বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৩৪ এএম

পাকিস্তানের গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি উপস্থাপন করেন তৎকালীন গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তার দাবির মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের  মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে আর তিনি হয়ে ওঠেন ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ। লিখেছেন এনাম-উজ-জামান

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার রামাইল গ্রামে (বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার। তিনি কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বিএ ও বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ অনুসরণে তিনি ‘মুক্তি সংঘ’ নামে একটি জনকল্যাণমূলক সংস্থা গড়ে তোলেন। বিএল পাস করার পর তিনি কুমিল্লা জেলা বারে যোগ দেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন, বঙ্গীয় কৃষিঋণ গ্রহীতা ও বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাসের সঙ্গে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্ববঙ্গ থেকে পাকিস্তানের গণপরিষদের সদ্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এই গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সেদিনই একটি সংশোধনীর প্রস্তাবনা পেশ করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি তার আনীত প্রস্তাবনার ওপর আলোচনা শুরু হলে তার বক্তৃতায় তিনি বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা উল্লেখ করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাজে তাদের ভাষাকে বাদ দিলে সমস্যার সৃষ্টি হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কাগজপত্রে-মুদ্রায়, নোটে, মনিঅর্ডার ফরমে, ডাকটিকিটে-বাংলা ভাষা অবহেলিত, তাতে জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে; তারপর বলেন, তিনি মনে করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষারূপে রাষ্ট্রভাষার সম্মান বাংলার প্রাপ্য। তার বক্তব্য থেকেই প্রথম দাবি ওঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। 

তখনকার পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এতে ক্ষিপ্ত হন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রত্যাশা করেছিলেন পূর্ব বাংলার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতারা তার প্রস্তাবে সমর্থন জানাবেন। কিন্তু তারা তা করেননি। তবে সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মণ সংশোধনী উপস্থাপনাকে সমর্থন করেন এবং ভূপেন্দ্রনাথ কুমার দত্ত ও শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তাদের এ সমর্থনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের মতামতই প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাঙালি স্পিকার তমিজুদ্দিন খান জানালেন প্রস্তাবটি গৃহীত হচ্ছে না। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা ধর্মঘট করেন। বিশ্বিবদ্যালয়-প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানানো হয়। ২৯ ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশে ছাত্র ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণায় ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ ছিলেন এই আন্দোলন সংগ্রামের একজন সক্রিয় সদস্য। ১৯৫০ সালে গণপরিষদে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত তীব্র প্রতিবাদ করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা অমান্য করে যে মিছিল হয়েছিল সেই মিছিলে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকা-ের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের অধিবেশন বয়কট করেন এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। অবশেষে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল আসন নিয়ে জয়লাভ করলে ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ ধীরেন্দ্রনাথের প্রতি বিদ্বেষভাব বজায় রাখে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। সে কারণে মুক্তিযুদ্ধ শুরুতেই, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধীরেন্দ্রনাথ ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায় কুমিল্লা সেনানিবাসে। সেখানে ৮৫ বছর বয়স্ক এই দেশপ্রেমিক রাজনীতিককে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করে। তার লাশ আজও পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে এই দেশপ্রেমিক ভাষাসৈনিক যেকোনো ন্যায়সংগত আন্দোলনের প্রতিটি আন্দোলনকারীর অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত