বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ব্যক্তি নামের রকমফের

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:১৪ পিএম

শত শত বছর আগে আরবিভাষী মুসলিম ধর্মপ্রচারকরা ইন্দোনেশিয়ায় এসেছিলেন। সে কারণে আরবি ভাষার প্রভাব রয়েছে ইন্দোনেশিয়ানদের ধর্মীয় এবং সামাজিক আচারে। তবে মাতৃভাষা পরিত্যাগ না করার ফলে ধর্মীয় আরবি ভাষার তুলনায় মাতৃভাষা রয়েছে শক্ত অবস্থানে। মাতৃভাষা এবং আরবি ভাষার মিশ্রণে নামও রয়েছে তাদের, যেমন আল হাসাবি, শিহাব ইত্যাদি। অস্ট্রোনেশিয়ান, জ্যাভানিজ, সুন্দানিজ, বালিনিজ ভাষার পাশাপাশি আরবি, সংস্কৃত, চাইনিজ এবং পশ্চিমা বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক নামও অনেকের রয়েছে। সাবেক স্বৈরশাসক সুহার্তোর শাসনামলে আইনি প্রক্রিয়ায় চাইনিজদের নিজ ভাষায় নামকরণ নিষিদ্ধ করে ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় ব্যক্তির নামকরণে বাধ্য করা হয়েছিল। সে কারণে চাইনিজরা নিজেদের মাতৃভাষার পরিবর্তে ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় তাদের নাম রাখতে বাধ্য হয়েছিল। যেমন চাইনিজ জনৈক ব্যবসায়ী তার নাম লিম সু লং পাল্টে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন সুদানো সেলিম। সুহার্তোর শাসন অবসানের পর ওই কালো আইনটি রদ করা হয়েছে। সে কারণে চাইনিজ ইন্দোনেশিয়ানরা নিজ ভাষায় নাম রাখার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ইন্দোনেশিয়ানরা পারিবারিক নামের ধারাবাহিকতায় নিজেদের নামকরণ করেন না। নগণ্য সংখ্যকের ক্ষেত্রেই পারিবারিক নামের পদবি দেখা যায়। পিতৃপরিচয়ের ভিত্তিতে অনেকের নাম রয়েছে, যেমন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সুকর্নর কন্যা সাবেক প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণ পুত্রী, যার বঙ্গানুবাদ মেঘবতী সুকর্নর কন্যা। আবার এমনও দেখা যাবে যে, পিতার নাম আহমেদ সুধর্মা, পুত্রের নাম আলি পুত্রা সুধর্মা অর্থাৎ সুধর্মার ছেলে আলি। এটি আরবদের অনুসরণে নিশ্চয়। আরবরা বিন-বিনতে-এর পর পিতার নাম যুক্ত করে দেয় নামের শেষে। ইদানীং আমাদের দেশেও অমন অনুকরণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।

খ্রিস্টান অধ্যুষিত পূর্ব তিমুর দীর্ঘকাল ইন্দোনেশিয়ার অংশ ছিল। পৃথক রাষ্ট্রের দাবিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে পূর্ব তিমুরবাসীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছিল নিয়মিত। অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের চাপে পূর্ব তিমুরের দখলদারিত্ব ইন্দোনেশিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। পূর্ব তিমুর এখন স্বাধীন পৃথক রাষ্ট্র। পূর্ব তিমুরের ভাষা পর্তুগিজ এবং টিটাম। এই দুই ভাষার পাশাপাশি পূর্ব তিমুরবাসীদের ব্যক্তির নাম ল্যাটিন এবং আরবি ভাষায়ও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ নাম বিশ্বে বিরল। বিশেষ করে দুই-তিন ভাষার শব্দের মিশ্রণে খুব কম দেশের মানুষের নামকরণ রয়েছে।

ধর্মীয় আনুগত্যের দায়বদ্ধতায় ব্যক্তির নামকরণের পাশাপাশি কিছুটা হলেও ভাষাভিত্তিক ব্যক্তির নামকরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছিল আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের সময়কালে এবং স্বাধীনতার পরপর। তবে সে-প্রবণতা স্থায়ী হয়নি। সে-ধারাবাহিকতা অক্ষুণœও থাকেনি, যেমন থাকেনি ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পরিচয় পর্যন্ত। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ বিধান পাল্টে ধর্মীয় মোড়ক এঁটে দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবেই। ঘটনাটি সামরিক সরকারের আমলে ঘটেছিল বটে, তবে নির্বাচিত সরকার স্থায়ী করে দিয়েছে। আমাদের দেশে ধর্মভিত্তিক নামকরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যক্তির ভাষাভিত্তিক নামকরণের দৃষ্টান্ত ক্রমেই বিরল হয়ে পড়েছে।

আমাদের দেশে প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যক্তির নামের শেষে মিয়া ব্যবহৃত হয়। মিয়া শব্দের অভিধানিক অর্থ সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রলোক। শব্দটির আরবি অর্থ একশত। মিয়া পদবি এক সময়ে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ছিল। কালের বিবর্তনে তা এখন সেকেলে এবং অত্যন্ত সাধারণ পদবিতে পরিণত হয়েছে। সাধারণের নামের শেষেই স্থান পেয়েছে। একে অপরকে সম্মানিতরূপে মিয়া সম্বোধন অতীতের রেওয়াজ ছিল, এখন করলে অপমান-আপত্তিজনক বলেই বিবেচিত হবে।

হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তির নামের পেছনে পদবি থাকে। হিন্দুদের ক্ষেত্রে জাত-বর্ণের ভিত্তিতে এবং খ্রিস্টান-মুসলিমদের ক্ষেত্রে বংশানুক্রমে। চৌধুরী, মজুমদার পদবি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের নামের শেষে আমরা দেখি বটে, তবে পদবির অগ্রভাগের নাম দেখে সহজেই চিহ্নিত করা যায় ব্যক্তির সম্প্রদায়গত পরিচয়। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠদের নামের প্রথমাংশ মাতৃভাষায় অর্থাৎ বাংলায়। তবে নামের শেষাংশ অবশ্যম্ভাবীরূপে সম্প্রদায়গত এবং জাত-বর্ণ পরিচয়ে। সে কারণে তাদের নামকে শতভাগ মাতৃভাষাভিত্তিক এবং সম্প্রদায়-ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা যায় না। হরিপদ, বিষ্ণুপদ, ইন্দ্রজিৎ, রামপ্রসাদ, ঈশ্বরচন্দ্র, কালীপ্রসন্ন, নারায়ণ, বিষ্ণু-প্রিয়া, দুর্গাদাস, লক্ষ্মীকান্ত, শিবশঙ্কর, মহাদেব, শিবানী, ইত্যাদি প্রচুর নাম সম্পূর্ণরূপে সম্প্রদায়গত। দেবতাদের নামানুসারে। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় ধর্মীয় বিবেচনাতেই ব্যক্তির নামকরণ করে থাকে। নাম দিয়ে সহজেই চেনা যায় কে হিন্দু, কে মুসলিম।

যিশুখ্রিস্টের শিষ্য সেন্ট টমাস জেরুজালেম থেকে মাদ্রাজে এসেছিলেন ৫২ খ্রিস্টাব্দে। বিশ বছর ধর্মপ্রচারের পর ৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ভারতের চেন্নাইর মাইলাপোরে তার সমাধি রয়েছে। সমাধিস্থলটি বিশাল ইনস্টিটিউটে পরিণত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ মানত করতে সেখানে যান। সেখানকার সার্বিক অবস্থার সঙ্গে আজমিরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির দরগাহর মিল রয়েছে। সেন্ট টমাসের আগমন, ধর্মপ্রচার এবং মৃত্যুসহ সব তথ্যাদি পুস্তকাকারে বিলি করা হয় এবং বিশাল একটি এপিটাফে সে সমস্ত তথ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে।

খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে মোটাদাগে দুটি ভিন্ন মত-পথ স্পষ্ট। একটি ক্যাথলিক অপরটি প্রোটেস্ট্যান্ট। ধর্মান্তরিত ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা অতীত নাম-পদবি পাল্টে নতুন নাম-পদবি গ্রহণ করে থাকে। বাইবেল অনুসরণে এবং বিভিন্ন সাধু-সাধ্বী, যাজকের নামানুসারে নাম রেখে থাকে। অপর দিকে প্রোটেস্ট্যান্টরা ধর্মান্তরে নাম-পদবি পরিবর্তন না করে অতীত নাম ও পদবি ব্যবহার করে। ১৯৭১-এর মার্চ থেকে ৯ মাসব্যাপী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার সময়কালে খ্রিস্টান পরিচয়ে আত্মরক্ষার্থে প্রোটেস্ট্যান্টরা বাধ্য হয়ে নিজেদের নামের অগ্রভাগে বিভিন্ন খ্রিস্টধর্মের সাধু, সাধ্বী, যাজকদের নাম যুক্ত করেছিল। তবে তাদের অতীত পদবি তারা বংশানুক্রমে নিজেদের নামের শেষে যুক্ত রেখেছে। তাদের পদবিতে দাস, বিশ্বাস, চৌধুরী, গুপ্ত, সাহা, ব্যানার্জি এমনকি খান, খন্দকার, হোসেন পর্যন্ত রয়েছে।        

ধর্মীয় উৎসব পার্বণের এবং জাতীয় দিবসের নামানুসারে ব্যক্তির নাম রাখার নানা নজির রয়েছে। ওই সমস্ত দিনে জন্ম নেওয়া অনেকের নাম পার্বণের নামানুসারে হয়েছে; এমনটাও আমরা দেখে থাকি। যেমন আশুরার দিনে আশুরা, শবেকদরের দিনে কদর বানু, শবেমেরাজের দিনে মেরাজ, রোজার মাসে রমজান, কোরবানির ঈদে কোরবান আলি। ১৪ আগস্টে জন্ম নেওয়া অনেকের নাম পাকিস্তান, আজাদ, পাকিস্তান আমলে দেখেছি।

অনেকের আবার নাম আছে, যেমন- ফজর আলি, যোহর আলি, আসর আলি, মাগরিব উদ্দিন। এশা নামটি হালে কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রে অধিকমাত্রায় দেখা যায়। সপ্তাহের সাত দিনের নামেও অনেকের নাম রাখা হয়; শুক্রবারে শুকুর মিয়া, রবিবারে রবি, সোমবারে সম্মন, মঙ্গলবারে মঙ্গল ইত্যাদি।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত