বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বাফুফের কেবল চাই আর চাই

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৩৬ এএম

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সরকারের কাছে চাওয়ার শেষ নেই। তাদের এখন একটাই নীতি ‘চাই আর চাই’। সরকার লক্ষ্মীর ভা-ার উপড়ে দিলেই চলবে ফুটবলের চাকা! ফুটবলকে এগিয়ে নিতে নিজেরা কিছু করবেন না। সরকারকেই নিতে হবে ফুটবলকে জাতে তোলার দায়িত্ব!

ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়া ও শক্তিশালী পুরুষ ও মহিলা জাতীয় দল গঠনের লক্ষ্যে বছরব্যাপী নানা আসর আয়োজন, প্রশিক্ষণ ও ফেডারেশনের কাঠামো শক্তিশালী করতে সরকারের কাছে একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) দিয়েছিল বাফুফে। দু’বছর আগে সেই চাহিদার অঙ্ক ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। সেই ফাইল নড়াচড়া হয়নি বলে নতুন করে ৫৮৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে সংশোধিত প্রকল্প জমা দিয়েছে বাফুফে। ফুটবল কর্তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, সেটা না পেলে ফুটবল থমকে যাবে। অথচ ফিফার নির্দেশনা অনুযায়ী ফুটবল ফেডারেশন স্বতন্ত্র সংস্থা। এখানে সরকারের হস্তক্ষেপ অযাচিত গণ্য হয়। তাতে নেমে আসে নিষেধাজ্ঞার খড়গ। তাই সচরাচর সরকার এ ব্যাপারে থাকে নিশ্চুপ। তাই ফেডারেশনকে এগিয়ে নেওয়ার মূল দায়িত্বটা নিতে হয়। সরকার বড়জোর সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বাফুফে অবশ্য এখন আর সরকারকে সহায়ক নয়, চাইছে মূল অর্থের উৎস হিসেবে। সুযোগ পেলেই সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। গতকাল বাফুফের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক ও সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগের কথায়ও একই সুর।

অর্থাভাবে এলিট অ্যাকাডেমি নির্বিঘেœ পরিচালনা করা যাচ্ছে না। বাড়ানো যাচ্ছে না এর সুযোগ সুবিধা। ফলে এ বছর সাফের দুটি বয়সভিত্তিক আসরের প্রস্তুতি পড়েছে শঙ্কার মুখে। অর্থাভাবে বিদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে বেশি বেশি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলানো যাচ্ছে না। তাতে মিলছে না সাফল্য। কাল ডেভেলপমেন্ট কমিটির এক সভা শেষে মানিকের কথা শুনে ক’দিন আগে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের বলা কথাগুলো মনে পড়ে গেল। বাফুফে প্রধান নারী ফুটবলারদের বেতন, ক্যাম্পের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে সরকারের কাছে সহায়তা চাওয়ার কথা বলেছিলেন। সেদিনও ডিপিপির ফাইল মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকার কথা তোলেন সালাউদ্দিন। মানিক ও সোহাগও একই গান ধরেছেন। তাতে নিজেদের দৈন্যই যে বারবার প্রকাশ পাচ্ছে, সেই বোধটাও হারিয়ে গেছে। অর্থ জোগানে বাফুফে যে ব্যর্থ, সেটাও প্রমাণিত হচ্ছে বারবার।

অর্থাভাবে কমলাপুরের গাদাগাদি করে গড়ে তোলা এলিট অ্যাকাডেমির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মানিক বলেন, ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের আরও উন্নতমানের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দাবি করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর। খেলোয়াড়দের বেতন ২০ শতাংশ বাড়িয়েছি। আসলে তো আমরা দিতেই চাই। তবে পাতিলে না থাকলে তো চামচে উঠবে না। আমাদের পাতিল তো খালি। সেজন্য চামচে ওঠে না। অ্যাকাডেমি চালাতে অনেক টাকা লাগে। আমরা অনেক কষ্ট করে এখনো চালিয়ে যাচ্ছি। তবে কতদিন চালাতে পারব, তা নিয়ে সংশয় আছে।’ অর্থ সংকট ঘোচাতে সরকারের সুদৃষ্টির আশা মানিকের, ‘ফান্ডে ঘাটতি বলে আমরা অ্যাকাডেমির দলকে বাইরে খেলাতে পারছি না। আশা করছি মন্ত্রণালয় আমাদের সহায়তা করবে। এছাড়া আমরা যে ডিপিপিটি পাঠিয়েছি, তা বাস্তবায়িত হলে টাকার সমস্যা থাকবে না।’

ফিফা ও এএফসি প্রশাসনিক ব্যয়, কর্মকর্তা ও কোচদের বেতন খাতে বাফুফে ফি বছর একটি বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেয়। এর বাইরে ডেভেলপমেন্ট খাতেও নিয়মিত টাকা আসে ফিফার কাছ থেকে। যার একটি অংশ অবশ্য অচিরেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে জাতীয় দলের সাবেক কোচ জেমি ডে’র বকেয়া বেতন সময়মতো পরিশোধ না করায়। এরপর থাকে পঞ্জিকা মেনে ঘরোয়া খেলা পরিচালনা করা ও জাতীয় দলের ব্যয় নির্বাহ। ঘরোয়া ফুটবলকে বলতে গেলে আগ বাড়িয়েই একক পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে নিচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ। বাফুফের নেই কোনো শক্তিশালী মার্কেটিং বিভাগ, যারা স্পন্সরদের ফুটবলমুখী করার দায়িত্ব নেবে। বাফুফের সাধারণ সম্পাদক সোহাগ নিজেদের স্পন্সর জোগানোর দায়িত্বটাকে এড়িয়ে গিয়ে সমস্যার সমাধান দেখছেন সরকারের সহায়তায়, ‘(সাফের দুটি বয়সভিত্তিক আসরকে সামনে রেখে) পলের একটাই দাবি, বিদেশি প্রতিপক্ষের সঙ্গে বেশি বেশি প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলা। যদি টাকা জোগাড় করতে পারি, তবে আমরা বিদেশি দল এনে বা সেখানে গিয়ে খেলব। যদি না পারি, তবে আধাআধি প্রস্তুতি নিয়ে হয়তো (সাফের আসরগুলোতে) গ্রুপপর্বে ভালো করব। সেমিফাইনাল, ফাইনালে পারব না। দিন শেষে তাই টাকাই সব।’ এরপর মানিক ডিপিপি অনুমোদন হতে বিলম্বের জন্য সরকারকেই যেন চাইলেন দায়ী করতে, ‘মন্ত্রণালয় যদি চাইত, তবে আগেই হয়তো ডিপিপিটা পাস হয়ে যেত।’

বাফুফে কর্তারা ফুটবলকে জাতে তোলার দায়িত্ব সরকারকে দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে চাইছেন। সেটা মিললেই যেন ফুটবল বাঁচবে। আসলেই কি তাই? ৫৮৭ কোটি টাকা পেলে যে ঘুণে ধরা বাফুফেতে অনিয়মের মচ্ছব শুরু হবে না, তার নিশ্চয়তা কী? দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, বিল-ভাউচার জালিয়াতি, অসম্পূর্ণ অডিট রিপোর্ট পেশের অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক সোহাগসহ বেশ ক’জনের বিরুদ্ধে ফিফার তদন্ত কিন্তু এখনো চলমান!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত