে মোবাইল ও ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায়। এই গ্রুপটির সদস্যরাও আবার অবসর সময়ে টার্মিনাল ও স্টেশনে তৎপর থাকে। তাদের রক্ষা করার জন্য আলাদা একটি গ্রুপ সক্রিয় থাকে। কোনো কারণে বিপদের আঁচ টের পেলে তারাই সামনে হাজির হয়ে যায়। এরপর লোক দেখানো ধাওয়া দেয় টানা পার্টির সদস্যদের। আর এই ফাঁকে নিরাপদ স্থানে চলে যায় অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার গাড়ি চোরচক্রের সদস্য আল হাদিস ওরফে মামুন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলে ছিল। কিন্তু মুক্তি পেয়ে গাড়ি চুরি ছেড়ে দিয়ে ছিনতাই আর টানা পার্টির কাজ শুরু করে। প্রতিদিন ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে টানা পার্টির সদস্যরা নারীদের ব্যাগ, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী বাসে ওঠার মুহূর্তে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা পার্টির ৯৮ শতাংশ সদস্য মাদকাসক্ত। এক সময় তাদের কোনো সংঘবদ্ধ চক্র ছিল না। এলাকাভেদে কয়েকজন মিলে এ ধরনের অপরাধমূলক কাজ করে থাকত। কিন্তু সম্প্রতি চক্রের আবার দলনেতা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, গত বছর ৩১ আগস্ট রাত ১১টার দিকে উত্তরার বাসায় যাচ্ছিলেন জাপা চেয়ারম্যান গোলাম মুহাম্মদ (জিএম) কাদের। পথে বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের সামনে যানজটে পড়ে তাকে বহনকারী ব্যক্তিগত গাড়িটি। গাড়ির এসি কাজ না করায় জানালার গ্লাস খুলে রাখেন তিনি। ওই সময় তিনি ফোনে কথা বলছিলেন। আর গাড়ির খোলা জানালার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে জিএম কাদের হাতে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারী। যদিও পরে ফোনটি উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গত বছর ২৩ এপ্রিল মিরপুর-১ পাইকপাড়া ছলিমউদ্দিন মার্কেট দিয়ে রিকশা নিয়ে যাচ্ছিলেন সিকদার মোহাম্মদ রেজাউর রহমান রুমেল। রিকশার পেছনে হঠাৎ এক শিশু ওঠে। এর কয়েক মিনিট পরই দেখেন পাঞ্জাবির পকেটে নিজের মোবাইলটি নেই। রুমেল ফিরে গিয়ে তাকে আর খুঁজেও পাননি। মিরপুর মডেল থানায় ডিজি করলেও এখনো পাননি তার মোবাইল। এরকম একাধিক ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন স্থানে।

ডিএমপির একটি সূত্র জানায়, এসব ঘটনা রোধ করতেই রাজধানীতে সিসি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয় ডিএমপি। বিভিন্ন সময় রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে কয়েকশ সিসি ক্যামেরা বসালেও থামানো যাচ্ছে না চুরি, ছিনতাই। রাজধানীতে সম্প্রতি চুরি, ছিনতাইসহ ছোট অপরাধ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ৫০টি থানায় সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে ৮৫৮টি। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবুজবাগ, ডেমরা এবং শেরেবাংলা নগর থানায় ৩২টি করে, পল্লবী থানায় ৩০টি ক্যামেরা আছে। সবচেয়ে কম রয়েছে মতিঝিল থানা এলাকায় ১০টি, খিলগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শাহআলী, বাড্ডা, বিমানবন্দর থানায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে ১১টি করে। ট্রাফিক বিভাগের আটটি অঞ্চলে রয়েছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা।

ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টানা পার্টির সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ এসব মোবাইল ফোন রাজধানীর নামিদামি মার্কেটে কম দামে বেচে দেওয়া হয়। পরে ওইসব মোবাইল ফোনের আইএমইআই পরিবর্তন করে তা আবার বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধে যুক্ত থাকার কারণে অনেক ব্যবসায়ীকেও বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারপরও থামানো যাচ্ছে না চোরাই মোবাইল ফোন কেনাবেচা। তারপরও তাদের ধরতে অভিযান চলছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত