রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সঙ্গী নির্বাচনে করণীয়

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৩, ১১:০৫ পিএম

মানুষ স্বভাবতই সঙ্গীপ্রিয়। সঙ্গী ছাড়া জীবন চলে না। আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতে ডুবে ছিলেন। কিন্তু তার একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য সেখানেও আল্লাহতায়ালা সঙ্গী হিসেবে হজরত হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করে তার জীবন মধুর করেছিলেন। সুতরাং সঙ্গী হলো জীবনের একটি মধুর পার্ট। জীবনের প্রতিটি ধাপে ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীর প্রয়োজন পড়ে। সঙ্গীর প্রভাবও থাকে জীবনের ওপর খুব বেশি। বিশেষ করে যৌবনকালে। চলাফেরা, ওঠাবসা, পোশাকপরিচ্ছদ থেকে শুরু করে জীবনের গভীর অনেক বিষয়ে সঙ্গীর আদর্শ সঙ্গীকে প্রভাবিত করে। এ বাস্তবতার কারণে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মানুষ তার সঙ্গীর আদর্শে প্রভাবিত হয়। তাই তাকে অবশ্যই চিন্তাভাবনা করে সঙ্গী গ্রহণ করতে হবে।’জামে তিরমিজি : ২৩৭৮

সঙ্গীর কারণে কেউ উৎকৃষ্ট হয় আবার কেউ নিকৃষ্ট হয়। দুনিয়ার জীবনে তা যেমন সত্য ও পরীক্ষিত; পরকালীন জীবনেও তার প্রতিফল অবধারিত। দুনিয়ায় অসৎ সঙ্গ ও খারাপ সঙ্গী গ্রহণের কারণে পরকালে অনেকে লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নাম ভোগ করবে। আবার অনেকে সৎসঙ্গ ও ভালো সঙ্গী গ্রহণের কারণে পরকালে প্রশংসিত হয়ে জান্নাত উপভোগ করবে। কোরআন মজিদে এসেছে, ‘হাশরের দিন জালিম নিজের হাত দুটো কামড়িয়ে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে থেকে পথ অবলম্বন করতাম। হায় আমার দুর্ভোগ! আমি যদি অমুককে সঙ্গীরূপে গ্রহণ না করতাম। অবশ্যই সে আমাকে উপদেশ-বাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল।’সুরা ফুরকান : ৩৭-২৯

সৎ ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত টেনে নবীজি (সা.) বলেন, ‘সৎ সঙ্গী আতরওয়ালার মতো আর অসৎ সঙ্গী হাপরওয়ালার মতো। আতরওয়ালা হয় তোমাকে ফ্রি-তে আতর দেবে, না হয় তুমি তার থেকে কিনে নেবে। তা না হলে অন্তত লোকটি থেকে তুমি সুঘ্রাণ হলেও পাবে। আর হাপরওয়ালা তোমার কাপড় পুড়াবে অথবা তার থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে।’সহিহ মুসলিম : ২৬২৮

সঙ্গী বা বন্ধু নির্বাচনে প্রথমে ইমানকে গুরুত্ব দিতে হবে। মুমিন ও কাফেরের মধ্যে কোনো বন্ধুত্ব হতে পারে না। তাই তাকে সঙ্গী বানানো কোনো মুমিনের জন্য ঠিক হবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা তোমরা মুমিনদের ছেড়ে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না।’সুরা আন নিসা : ১৪৪

অন্যত্র বলেন, ‘হে ইমানদাররা তোমরা ইহুদি খ্রিস্টানদের সঙ্গীরূপে গ্রহণ করো না। কারণ তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের কেউ তাদের সঙ্গীরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।’সুরা মায়িদা : ৫১

ইমানের পর সঙ্গী নির্বাচনে খেয়াল করতে হবে ব্যক্তির সততার প্রতি। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘সততা সৎকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে আর সৎকাজ মানুষকে জান্নাতের প্রতি পথনির্দেশ করে... আর মিথ্যা পাপের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। পাপ মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়...।’সহিহ বোখারি : ৬০৯৪

তাই আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আর সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’সুরা তওবা : ১১৯

প্রসিদ্ধ নসিহতের কিতাব তালিমুল মুতাআল্লিমে লেখক আল্লামা বুরহানুদ্দীন জারনুজি (রহ.) ছাত্রদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘সহপাঠী বা সঙ্গী নির্বাচনে তোমাদের কর্তব্য হলো সৎ, পরিশ্রমী, শান্ত মেজাজ ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তিকে খুঁজে নেওয়া এবং অলস, অকর্মণ্য, বাচাল, ঝগড়াটে ও ফেতনাবাজ থেকে বিরত থাকা।’ সঙ্গীর গুণে ব্যক্তির মর্যাদা কতটা বাড়ে তা সাহাবায়ে কেরামদের জীবনের দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময়কার আরবের অসভ্য, যাযাবর বেদুইনরা আল্লাহর রাসুলের সঙ্গ পেয়ে সোনার মনীষীতে পরিণত হয়। নবী-রাসুলদের পরে তারা ওঠেন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষ।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নবীজির সঙ্গ বেশি পাওয়ার কারণে তিনি হয়ে গেলেন নবীদের পর দুনিয়ার সব মানুষ থেকে বেশি মর্যাদাবান। সঙ্গীর গুণে শুধু মানুষ নয় ইতর-প্রাণীর মর্যাদাও বাড়তে পারে। আসহাবে কাহাবের কুকুর সঙ্গীগুণে বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। হজরত সুলাইমান (আ.)-এর হুদহুদ পাখি, নবীজির কাসওয়া উটনীসহ অনেক কিছুই সৎ সঙ্গের প্রভাবে ইতিহাস হয়ে আছে। অতএব সৎ সংসর্গ ও সৎ সঙ্গী গ্রহণ করাই মুমিনের কর্তব্য।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত