রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কালোবাজারিদের কপালে ভাঁজ

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৩, ০২:২০ এএম

গন্তব্য কমলাপুর রেলস্টেশন। গুগল ম্যাপ জানাচ্ছে বাসে যেতে সময় লাগবে ৩৫ মিনিট আর হেঁটে এক ঘণ্টা। বাসে উঠে শাহবাগের জ্যাম দিয়ে শুরু। এরকম আরও কয়েকবার জ্যাম ও সিগন্যাল পেরিয়ে ১ ঘণ্টা ১১ মিনিট পর মতিঝিল পৌঁছলাম। জ্যামে আর বসে থাকতে ইচ্ছে হলো না। তাই এখানে নেমে গিয়ে বাকিটা পথ হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি যখন কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছলাম তখন বিকেল ৪টা ৩ মিনিট।

স্টেশনে ঢুকতেই চোখে পড়ল বড় করে লেখা ‘ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন’ সাইনবোর্ডে। মুহূর্তেই থমকে দাঁড়ালাম। ভুল করে অন্য কোনো স্টেশনে চলে এলাম না তো। জানি না আমার মতো এমন করে আর কেউ বিভ্রান্ত হন কি না। তবে যারা প্রথমবার আসেন তাদের নিয়ে এরকম বিভ্রান্তি হলেও হতে পারে। আসলে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনটি বহুকাল ধরেই কমলাপুর রেলস্টেশন নামেই পরিচিত।

মনের দ্বিধা দূর করে পা বাড়ালাম। একটু সামনে এগোতেই কানে এলো রিকশা, বাইক আর সিএনজিচালিত অটোরিকশা ড্রাইভারদের চিল্লাচিল্লি। এই মামা কই যাবেন, মামা চলেন যাই। চালক-যাত্রী দেনদরবার। ঢাকা শহরে বাসিন্দাদের দৈনন্দিন সমস্যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভাড়া বিড়ম্বনা। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। এক যাত্রী স্টেশন থেকে মিরপুর-১ যেতে মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে দেনদরবার করছেন। যাত্রীর দাবিঅ্যাপসে যা আছে তাই দেবেন। চালক পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেনএখন অফিস টাইম, রাস্তায় জ্যাম, তাই ভাড়া বেশি। ভাড়া নিয়ে অন্য যাত্রী ও ড্রাইভারদের দরকষাকষি পেছনে রেখে আমি সামনে পা বাড়ালাম।

এর মধ্যে চোখে পড়ল কয়েকটি ছেলে হাতে আমড়া, বরই, পেয়ারা, ঠান্ডা পানি হাতে নিয়ে, বিক্রির চেষ্টা করছে। কথা বলতে চাইলে একজন জানাল, এখন কথা বলার সময় নেই। ট্রেন আসছে। যাত্রীরা স্টেশন থেকে বের হবে। বিক্রি করতে হবে বলেই সে চলে গেল।

স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে পা ফেলতেই মনে পড়ল আজ ১ মার্চ থেকে নতুন পদ্ধতিতে টিকিট দেওয়া হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে অনলাইনে এবং অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে। টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধ, বিনা টিকিটে ভ্রমণে জরিমানা করা এবং ভাড়া আদায় সহজ করার লক্ষ্যে এমন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

রেলযাত্রীদের একটা বড় অংশ প্রযুক্তি সুবিধার বাইরে, তাদের অনেকের অনলাইনে বা অফলাইনে নিবন্ধন বা লগ ইন করার পদ্ধতি জানা নেই, ডিভাইস নেই, ইন্টারনেটের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা নেই। নতুন পদ্ধতিতে টিকিট নিয়ে মানুষের ভাবনা, অভিজ্ঞতা আর বিড়ম্বনার কথা শুনতে চাই।

এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম, তার অ্যানড্রয়েড মোবাইল নেই। মগবাজারের একটা কম্পিউটারের দোকান থেকে ৫০ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়েছে। প্রতিমাসে তিনি কয়েকবার ট্রেনে যাতায়াত করেন। এখন ট্রেনে চড়তে হলে প্রতিবার তার কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। যদিও পাশের যাত্রী জানালেন নতুন পদ্ধতিতে টিকিট চালু হওয়ায় ভালো হয়েছে। এখন কালোবাজারিরা টিকিট নিলেও বিক্রি করতে পারবে না। যার যার এনআইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। ট্রেনে ভ্রমণের সময় এনআইডির ফটোকপি দেখাতে হবে, ফলে টিকিট কালোবাজারিদের দিন শেষ।

আজ টিকিট অন্যরকম। মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিচ্ছে। আশপাশে কোনো দালাল নেই। আরএনবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা যাত্রীদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন। ১৪ নম্বর টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম, টিকিট বিক্রির দায়িত্বে নিয়োজিত এক মহিলা কাউন্টারে এক তরুণকে, তার এনআইডি সঙ্গে আছে কি না জানতে চাইলেন। বুঝলাম, কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। একটু সময় নিয়ে কয়েকবার কম্পিউটারে যাচাই করে জানালেন, আপনার নিবন্ধন হয়নি। ৭ নম্বর কাউন্টারে গিয়ে আবার নিবন্ধন করে নিয়ে আসুন।

প্রায় প্রতিটি কাউন্টারের সামনে বাংলা ও ইংরেজিতে কাউন্টার টিকিটের জন্য ব্যবহারকারী নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে লেখা বিজ্ঞাপন আছে।

টিকিট কাউন্টার পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশে পা বাড়ালাম। প্রবেশপথেই দেখা মিলল ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক ও টিকিট কালেকটর গ্রেড-২ কর্মকর্তাদের তৎপরতা। টিকিট ছাড়া তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। যাদের টিকিট নেই তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে বলা হচ্ছে। একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, টাকার বিনিময়ে বা অন্য কোনো উপায়ে তারা কাউকে প্রবেশ করতে দেন কি না সেটা দেখার জন্য। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম তারা আজ সততার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে টাকা দিয়ে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে চায়নি বিষয়টা এমন নয়, তবে তারা প্রলোভনে রাজি হননি।

এর মধ্যে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন ট্রেনটি ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দেখলাম প্রতিটি বগির দরজা আটকানো। বাইরে দাঁড়িয়ে অ্যাটেনডেন্ট টিটিইরা টিকিট চেক করে তারপর যাত্রীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন।

কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে প্ল্যাটফর্মের দূরত্ব অনেক বেশি। ভিড়ের মধ্যে বাচ্চাদের টেনে নিয়ে যাওয়া কিংবা তুলনামূলকভাবে যাদের বয়স একটু বেশি কিংবা শরীর অসুস্থ তাদের জন্য এ যাত্রাপথ কিন্তু বেশ ভোগান্তির। প্ল্যাটফর্ম কাছাকাছি হলে সুবিধা হতোএমন কথা জানান আনোয়ার হুসেন নামে এক যাত্রী। তিনি জানান, আপনাদের মতো বয়স থাকতে মাইলের পর মেইল হেঁটে গিয়েছি। দুই হাতে ব্যগ নিয়েও গিয়েছি। কিন্তু এখন শরীরের বল কমে এসেছে, সহজে ক্লান্ত হয়ে যাই।

কথা শেষ করতেই চোখে পড়ল লাল জামা পরিহিত এক কুলির সঙ্গে ঝগড়ার সুরে কথা বলছেন এক মধ্যবয়সী। তার সঙ্গে অনেকগুলো মালামাল। সেগুলো  নিয়ে যেতে টাকার পরিমাণ নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসের হুইসেল বেজে ওঠে। গন্তব্যে যেতে যাত্রীরা উঠে বসেছেন ট্রেনে। ট্রেনের চাকা ঘুরতে শুরু করে। আমি ফিরে যাই আমার গন্তব্যের পথে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত