মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তবলায় কী বাজে

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৫০ এএম

তবলায় কী বাজে? তাল বাজে। শুনলে আপনা-আপনি মাথা দুলে ওঠে। তাই তো? কিন্তু  ‘সোলো’ বা একক বাদনে তবলাশিল্পী যে গান ফুটিয়ে তোলেন তবলার মৃত চামড়ার গায়ে শ্রোতা হিসেবে সেই গানটিকে, লয়-তালের গ্রাফ্ কাগজে আঁকা, সম্ থেকে সমে আবর্তিত, সূক্ষ্ম  এক সাংগীতিক আনুভূতিক তরঙ্গের মতো করে দেখতে চাইলে অর্থাৎ, তবলার রস পুরোপুরি আস্বাদ করতে চাইলে, শুধু মাথা দোলালে হয় না আরও কিছু বিষয়ে একটু ধারণা থাকতে হয়। 

ভাষা

‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েনে’ আমরা সবাই তবলার ভাষার নমুনা দেখেছি ‘তাগ্-ধিন্ ধিনা ধিন্তা আর নাইকো মোদের চিন্তা’। পাখোয়াজ থেকে পাওয়া তবলার এই ভাষা অতি প্রাচীন। তার ভেতর বর্ণমালা আছে। যেই বর্ণ দিয়ে তবলার ‘শব্দ’ রচিত হয়। শব্দ  দিয়ে হয় ‘বাক্য’। বাক্য দিয়ে ‘কবিতা’। পেশকার, কায়দা, লগ্গী, রেলা প্রভৃতির চেহারা প্রায় কাপ্লেটের মতো। জোড়ায় জোড়ায় আসা ফ্রেজ নির্দিষ্ট তালের বন্ধনে আবদ্ধ। প্রতিটা বন্দিশ বা রচনার প্রথম বাক্যটি এমন যে, তবলায় বাজালে ধ্বনির একটা বিশেষ জ্যামিতিক থিম্ ফুটে উঠবে। তারপর সেই থিম্ বজায় রেখে বিস্তার হবে। দীর্ঘ আলুলায়িত পয়ারের মতো। আস্তে আস্তে একটা গল্প, একটা ছবি ফুটে উঠবে। সূক্ষ্ম, নাজুক, বিমূর্ত উপায়ে।

তবলার গায়ে আঙুল ফেলে ফেলে উৎপন্ন প্রতিটা ধ্বনি একেকটা ‘সিলেবল্’। নিজস্ব নাম আছে তাদের। ডান হাতের তর্জনীর মাথা ‘ডাইনা’-র ‘কিনারে’ (ছোট, treble ড্রামটির periphery অংশে) ফেললে যে স্বর বা মিউজিক্যাল নোট উৎপন্ন হয়, তার নাম ‘না’। ডাইনার ‘সুর’ নামক অংশে (‘কিনার’ ও ‘চাঁদির’ মধ্যবর্তী) আঘাত করলে যে নোট বাজে, তার নাম ‘নি’ ইত্যাদি। যাই বাজবে তবলায়, তার প্রতিটি ধ্বনি তবলা ভাষার কোনো না কোনো সিলেবল্ দিয়ে প্রকাশ করা যাবেই যাবে। যদি না যায়, সেই বাজনায় গোঁজামিল আছে।

 ছন্দ

একটা তালের প্রাথমিক ও পোশাকি পরিচয় পাওয়া যায় মাত্রা গুণে, আর গভীর পরিচয়টা পাওয়া যায় তার মাত্রাবিভাগে। রাগের যেমন ‘চলন’ থাকে, তালের থাকে ছন্দ (groove)। পর্বভাগ মারফত যা নির্দিষ্ট হয়। যেমন রূপক তালের পর্ববিভাগ ৩।২।২। অর্থাৎ, রূপকের আছে তিনটি পর্ব। প্রথম পর্ব ৩ মাত্রা, দ্বিতীয়টি ২, শেষটিও ২।

image

ছন্দের চরিত্র গঠন করে, এমন আরেকটা বিষয় হচ্ছে ‘তালি’ ও ‘খালি’। তালি হলো সেই যৌগিক সিলেবল খোলা বায়া (open bass) ও ডাইনার treble মিলিত বাদনে যা উৎপন্ন। এবং ‘খালি’ নির্দেশ করে সেই সিলেবল, যেখানে শুধু ডাইনা বাজে, বায়া (bass) বন্ধ থাকে। তবলায়, নানা মাত্রার স্থলে, খোলা বায়ার (open bass) উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে ছন্দের গতিপ্রকৃতি ফুটে ওঠে। এই ‘ত ালি’ ও ‘খালি’ বিশ্বসংগীতে তবলার দান।     

লয় 

সরলার্থে, লয় হচ্ছে মাত্রার গতিবেগ। মেট্রোনোমে লয় নির্দিষ্ট হতে পারে। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা যেমন এক সেকেন্ড পর পর ঘোরে, মেট্রোনোমে তেমনি একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর একটা করে মাত্রা (নবধঃ) বাজে। ওস্তাদ শিল্পীরা ওনাদের স্নায়ুর ভেতর একটা লয় একবার স্থির করে বসিয়ে নিলে, সেই লয় আর নড়চড় করে না। একই বেগে চলতে থাকে। একে বলে ‘লয়দার’ অবস্থা। লয়দার হওয়া ‘লয়কার’ হওয়ার পূর্বশর্ত। 

লয়কারী

ধরা যাক একটা যেকোনো লয় আপনি ঠিক করে নিলেন আপনার মেট্রোনোমে। ধরা যাক ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাই আপনার সেই লয়ের মেট্রোনোম। এবার প্রতি সেকেন্ডে যদি আপনি একটা করে তালি দেন, সেটা হবে ‘বরাবর’ লয়। ২ সেকেন্ডে ৩টা তালি দিলে তা ‘দেড়িয়া’ বা ‘আড়’ লয়। সেকেন্ডে দুটা করে তালি দিলে হবে ‘দ্বিগুণা’। তিনটা করে তালি দিলে ‘ত্রিগুণা’ ইত্যাদি।

এবার, তালি দিয়ে দিয়ে যে কাজটা আমরা করলাম, তবলায় একটা নির্দিষ্ট তালের সাপেক্ষে সেই কাজটা করা হবে কীভাবে? একইভাবে! শুধু একেকটা তালির বদলে, তবলার সিলেবল দিয়ে তৈরি ফ্রেজ বাজবে! কোনো নির্দিষ্ট তালে বাঁধা বন্দিশ- কায়দা, টুকরা, গৎ, চক্রদার ইত্যাদি রচনার অংশ হিসেবে। একটা নির্দিষ্ট লয়ের জমিনে সম্পাদিত এরূপ লয়কারীর মাধ্যমে তবলায় অপরূপ সাংগীতিক মূর্ছনা তৈরি সম্ভব। সুরের মেলোডি যেমন তৈরি হয় সা রে গা মা... অর্থাৎ মিউজিক্যাল নোটের ভেতর বিচরণের মাধ্যমে, তেমনি তবলায় লয়ের মেলোডি তৈরি করা সম্ভব, এক ছন্দ থেকে আরেক ছন্দে বিচরণের মাধ্যমে।   

উপজ্

গান-বাজনার যেকোনো পরিণত ফর্মের মতো তবলাও চিন্তানির্ভর, বৈজ্ঞানিক একটা শাস্ত্র। কোনো শর্টকাট নাই। ফাঁকিবাজির রাস্তা নেই। দীর্ঘ, নিমগ্ন সাধনা ছাড়া উন্নতি অসম্ভব। অপূর্ব সব ম্যাটেরিয়ালের শপিংমল বানিয়ে রেখে গেছেন তবলার ছয় ঘরানার পণ্ডিতরা। শিখতে শিখতে বিদ্যার্থী একসময় তাল বিষয়টা ‘চোখে দেখতে’ visualize) শুরু করে। আরও শিখতে শিখতে একসময় চোখে দেখতে শুরু করে ‘লয়’ বিষয়টাকে। এরপর, ধীরে ধীরে, শাস্ত্র আর টেকনিকের স্তর পার হয়ে, প্রকৃত সংগীতের জগতে গ্র্যাজুয়েট করে সে। নিজেও নানান বন্দিশ, পাল্টা ইত্যাদি রচনা করতে শুরু করে। improvised বাজনার স্তরে পৌঁছায়। এর নাম ‘উপজ্’ অঙ্গ।  

জাকির হুসেইন প্রমুখরা এত মহান, তার অন্যতম কারণ এই উপজ্ অঙ্গে ওনাদের অবিশ্বাস্য সাবলীলতা। মঞ্চে বসে, কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই, যাকে বলে  on-the-spot, লয়তালের মেলবন্ধন বজায় রেখে, বিস্ময়কর পর্যায়ের সুন্দর সব রচনা, রীতিমতো ‘নাজিল’ করে করে অবলীলায় বাজিয়ে ফ্যালেন ওনারা।  

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত