সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠক ‘আতঙ্ক’ বিএনপিতে

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:০৩ এএম

তৃণমূলের সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতবিনিময় হোক তা চাচ্ছেন না দলের বেশ কয়েক কেন্দ্রীয় নেতা। কেন্দ্রীয় এসব নেতার ব্যাপারে তৃণমূলের যে ক্ষোভ অসন্তোষসেটা যেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে না পৌঁছায় সেজন্যই তারা মতবিনিময় বৈঠক চাচ্ছেন না। এমনকি তাদের অনেকে তদবিরও করছেন যেন মতবিনিময় বৈঠক না হয়। বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন না তৃণমূলের নেতারা।

২০০১ সাল থেকে বিএনপির পদধারী অথবা সমর্থিত বর্তমান ও সাবেক উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থেকে শুরু সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের তালিকা গত মাসে চেয়ে পাঠান তারেক রহমান। সেই তালিকা এখন কেন্দ্রীয় দপ্তরে।

বিএনপিদলীয় সূত্র বলছে, ১০টি সাংগঠনিক বিভাগের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে তারেক রহমানের মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, এসব জনপ্রতিনিধিকে সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন ও আগামী নির্বাচন নিয়ে করণীয় বিষয়ে তাদের মতামত জানা। তাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েকটি বৈঠক করে আন্দোলন ও নির্বাচনের সার্বিক চিত্রটি জানতে চান তিনি। ১০টি সাংগঠনিক টিমের হয়ে যারা তথ্য সংগ্রহ করেছেনএমন প্রায় ২৮ নেতার সঙ্গে আজ শুক্রবার স্কাইপে বৈঠক করবেন তারেক রহমান।

তথ্য সংগ্রহে যুক্ত দুজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনপ্রতিনিধিদের তালিকা করার পাশাপাশি তাদের কাছ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা থেকে তৃণমূলের চিত্রও কিছু কিছু পাওয়া গেছে। আজকের বৈঠকে সেসব বিষয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে জানানো হবে। এ ছাড়া ১০ সাংগঠনিক বিভাগে কবে কীভাবে মতবিনিময় সভাগুলো করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হবে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে থাকা দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই বিষয়ে আমাকে কাজ করতে বলা হয়েছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই সবকিছু জানানো হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ইচ্ছের পর কেউ তদবির করলে সেটা চলে না।’

বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৩০৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য রয়েছেন ২ হাজার ৪৩৬ জন। সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর রয়েছেন ২৩৫ জন। সিটি করপোরেশন ও পৌর মেয়র রয়েছেন ১৮১ জন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ১৫৯ জন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পুরুষ ১৩২ জন ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মহিলা ১৬২ জন।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া এবং দ্বাদশ নির্বাচনে মনোনয়ন চান অথচ তৃণমূলের চিত্র তাদের বিরুদ্ধে, মূলত এমন নেতারাই মতবিনিময়ের বিরোধিতা করছেন। এ ছাড়া দলের কয়েক উপদেষ্টা ও ভাইস চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা ১০-১২ নেতাও বিরোধিতায় সুর মেলাচ্ছেন।

দেশ রূপান্তরের হাতে থাকা তালিকার কয়েক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, তারা আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে চান। এমন মতবিনিময় হলে হাইকমান্ডকে (ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) যারা (নিজের এলাকায় আধিপত্য থাকা, কোন্দলও না থাকার ইত্যাদি) সাংগঠনিক বিষয়ে ভুল বুঝিয়ে রেখেছেন তাদের মুখোশ উন্মোচন হবে। তারা বলছেন, মাঠের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে চান তারা। এ ছাড়া ‘দিনের ভোট রাতে হলে’ কী কৌশল অবলম্বন করতে হবে সেটি তারা জানাতে চাইছেন।

নরসিংদী-৩ আসন শিবপুর উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত। ইউনিয়নগুলো হলো বাঘাব, জয়নগর, পুটিয়া, মাছিমপুর, দুলালপুর, আইয়ুবপুর, চক্রধা, সাধারচর, যোশর। এর মধ্যে বতর্মানে দুজন চেয়ারম্যান রয়েছেন বিএনপি সমর্থিত। তারা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাও।

মাছিমপুরে আবুল হারিছ রিকাবদার ১৯৭৬ সাল থেকে টানা চেয়ারম্যান। প্রবীণ এই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কথা বলার সুযোগ পাই এবং তৃণমূল নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে যদি নেতা নির্বাচন বা মনোনয়ন দেওয়ার ইচ্ছা হাইকমান্ডের থাকে, তাহলে এসব নিয়ে মতামত তুলে ধরব। যদি কথা না শোনেন, তাহলে বলব না। কারণ আমরা যারা কথা বলব, পরে তাদের ওপর হামলা বা মামলা হবে।’

দুই মেয়াদে (২০০৩ ও ২০১৬) আইয়ূবপুর ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন আবু তাহের খন্দকার। তিনি শিবপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতিও। গত জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়া মঞ্জুর এলাহীকে এবার কেউ প্রার্থী হিসেবে চান না বলে দাবি তার। এই নেতা বলেন, ‘মঞ্জুর এলাহী আগে জাতীয় পার্টি করতেন। এখন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তার কর্মকা- কেউ পছন্দ করে না। তারেক রহমান ছাত্রদলের একটি কমিটি দিয়েছেন সেটার বিরোধিতা করে তার লোকজন জেলা বিএনপির সভাপতি খাইরুল কবির খোকনের বাড়িতে হামলা করেছে। তিনি পুরো জেলার বিএনপির আসল লোকদের বাদ দিয়ে ভাড়া করা লোকদের দিয়ে কমিটি দিচ্ছেন।’

জানতে চাইলে মঞ্জুর এলাহী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি ছয় মাস হলো। এ সময়ের মধ্যে কোনো কমিটি হয়নি। সুতরাং তাদের অভিযোগ অমূলক।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা সবসময়ই দলের হাইকমান্ডের কাছে তৃণমূলের সমস্যা তুলে ধরতে চাই। বলার সুযোগ পেলে অনেক নেতার সত্যিকারের চরিত্র উদঘাটন হবে। আবার আমরা যারা এই সময়ে ভোট করে জিতেছি, তারাও ভোটে জেতার কৌশল কী তা বলতে পারব।’

হারুনুর রশিদ আজাদ ২০০৪ ও ২০১১ সালে নোয়াখালী সদরের পৌর মেয়র ছিলেন। পরে বিএনপির বিরোধীদলীয় সাবেক হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পৌর ছাত্রদলের সভাপতি থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত রাজনীতি করে আসা এই নেতার নাম যাতে জনপ্রতিনিধির তালিকায় না আসে সেই তদবির করেছেন দলের প্রভাবশালী একজন ভাইস চেয়ারম্যান। পরে তারেক রহমানের হস্তক্ষেপে তালিকায় তার নাম ওঠে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত