রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঋণ পাওয়ার পরের চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৩৯ এএম

বিদেশি মুদ্রা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে তা আরও কয়েক বছর চলবে। প্রাক মহামারী পর্যায়ে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) যে প্রবৃদ্ধি ছিল সে অবস্থায় ফিরে আসতে অন্তত চার বছর অপেক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ হবে বলে আভাস দিয়েছে। মহামারীর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সরকারের লক্ষ্যমাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কম। চলতি অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে। ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি প্রাক মহামারী আমলের নিচেই থাকবে। এরপর আবার তা বাড়তে শুরু করবে।

তার আগ পর্যন্ত রপ্তানি আয়, ভোগ-ব্যয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখতে পাবে বাংলাদেশ। আগামীতে সরকারের ঋণের বোঝা আরও বাড়বে। বিদেশি মুদ্রার সংকটের কারণে ২০২৩ সালে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপও এ সময়ে বাড়বে। তবে আগামী বছর থেকে মূল্যস্ফীতি কমবে।  আইএমএফের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ইঙ্গিতের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে আসার কথাও বলা হয়েছে। নেতিবাচক ধারাতে থাকবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ। তবে সংকটের মধ্যেও রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি বজায় থাকবে এবং ২০২৭ সাল নাগাদ রাজস্ব আয় জিডিপির ১০ শতাংশ ছাড়াবে।

কী কাজে আসবে এই ঋণ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে বড় সংকট হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারে রয়েছে। রিজার্ভ চলতি অর্থবছর শেষে ৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় খরচ বেড়ে চলায় ক্রমশ রিজার্ভের পরিমাণ কমছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ ঋণের প্রথম কিস্তি পেলে রিজার্ভের সংকট কিছুটা দূর হবে।

ঋণের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে এবং শর্ত না মানলে কিস্তি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে সরকারের হাতে সময় আছে। চাইলে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে পারবে। আইএমএফের ঋণে বাংলাদেশের সংকট হয়তো কাটবে না। তবে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে। এ ঋণে কিছুটা স্বস্তি এলেও ইতিবাচক ফল পেতে অপেক্ষা করতে হতে পারে তিন থেকে চার বছর। চলতি অর্থবছরের ৫ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে ৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি কিছুটা কমেছে সরকারের ঋণপত্র খোলার বিধি-নিষেধের কারণে।

চলতি বছর শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। আর ২০২৪ সাল শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৩০ বিলিয়ন ডলারে। একদিকে বাণিজ্য ঘাটতি আরেক দিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপএই দুই চাপ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও সংকুচিত করবে। ২০২২ সাল শেষে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ঠেকেছে ২৩ দশমিক চার বিলিয়ন ডলারে।

 মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)

এ বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আইএমএফ বলছে, ২০২৩ অর্থবছরের শেষ নাগাদ জিডিপির প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে। জিডিপি যে কমবে, সে ইঙ্গিত এর আগে বিশ্বব্যাংকও দিয়েছিল। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে ফিরবে। এরপর ধীরে ধীরে তা বাড়বে।

ভোগ-ব্যয়

২০২১-২২ অর্থবছরের শেষ নাগাদ বেসরকারি খাতে ভোক্তা-ব্যয় ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। এর প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৬ শতাংশে। এখন সরকারি খাতে ভোগ-ব্যয় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু ২০২৩ অর্থবছর শেষে ভোগ-ব্যয় ইতিবাচক থাকবে না, বরং ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৫ শতাংশ (-৭.৫) হবে। জানা গেছে, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগের কারণেই সরকারি খাতের ভোগ ব্যয় ঋণাত্মক সূচকে গিয়ে ঠেকবে। সরকারের ভোগ-ব্যয় ২০২৬ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কমবে। ২০২৭ সালে এ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে মনে করছে আইএমএফ।

বাড়বে সরকারের ঋণের বোঝা

আইএমএফ বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে  সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩২ শতাংশ, যার মধ্যে বিদেশি ঋণ ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। নতুন পূর্বাভাসে আইএমএফ বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের ঋণের পরিমাণ গিয়ে ঠেকবে ৪২ দশমিক ১ শতাংশে, যেখানে বিদেশি ঋণই থাকবে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৭ সালে জিডিপির তুলনায় সরকারের ঋণ হবে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে পরের বছর কিছুটা কমবে।  

তলানিতে আয়ের দুই খাত

সংস্থাটি বলছে, ২০২৩ সাল শেষে রপ্তানি আয়ের কোনো সুখবর থাকবে না, সুখবর থাকবে না আমদানিতেও। যে দুটি পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এ দুটো সংখ্যার আগে অবশ্যই মাইনাস চিহ্ন বসাতে হবে। আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, ২০২২ শেষে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ শেষে তা ইতিবাচক তো থাকবেই না, বরং তা ঋণাত্মক ৭ দশমিক ২ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে। তবে পরের বছর আবারও রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে বাংলাদেশ।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৭ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৩-এ দাঁড়াবে। চলতি অর্থবছরে আমদানিতে লাগাম টানার ফলে এ খাতে অস্থিরতা বজায় থাকবে। আমদানি ব্যয় কমবে। গত অর্থবছর শেষে আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২৩ অর্থবছর শেষে তা ২২ দশমিক ৬ শতাংশ কমবে বলে মনে করছে আইএমএফ।

থাকবে মূল্যস্ফীতির খড়গ

২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরুতেই বাংলাদেশের মানুষের মাথাব্যথার কারণ ছিল নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। আইএমএফ তাদের পরিসংখ্যানে পূর্বাভাস দিয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে বৈ কমবে না। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি গিয়ে ঠেকবে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে, যেটি গত অর্থবছর শেষে ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের শেষ মাসে অর্থাৎ জুনে গড় মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ, যেটি গত বছরের শেষে ছিল ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে এ মূল্যস্ফীতি পরের বছর অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামবে এবং পরের বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৭ সালে সাড়ে ৫ শতাংশে নামবে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে যাবে

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেতিবাচক ধারার দিকে যাচ্ছিল। সংস্থাটির গতকাল প্রকাশিত পূর্বাভাস বলছে, বছর শেষে রিজার্ভ গিয়ে ঠেকবে ৩০ বিলিয়ন ডলারে। তা দিয়ে সাড়ে তিন মাস আমদানি করা যাবে। গত অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, কেনার সক্ষমতা ছিল ৪ দশমিক ৬ মাসের।

স্বস্তি দেবে বাণিজ্য ঘাটতি

দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়া নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছিল সব মহলে। তবে চলতি অর্থবছর ঋণপত্র খুলতে না পারার ব্যর্থতায় কমে আসছে বাণিজ্য ঘাটতি। সে ইঙ্গিত  আছে আইএমএফের পূর্বাভাসেও। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী জুন শেষে বাণিজ্য ঘাটতি কমে ঋণাত্মক ৭ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াবে, গত অর্থবছর শেষে ছিল ঋণাত্মক ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। আগামী অর্থবছর থেকে বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে কমবে।

প্রবাসী আয় বাড়ার ইঙ্গিত

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম খাত প্রবাসী আয়। চলতি সংকটের বড় কারণ প্রবাসী আয় কমে যাওয়া। বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হবে প্রবাসী আয় বাড়া। চলতি অর্থবছর শেষে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ১ শতাংশ, যা গত অর্থবছর শেষেও ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

অনুমোদন ৪৭০ কোটি ডলার

ঋণ অনুমোদনের পর বিজ্ঞপ্তিতে আইএমএফ বলেছে, এক্সটেনডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ) বা বর্ধিত ঋণসুবিধা ও এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) বা বর্ধিত তহবিল সুবিধার আওতায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন বা ৩৩০ কোটি মার্কিন ডলার এবং নতুন গঠিত তহবিল রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটির (আরএসএফ) আওতায় আরও ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই আরএসএফ তহবিলের ঋণ পাচ্ছে। এখনই বাংলাদেশকে ৪৭৬ মিলিয়ন বা ৪৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়া হবে। বাকি ঋণ ৪২ মাসের মধ্যে দেওয়া হবে।

আইএমএফের কথা

গত বছরের ২৪ জুলাই ঋণ চেয়ে আইএমএফের কাছে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। সে চিঠিতে কতটা ঋণ চাওয়া হচ্ছে তা উল্লেখ ছিল না। পরে ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণসহায়তার কথা উল্লেখ করেন বলে জানা যায়।

মহামারী মোকাবিলা করে বাংলাদেশে দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হয়েছিল বলে আইএমএফ উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়া যুদ্ধ শুরু করলে এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এতে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়ে যায়। টাকার দরপতন হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায়। বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিকভাবে এই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা নেয়।

আইএমএফ আরও বলেছে, সরকার বুঝতে পারে এসব তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় আমলে নিতে হবে। প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এসব জরুরি।

ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হলো, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক  ক্ষেত্রগুলো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো।

আইএমএফকে অর্থমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা

ঋণ অনুমোদনের পর গত সোমবার  রাতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল এক বিবৃতিতে আইএমএফকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘অনেকেই সন্দেহ করেছিলেন, আইএমএফ হয়তো আমাদের এ ঋণ দেবে না। তারা ভেবেছিলেন, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ক্ষেত্রগুলো দুর্বল, তাই আইএমএফ ঋণ দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। এ ঋণ অনুমোদনের মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হলো, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ক্ষেত্রগুলো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো।’

মানবসম্পদ কাজে লাগাতে বললেন আইমএফ ডিএমডি

বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের পর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আন্তোয়নিয়েত এম সায়েহ বলেন, বাংলাদেশ দারিদ্র্যহ্রাসে এবং জীবনযাত্রার মানের উল্লেখযোগ্য উন্নতিতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে কভিড-১৯ মহামারী এবং পরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এই অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। একাধিক ধাক্কা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য উচ্চাভিলাষী সংস্কার এজেন্ডাকে ত্বরান্বিত করতে হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো; টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণ এবং আকাক্সক্ষা অর্জনে মানবসম্পদ ও অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করতে হবে, এসব কারণে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সায়েহ বলেন, ইসিএফ ঋণব্যবস্থা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করবে এবং বাংলাদেশের সংস্কার এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। করনীতি এবং রাজস্ব প্রশাসন সংস্কার উভয়ের ওপর নির্ভর করে এমন গার্হস্থ্য রাজস্ব সংহতি কৌশলের বাস্তবায়ন টেকসইভাবে সামাজিক উন্নয়ন ও জলবায়ু ব্যয়বৃদ্ধির অনুমতি দেবে। পাবলিক ফাইন্যান্স, বিনিয়োগ এবং ঋণের ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার জন্য আর্থিক সংস্কার ব্যয়দক্ষতা, শাসন-পারঙ্গমতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

আর্থিক খাতের দুর্বলতা কমানো, তদারকি জোরদার, শাসনব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নত করা এবং পুঁজিবাজারের উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে সহায়তার জন্য অর্থায়ন প্রক্রিয়াকে একত্রিত করতে সহায়তা করবে বলে জানান তিনি।

ঋণ পরিশোধে রাজস্ব আদায় বাড়াতে  বলেছে আইএমএফ : করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দেশে ডলার সংকট। এলসি খুলে নতুন পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। অর্থনীতির এমন টালমাটালের মধ্যে দাতা সংস্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ঋণের অর্থ ছাড় করেছে। ঋণ দিয়েই থেমে থাকেনি কীভাবে পরিশোধ করবে তার ছকও দিয়েছে।

আগামী অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটে আইএমএফের সুপারিশের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে বলেছে দাতা সংস্থাটি।

আইএমএফের সুপারিশে এরই মধ্যে ভ্যাট আইন ও আয়কর আইন সংশোধন করে চূড়ান্ত করেছে। দাতা সংস্থা থেকে অচিরেই কাস্টমস বা শুল্ক আইন চূড়ান্ত করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তি তুলে ধরে বলেছে, নতুন শুল্ক আইন কার্যকর হলে দেশে অর্র্থ খাতে বড় ধরনের স্বস্তি আসবে। বিশেষভাবে অর্থ পাচার কমবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।  

আইএমএফ থেকে বলা হয়েছে, রাজস্ব খাতে সংস্কার করা হলে, রাজস্ব জালের বিস্তার হবে, এতে আদায় বাড়বে। দাতা সংস্থা থেকে বড়মাপের কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের কৌশল, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া, শুল্ক খাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলেছে।

এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট গোয়েন্দা শাখা গতিশীল করতে ছক দেওয়া হয়েছে।

কয়েক বছর থেকেই রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতি দূর করতে আয় বাড়ানোয় জোর দিয়ে দাতা সংস্থা এনবিআরকে দেশব্যাপী রাজস্ব দপ্তর স্থাপনে, বিশেষভাবে সব উপজেলায় রাজস্ব দপ্তর চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বলেছে।

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি-রপ্তানি রোধে এনবিআরের নেওয়া পদক্ষেপে আইএমএফ সন্তুষ্টি জানিয়ে কঠোর নজরদারি করতে বলেছে। শুল্ক খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

দাতা সংস্থাকে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের তৎপরতা বাড়াতে বলেছে। দাতা সংস্থা থেকে সম্ভাবনাময় বৃহৎ ও মাঝারি করদাতা চিহ্নিত করতে জোর দিতে বলেছে। রাজস্ব আদায় পরিশোধ করছে কি না, তা নজরদারিতে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন বাড়াতে সুপারিশ করেছে। উৎসে রাজস্ব আদায়ের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম মনিটরিং, আমদানি পর্যায়ে মিথ্যা ঘোষণা ও অবমূল্যায়ন সম্পর্কিত কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে, করদাতাদের সেবা বৃদ্ধি ও করদাতাদের সঙ্গে (খাতভিত্তিক) আলোচনার মাধ্যমে কর প্রদানে উৎসাহিত করতে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা তৎপরতাভিত্তিক ঝুঁিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাতে ছক দিয়েছে। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানে দক্ষতা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে বলেছে। অনিবন্ধিত নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো জরিপে চিহ্নিত করে, নিবন্ধিত করে রাজস্ব আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কার্যকর করাসহ উচ্চ আদালতে অনিষ্পন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি কার্যক্রম গ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করেছে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত