মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

৫০০ কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৩৮ এএম

বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের রঙিন দিন আজ। এই দিনটিতে প্রকৃতি যেভাবে সেজেছে, তেমনি বাণিজ্যিকভাবেও দিনটি ব্যবসায়ীদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এদিনটিকে সামনে রেখে জমে ওঠে নানান ব্যবসা। ফুল, চকলেট, কেক, জুয়েলারি, পোশাক, স্মার্ট ডিভাইস থেকে শুরু করে ই-কমার্স কেনাকাটা চলে বেশ কিছুদিন ধরে। কারণ বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে বড় উৎসবগুলোর একটি পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস। এই দিবসে বাণিজ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন ব্যবসায়ী খাত থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে বাণিজ্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি হবে। প্রতি বছরই এ বাণিজ্য বাড়ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং খোঁজ নিয়ে ভালোবাসা দিবস ঘিরে বাণিজ্যের এমন চিত্র পাওয়া যায়। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ভালোবাসা দিবস ঘিরে সবকিছুর দাম বেশি।  ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন, চেষ্টা ছিল ক্রেতাদের পছন্দের পণ্য সাশ্রয়ী দামে সরবরাহের। ডলার সংকট ও জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাবে বিদেশি অনেক জিনিস বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়েই দাম বেশি রাখতে হচ্ছে।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার অর্থনীতির কঠিন সংকটের মধ্যে পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবস পালিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারায় চাহিদা থাকলেও আমদানিকৃত অনেক উপহারসামগ্রী দেশে আনতে পারেননি। পণ্যের কাঁচামালের দাম বেশি থাকায় দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেশি। ন্যূনতম লাভ রেখে পণ্য বিক্রি করলেও গতবারের তুলনায় বেশি দাম রাখতে হয়েছে।

ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, ‘অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালোবাসা দিবসে ভালো বাণিজ্য হচ্ছে। ভালোবাসা দিবসে ১০০ কোটি থেকে ১৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়। অন্যান্য পণ্যের বিক্রিও কম নয়। সব মিলিয়ে সারা দেশে ভালোবাসা দিবস ঘিরে বাণিজ্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি হবে। এই বাণিজ্য সংকটে থাকা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় প্রতি বছরই পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে রমরমা বাণিজ্য হয়। বিভিন্নভাবে জানা যায়, শুধু ফুল বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা। এ দিবসে উপহারসামগ্রী দেওয়া একটা সাধারণ বিষয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য আয়োজন তো আছেই। সবকিছু নিয়েই ভালো বাণিজ্য হয় ভালোবাসা দিবস ঘিরে।

নব্বইয়ের দশকে এ দেশে ভালোবাসা দিবসের উদযাপন শুরু হয়। প্রতি বছরই এ দিবস উদযাপনের ব্যাপকতা বেড়েছে। প্রথম দিকে দেশে ভালোবাসা দিবস উদযাপনে ফুল দেওয়া-নেওয়ায় সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর ধীরে ধীরে উপহার দেওয়া, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া হয়। বছর দশেক ফুল, উপহার দেওয়া-নেওয়া, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পাশাপাশি ভালোবাসা দিবস উদযাপন উপলক্ষে কিছুটা নিরিবিলি জায়গায় ঘুরতে যাওয়া শুরু হয়।

ফুল বিক্রি : ভালোবাসা দিবসে সবচেয়ে চাহিদা বাড়ে ফুলের। ফুল ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার্স সোসাইটির (বিএফএস) তথ্যানুসারে, ভালোবাসা দিবসে গোলাপের চাহিদা অন্তত ৫০ লাখ। গত বছর বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালোবাসা দিবস ও পহেলা ফাল্গুনে ২০০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছিল। এবার ব্যবসা আরও বাড়বে বলে দাবি করা হয়েছে। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে শুধু গদখালী এলাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে।

প্রতি বছরই ভালোবাসা দিবস ঘিরে ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করতে ও প্রিয়জনকে ভালোবাসা জানাতে ফুলের কদর বাড়ছে। রাজধানীর অন্যতম বড় ফুলের বাজার শাহবাগের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার এই বাজারে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার মতো ব্যবসা হবে বলে আশা তাদের।

হোটেল-রেস্তোরাঁ : এবারের ভালোবাসা দিবসে সাধারণ রেস্তোরাঁ থেকে রাজধানীর তারকা হোটেলগুলোতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। বাড়তি কাস্টমার সামলাতে অনেকে শুধু এ দিবসের জন্য বাড়তি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। রান্নার জন্য আগেই সব কেনাকাটা করে রেখেছে।

আরজি এস রেস্তোরাঁর মালিক আহনাফ জুবায়ের দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘অন্য সময়ে বেলা ১১টায় রেস্তোরাঁ খুললেও ভালোবাসা দিবসে সকাল ৭টায় খোলা হবে। স্বাভাবিক সময়ে যেসব খাবার দেওয়া হয়, এদিন আরও নতুন নতুন পদ থাকবে। দাম অন্য সময়ের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি। কারণ অন্য সময়ের তুলনায় মাংস, মুরগি, সবজি থেকে মসলাসহ সবকিছু বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তাই ন্যূনতম লাভ রাখলেও অন্য বারের তুলনায় দাম বাড়বে।’

পাঁচতারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও,  র‌্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন, ঢাকা রিজেন্সি, রেনেসন্স হোটেল, সিক্স সিজনস, আমারি, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সারিনা, লা মেরিডিয়ানসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরের নামী হোটেলে আগেই ভালোবাসা দিবস ঘিরে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

এসব হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যালকনি বার সাজিয়েছে বিভিন্ন প্যাকেজে। পুল ক্যাফেতে দুপুরে ও রাতে জনপ্রতি তিন থেকে চার হাজার টাকার প্যাকেজ রয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা পাবেন একটির সঙ্গে আরেকটি বিনা মূল্যে। ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি ১০ হাজার টাকায় দম্পতিদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, সঙ্গে বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে সকালের নাশতা। ভালোবাসা দিবসে রেস্তোরাঁয় বুফে দুপুরের খাবার ৪ হাজার ৭৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা, বুফে রাতের খাবার ৬ হাজার ৪৯০ টাকা থেকে ৭ হাজার টাকা জনপ্রতি। র‌্যাফেল ড্রর আয়োজন রয়েছে। ভাগ্যবান বিজয়ী পাবেন সোনা, গহনা, হীরার আংটি, বিদেশ ভ্রদণের টিকিট। ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ডিলাক্স রুমের ভাড়া পড়বে ১৪ হাজার ২১৪ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা।

রিসোর্ট : অন্য সময়ে রাজধানীর আশপাশের এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন রিসোর্টে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একজনের জন্য খরচ করতে হতো ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। ভলোবাসা দিবস উপলক্ষে খরচ ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি। রিসোর্টগুলোতে থাকছে সাইকেলে চড়া, নৌকায় ঘোরা, সুইমিংপুলে গোসল, দুপুরের খাবার, সকাল ও সন্ধ্যায় হালকা নাশতা। রাতে থাকতে হলে সাধারণ রিসোর্টগুলো একটি দম্পতিকে দিতে হবে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে থাকা, খাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক কাজে অংশ নেওয়া যাবে। রাজধানীর আশপাশে ব্র্যাক সিডিএম, সারা, রূপকথা, শীতলক্ষ্যা, কুঠিরসহ বিভিন্ন রিসোর্ট রয়েছে। খরচ প্রায় একই ধরনের।

পোশাক : ভালোবাসা দিবসে ও পহেলা ফাল্গুনে নানা রঙের জামাকাপড় কেনার হিড়িক পড়েছে। পোশাকে হলুদ, বাসন্তী, কমলা, লাল রঙের প্রাধান্য থাকছে বেশি। ফ্যাশন হাউসের দাপট বেশি। ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক নিয়ে এসেছে। শাড়ি, ফতুয়া, পাঞ্জাবি বেশি বিক্রি হয়েছে। দাম ৫০০ টাকা থেকে ৫ হাজার-৭ হাজার টাকা বা তার বেশি।

ই-কমার্স : ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে অনলাইন কেনাকাটা বেড়েছে কয়েকগুণ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ই-কমার্স পণ্য ডেলিভারির অর্ডার পেয়েছে। শহরে এসব পণ্যের অর্ডার বেশি। তবে অন্যবারের তুলনায় এবারে বিভাগীয় ও জেলা শহর থেকেও অর্ডার এসেছে। পণ্যের অর্ডার বেশি থাকায় ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে শুক্রবারও পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অনলাইন ফ্লেবারের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা রাতুল মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তকে বলেন, ‘আগের চেয়ে ভালোবাসা দিবসের ব্যাপকতা বেড়েছে। তাই উপহারসামগ্রীর দেওয়ার হার বেশি।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত