সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বায়ান্নই একাত্তরের ভিত

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:২৪ পিএম

তৌহীদ রেজা নূর। শহীদ সাংবাদিক বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান। প্রজন্ম ’৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এই আলোকিত মানুষ পিএইচডি ডিগ্রি নেন ভারতের জওয়াহেরলাল ইউনিভার্সিটিতে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা বিষয়ে গবেষণা করতে চলে যান স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কে। হঠাৎই দেশে আসা। চলে যাবেন আবার। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রজন্ম’৭১ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহকারী সম্পাদক- তাপস রায়হান ।

দেশ রূপান্তর : ১৯৫২ ও ১৯৭১। বাঙালির এই দুই অর্জনকে কীভাবে দেখেন?

তৌহীদ রেজা নূর : বায়ান্ন হচ্ছে- চেতনার লড়াই। অস্তিত্বের লড়াই। নিজের ভাষাকে, প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। আর ১৯৭১ হচ্ছে অধিকারের লড়াই। স্বাধিকারের লড়াই। সার্বভৌমত্বের লড়াই। একটি জাতির পূর্ণ বিকাশ, স্বাধীনতায়। আমরা সেটা অনেক রক্ত দিয়ে অর্জন করেছি। এর জন্য অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে। এর সব কিন্তু চেতনা থেকেই জন্ম নেওয়া। যার ভিত্তি তৈরি করেছিল ১৯৫২। এই যুদ্ধ কিন্তু শেষ হয়নি। আজও চলছে। চলবে ততদিন, যতদিন সেই আদর্শের পূর্ণ বাস্তবায়ন না হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি তো ‘জেনোসাইড’ নিয়ে গবেষণা করছেন। সেখানে, ভাষা আন্দোলনকে কীভাবে যুক্ত করা হবে?

তৌহীদ রেজা নূর : আমরা যখন, জোনোসাইড বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি- তখন এর প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে ভাষা আন্দোলনও বাদ যাবে না। দুটো তো একই সূত্রে গাঁথা। একাত্তর তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপট নির্মাণে, ভাষা আন্দোলনের বিশাল অবদান। কোনোভাবেই তাকে বাদ রাখা যাবে না।

দেশ রূপান্তর : ভাষাশহীদদের সন্তানও তো, সরকারি সুবিধা পাওয়ার দাবি রাখেন?

তৌহীদ রেজা নূর : অবশ্যই।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু বাস্তবতা কি অন্য কথা বলে?

তৌহীদ রেজা নূর : ঠিক, তা না। অর্জন করার আরও অনেক কিছু আছে। সেগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনি তো, প্রজন্ম ’৭১-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সেই নব্বই দশকের শুরুতে, এই সংগঠন তৈরির কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল?

তৌহীদ রেজা নূর : অবশ্যই ছিল। একটিবার ভাবুন, তখন বাংলাদেশের অবস্থা কেমন ছিল? কেন আমরা বাধ্য হয়েছিলাম, এই সংগঠন দাঁড় করাতে?

দেশ রূপান্তর : এর মানে, জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আপনাদের সংগঠন এরও আগে তৈরি করেছিলেন?

তৌহীদ রেজা নূর : ১৯৯১ সালের অক্টোবরে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। এর ২ মাস পরে, গোলাম আযমকে যখন জামায়াতে ইসলামী, ‘আমির’ বলে ঘোষণা দেয়। তার বিরুদ্ধেই গর্জে ওঠে সবাই। তখনই এগিয়ে  আসেন জাহানারা ইমাম। গড়ে তোলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে কি আমরা, ভাষা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে অনেক দূরে?

তৌহীদ রেজা নূর: না। ঠিক তা নয়। শুধু সরকারের ওপর, নির্ভর করলে চলবে না। দায়, আমাদেরও আছে। যদিও সময়, অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়। যেভাবে দিয়েছে, গণজাগরণ মঞ্চ।

দেশ রূপান্তর : সমাজে কি গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি করার কোনো বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়েছিল?

তৌহীদ রেজা নূর : এছাড়া তো কোনো পথ ছিল না। ওটা তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধাপরাধী আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দেওয়ার দাবিতে। আইনে একটা ফাঁক ছিল। সেই আন্দোলনের কারণেই, আইনের সংশোধন করা হয়। এরপর ফাঁসি দেওয়া হয় তাকে।

দেশ রূপান্তর : আপনার কী মনে হয়, বর্তমানে একাত্তরের শহীদ সন্তানদের আন্দোলন করা জরুরি?

তৌহীদ রেজা নূর : প্রজন্ম ’৭১ তো এখনো আছে। অবশ্যই আন্দোলন করা জরুরি। এটা থাকবেও।

দেশ রূপান্তর : শহীদ সন্তানদের মধ্যেও তো বিভক্তি? বিভিন্ন নামে তাদের সংগঠন। এই বিভক্তি কেন?

তৌহীদ রেজা নূর : দেখেন, এই বিভক্তিটা অনিবার্য। এখানে চেতনাগত, ভাবনাগত, উপলব্ধিগত একটা বিষয় আছে। এটা থাকতে হবে। আপনি যদি মনে করেন, ‘জয় বাংলা’ আওয়ামী লীগের স্লোগান তাহলে তো হবে না। আপনি যদি এটাকে মুক্তিযুদ্ধের ‘রণধ্বনি’ হিসেবে স্বীকার না করেন, তাহলে বিভক্তি আসবেই। আপনার ওরিয়েন্টশন যদি হয় জাসদ ভাবনা, শিবির ভাবনা তাহলে তো হবে না। এরপর আর একসঙ্গে থাকা যায়? তাহলে তো আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে নেই। যখন স্বাধীনতার ২০ বছর পর, আমাদের যখন যাত্রা শুরু হয়- তখন ছিল আদর্শ থেকে বিচ্যুতির সময়।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু এই চেতনা তো পাই, ভাষা আন্দোলন থেকে। মূলত কি তখনই এর শুরু হলো না?

তৌহীদ রেজা নূর : তাতো অবশ্যই। নিশ্চয়ই।

দেশ রূপান্তর : আপনি তো বর্তমানে আমেরিকার নিউ ইয়র্কে ‘জেনোসাইড’ নিয়ে গবেষণা করছেন। এ ব্যাপারে একটু বিস্তারিত বলবেন?

তৌহীদ রেজা নূর :  বিষয়টা হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছিল বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টা করছি। এই জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়ে আমি কাজ করছি। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ‘জেনোসাইড’ এখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। অনেক ক্ষেত্রেই, এটি থাকে অনুচ্চারিত।

দেশ রূপান্তর : শহীদ সন্তান বা পরিবার কি সরকার থেকে কোনো ধরনের, বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে? যেভাবে মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তানরা পাচ্ছেন? 

তৌহীদ রেজা নূর : আমার জানা নেই। আসলে ‘ভাতা’র বিষয়টি আমি যেভাবে দেখি, সেটা হচ্ছে আজ অর্ধশতাব্দী পার হওয়ার পর, সেই সময় যে মানুষটি হত্যার শিকার হয়েছিলেন, সেই মানুষটিই কিন্তু পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। প্রত্যেকেই কিন্তু আমরাসহ এক ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এতদূর এসেছি।

দেশ রূপান্তর : এর মানে ভাষা আন্দোলনে যে চেতনা কাজ করেছিল, মহান মুক্তিযুদ্ধে যে চেতনা কাজ করেছিল- বাস্তবতা সেখান থেকে অনেক দূরে- তাই তো?

তৌহীদ রেজা নূর : না। ঠিক তা না। বাস্তবতা অনেক দূরে, সেটা আমি বলব না। আমাদের অর্জন করার জন্য, আরও অনেক কাজ করার আছে। এই বিষয়টি লালন করার জন্য আরও অনেক কিছু করার আছে। এটা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব না। একজন নাগরিকের দায়িত্বও কম না। এটা একটি পরিবারের দায়িত্ব। শিক্ষাঙ্গনের দায়িত্ব। দায়িত্ব সবার আছে। শুধু রাষ্ট্রের ওপর সব দায় চাপালে ঠিক হবে না। এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্বও রয়েছে। রাষ্ট্র অনেকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই যে, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়টি। এটা অত্যন্ত জটিল এবং এখানে মূল ভূমিকা কে পালন করেছে? শুধু বাংলাদেশ না। সারা বিশে^ই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার বিষয়টি, বেশ জটিল এবং স্পর্শকাতর বিষয়। এটা কিন্তু বাংলাদেশ করতে পেরেছে। এই যে, বীরাঙ্গনাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া- এটাও তো কম বড় বিষয় নয়? কিছু কিছু দুর্বলতা থাকলেও, অনেক বড় বড় কাজ কিন্তু করেছে। আমাদের বড় দুর্বলতার জায়গা হলো- যে চর্চাটা, যে শেকড় থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের চেতনাবোধে সেভাবে লালন করা দরকার। এই চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। এই দায়িত্ব কিন্তু সবার। যদিও আমাদের মধ্যে, দিবসকেন্দ্রিক ভাবনাটা বেশি। এটা গণমাধ্যমে বেশি দেখা যায়। গণমাধ্যমের অনেক সাংবাদিকের মধ্যেও এই চেতনার ঘাটতি আছে। যেমন ধরেন- যে সাংবাদিক ‘বুদ্ধিজীবী দিবস’ কভার করতে এসেছেন- তিনি যথেষ্ট গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে আসেননি। দেখা যায়, একজন শহীদের নামও সে ভুল উচ্চারণ করেছে। আমি জানি না, এটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় । তবে বছরব্যাপী মানুষের মধ্যে একটা রুচি, বোধ এবং মনন তৈরির দায়িত্ব নিতে পারে গণমাধ্যম। অনেক আলোচনা হতে পারে। গবেষণা হতে পারে। 

দেশ রূপান্তর : কিন্তু তা থেকে তো পরিত্রাণ পেতে হবে?

তৌহীদ রেজা নূর : আমি তা বলতে পারব না। এ থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়।

দেশ রূপান্তর : আবার ‘ভাষা’র বিষয়ে ফিরে আসি। এটা তো একটা চেতনা।

তৌহীদ রেজা নূর : হ্যাঁ, চেতনার একটি অংশ।

দেশ রূপান্তর : এই চেতনার পূর্ণ বাস্তবায়ন কি হচ্ছে?

তৌহীদ রেজা নূর : না, পারছি না। বাস্তবায়ন করতে হলে তো, আগে বুঝতে হবে? চেতনার জায়গায় বড় রকমের ঘাটতি আছে। আগে মাতৃভাষাকে আত্মস্থ করতে হবে? নিজের মধ্যে নিতে হবে? নিজেকে তো উন্নত করতে হবে, নাকি? আমাদের বইপত্র, কোর্টকাচারি- সব জায়গায় তো বাংলার প্রাধান্য থাকতে হবে?

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত