রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আগ্রাসী ছাত্রলীগ

এমন ঘটনা আর চাই না, ফুলপরীর বার্তা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৫৬ এএম

‘আমার ওপর যে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, সেটার পুনরাবৃত্তি চাই না আমি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আশ্রয় হয়, এটাই চাই আমি। আর এ জন্যই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। আমার ওপর নির্যাতনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’ গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই নিজের বর্তমান অনুভূতি তুলে ধরেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) ছাত্রলীগ নেত্রী ও তার সহযোগীদের হাতে নির্যাতনের শিকার ফুলপরী খাতুন।

এদিকে তদন্তের স্বার্থে নির্যাতনের ঘটনার পর পাবনার গ্রামের বাড়ি থেকে চারবার ক্যাম্পাসে আসতে হয়েছে তাকে। এতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা জানান। এ ছাড়া দফায় দফায় যাতায়াত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচ বহন করতে গিয়ে ভ্যানচালক বাবা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও জানান ফুলপরী।

এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয়েছে তার বাবার। ফুলপরীর বাবা আতাউর রহমান বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে এখানে (ইবি ক্যাম্পাস) আসতে অনেক বেগ পোহাতে হয়। বাড়ি থেকে ৩০ কিলোমিটার পথ ভ্যানে পাড়ি দিয়ে আসতে হয় পদ্মা নদীর ঘাট পর্যন্ত। সেখান থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় শিলাইদহ (কুষ্টিয়ার কুমারখালী) ঘাটে পৌঁছতে হয়। এরপর কয়েক দফা গাড়ি পরিবর্তন করে এখানে আসতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ এই পথ আসা-যাওয়ায় আট ঘণ্টা সময় লাগে। আর দুজনের ৬০০ টাকা ভাড়া লাগে। এভাবে টানা আসা-যাওয়ায় আমার মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ছি। যেখানে আমার একদিন কাজ না করলে পেট চলে না, সেখানে কয়েক দিন ধরে কোনো কাজ করতে পারছি না।’

প্রশাসন চাইলে নিরাপত্তা দিয়ে তার মেয়েকে ইবি ক্যাম্পাসেই রাখতে পারত উল্লেখ করে আতাউর রহমান বলেন, ‘এ পর্যন্ত মোট চার দিন আসছি। দেখা গেছে, বিকেলে ফোন দিচ্ছে সকালে আসেন। তখন সকালে কিছু মুখে দিয়েই ভ্যানে করে মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে পড়ি। তবু আসছি। শুধু সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে। মেয়েটা আমার শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে।’

এভাবে টানা ভ্রমণে ক্যাম্পাসে আসতে অনীহা কাজ করছে কি না জানতে চাইলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘না, কোনো অনীহা নেই। সুষ্ঠু বিচারের জন্য আমাদের আসতে হবেই। নির্যাতনের বিচারের দাবিতে আমরা আসব, না আসলে বিচার পাব না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির পর্যালোচনা শুরু : ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটি পর্যালোচনার কাজ শুরু করেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. রেবা ম-লের কক্ষে কমিটির সদস্যরা উপস্থিত হন। এ সময় দেশরতœ শেখ হাসিনা হলের দুই ছাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মার কক্ষে আরেক দফা আলোচনা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুর্শিদ আলম এবং কমিটির সদস্য সচিব একাডেমিক শাখার উপরেজিস্ট্রার আলীবদ্দীন খান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শর্মা বলেন, ‘চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে যে তথ্যগুলো আমরা পেয়েছি, সেগুলোর পর্যালোচনা চলছে। আমরা সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্তের কাজ শেষ করব।’

এর আগে গত বুধবার পর্যন্ত টানা তিন দিন নির্যাতনের শিকার ফুলপরী এবং অভিযুক্ত ছাত্রীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি, ঘটনার রাতে হলে অবস্থানরত প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলেন কমিটির সদস্যরা।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত শারীরিক নির্যাতন করা হয় ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের নবীন শিক্ষার্থী ফুলপরীকে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা এবং তার সহযোগী তাবাসসুম ইসলাম, মোয়াবিয়া জাহান, হালিমা খাতুন ঊর্মি ও ইশরাত জাহান মীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তারা ফুলপরীকে মারধরের পর বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে রাখেন। এ ঘটনার পর সকালে ভয় পেয়ে হল ছেড়ে বাসায় চলে যান ফুলপরী। র‌্যাগিংয়ের নামে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার বিচার ও নিরাপত্তা চেয়ে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রক্টর ও ছাত্র-উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।

বিষয়টি নিয়ে হল প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ইবি শাখা ছাত্রলীগ আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ছাড়াও তদন্ত করছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত