মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চিকা থেকে গ্রাফিতি

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৩, ১২:৪৫ এএম

‘চিকা মারা’ এমন একটা শব্দ চালু আছে আমাদের দেশে। দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই। পাকিস্তানি সামরিক শাসনের কারণে দেয়ালে লেখা যখন নিষিদ্ধ, তখন চিকা মারা দিয়ে দেয়াল-লেখাকেই বোঝানো হতো। পরে পাকিস্তানি সামরিক শাসন গেলেও শব্দটা যায়নি। তবে চিকার সেই জৌলুশ আর নেই। এখন সরকারি সংগঠনও চিকা মারে। একদা বাম সংগঠনের বিপ্লবী বুলি শাসকরাও বলেন। আরও রঙিন করে। তাই আজকে গ্রাফিতি বলতে আমরা যা বুঝি, চিকা তার জায়গায় নেই।

‘কষ্টে আছে আইজুদ্দিন’ সম্ভবত এখানকার প্রথম জনপ্রিয় গ্রাফিতি। গ্রাফিতিই বলছি কারণ, আশির দশকের কে বা কার লিখে রাখা এই তিন শব্দ যেন নানান কিছুকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে। একজন আইজুদ্দিন, হয়তো তিনি নদীভাঙা মানুষ, ঢাকা শহরে রিকশা চালান অথবা বাসের হেল্পার। অথবা অন্য কেউ। এক আইজুদ্দিন এভাবে অনেক হয়ে উঠেছিলেন। এই আইজুদ্দিনের পর ‘সুবোধ’ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় গ্রাফিতি। সময়ের বিচারে সাম্প্রতিকও অনেক। তবে বিচার করলে আইজুদ্দিনের মতন সুবোধ, দেশের সীমানা পার হয়ে কলকাতায় পর্যন্ত জনপ্রিয়তা পেলেও তা মূলত মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিতে। সমাজের সর্বস্তরে বিস্তৃতি পায়নি। আইজুদ্দিনের বিচরণ ক্ষেত্র যেখানে রেললাইনের বিস্তর পাশের দেয়াল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, সুবোধ সেখানে ঢাকা শহরের সচ্ছল জায়গাগুলোতে মাত্র। এই সচ্ছল এরিয়ার সীমানাও সংকুচিত ছিল অনেক। এই সংকুচিত হয়ে ওঠার একটা সাংস্কৃতিক দিক আছে। এই দিকটাতে নজর পড়া জরুরি। আমরা প্রথমত সুবোধের নামের দিকে তাকাই। সুবোধ এই রাষ্ট্রের হিন্দু-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর যে কারও নাম যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে মানুষের ভালো চিন্তা-মানসিকতার আরেকটা প্রতিশব্দ। এই যে নামের ওপেননেস এটা ভালো দিক বটে, তবে তা সমাজের বিশাল একটা অংশকে আলাদা করে ফেলে। আলাদাকরণটা ধর্মীয়ভাবে ঘটে না, ঘটে জানাশোনার দিক থেকে; সুবোধ শব্দটার মিনিং না জেনে এর সঙ্গে একাত্ম হতে গেলে, খোদ সুবোধের দিক থেকেই বাধা আসবে। সুবোধের নাম বাদে আর যা যা সিম্বল সুবোধের সঙ্গে সঙ্গে থাকে, তা একটা খাঁচা আর সূর্য। খাঁচার ভেতরে সূর্য বন্দি। আর তা-সহই সুবোধ পালাচ্ছে। সূর্য কেন? সূর্য কি মুক্তির প্রতীক এখানে? যদি তা হয়, তা বেশ ক্লিশেই হয় বলতে গেলে। তার পরও সুবোধের এত জনপ্রিয়তার পেছনের কারণ কী? এর একটা পদ্ধতিগত কারণ হতে পারে : এর আগে এত বড় মানে লাইভ সাইজের ফিগারের গ্রাফিতি এখানে আগে হয়নি। আর আঁকার যে ধরনও তা আমাদের দৃশ্যগত বাস্তবতার কাছাকাছি, সঙ্গে সুবোধ তুই পালিয়ে যার মতো আবেগরা বাক্য থাকার কারণে তা দ্রুতই এ সমাজের নানান কিছু থেকে ক্রমেই পলায়নপর মানুষের কাছে নিজের প্রতিবিম্ব হয়ে ধরা দিয়েছে, ফলত জনপ্রিয় হয়েছে; ভাইরাল হয়েছে। কিন্তু গ্রাফিতির যে চর্চিত ইতিহাস, যে উৎস থেকে গ্রাফিতি শব্দটা উড়ে এ মুল্লুকে প্রবেশ করেছে, তার সঙ্গে মেলালে সুবোধ বাংলাদেশের বাম রাজনীতির যে ঐতিহ্যগত দেয়াল লেখার অভ্যাস, তারই আত্মপ্রকাশহীন স্মৃতিচারণ এক প্রকার।

image

সুবোধ তো স্বীকৃত গ্রাফিতি। এর বাইরে দীর্ঘ গ্রাফিতির চর্চা এখানে বিরাজমান। আরও বৈচিত্র্যময় গ্রাফিতি আমাদের আশপাশেই মূর্তিমান। যেমন : সম্প্রতিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খুব ট্রেন্ডি ‘সহমত ভাই’ নিয়ে করা কয়েকটা গ্রাফিতি ভাইরাল হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ব্যবহার করে করা সেই গ্রাফিতি পরদিন সকালেই মুছে দিতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। বাড্ডার রাস্তায় ‘বাগের দুদ খেয়ে তোমাকে বালোভাশবো’ এ রকম ভুল বানানে লেখা চিঠির মতন ‘ভুল’ গ্রাফিতি বা চট্টগ্রামের ‘দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দিব’ বা ‘টু মাচ কপস, টু লিটল জাস্টিস’র মতন গ্রাফিতিও চোখে পড়েছে। বা তারও আগে রবীন্দ্রনাথকে পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া কালো সেপাই বা ন্যুড রবীন্দ্রনাথ আরেক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেই সেক্স করার গ্রাফিতি বা ঢাকার চারুকলার ভেতরে দেয়ালে নিজের মাথায় নিজে বন্দুক ধরা গৌতম বুদ্ধ যেন সব দিক থেকেই আমাদের অভ্যস্ত রুচি-শান্তিকেও আঘাত করে, যা বুঝি গ্রাফিতিরই স্বভাবটাই এমন। অনেকটা যেন জুতার ভেতর ঢুকে পড়া কাঁকড়। আপনার আমার স্বস্তিকে সে নানানভাবে অস্বস্তিতে ফেলতে চায়। এই অস্বস্তিটুকুই মূলত চিকা আর গ্রাফিতির তফাৎ। তাই যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠনের তৎপরতার চেয়ে অনেক বেশি বেশি রাজনৈতিক সড়ক আন্দোলনের ছাত্রদের দোকানের শাটার, পার্ক করা গাড়ি বা এটিএম বুথে লিখে দেওয়া ‘নো ভ্যাট’ টেকস্ট। যাদের এত দিন এপলিটিক্যাল ট্যাগ লাগানো হয়েছিল, তারাই যেন সবক দিয়ে দিল আন্দোলনের ধরন-ধারণের। তার আগে এবং পরে আরও নানান রকম গ্রাফিতি আমাদের সামনে এসেছে। এর মধ্যে শিল্পীর পরিচয়সহ গ্রাফিতি যেমন ছিল, তেমনি অপরিচিত শিল্পীরও। ছিল রাষ্ট্রকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা ‘মাইকেল চাকমা কোথায়’ বা ‘শরিয়ত বয়াতির মুক্তি চাই’র মতন স্টেনসিলে লেখা দাবিও। চিকা মারার ট্র্যাডিশনাল আর্টিস্ট যখন কাব্যিক স্বরে (সুবোধও যেমন) ‘রক্তে আমার সাগরদোলার ছন্দ চাই, অসুরের সঙ্গে আপসহীন দ্বন্দ্ব চাই’ লিখতেছেন, তখন কেউ একজন বিসিএসের বিজ্ঞাপনের ওপর লিখে দিচ্ছেন ‘পড়াশোনার মায়েরে ...’। এটাই পার্থক্য একটা সুবোধ ‘চিকা’র সঙ্গে দগদগের গ্রাফিতির। তথাকথিত সভ্যতার আচার-বিচার নিয়ে যার কোনো প্যারা নেই।

আরেক ধরনের গ্রাফিতি দেখা যায় গুলশান-বনানীর মতন সম্ভ্রান্ত এলাকায়। এ রকম একটা গ্রাফিতি : ‘Follwo the white rabbit’. গুলশানের এই গ্রাফিতি বুঝতে গেলে আপনার মিনিমাম ‘এলিস ইন ওয়ান্ডার ল্যান্ড’ পড়া থাকতে হবে আর না হয় ‘ভি ফর ভেন্ডেটা’ দেখার অভিজ্ঞতা। তার পরও গুলশান-বনানীর মতন কড়া নিরাপত্তার এলাকার দেয়াল বা সুনসান পরিবেশ নষ্ট করার যে চাপা নৈরাজ্য, নৈরাজ্যের সাহস মূলত এটাই গ্রাফিতির স্পিরিট।

আরেক রকম গ্রাফিতি আছে, যা এখনো মূলধারার গ্রাফিতির যে মর্যাদাবোধ তার বাইরে দাঁড়িয়ে। গতানুগতিক গ্রাফিতির চেয়ে ব্যক্তিগতও অনেক, নৈরাজ্যপূর্ণ তো বটেই। এ রকম গ্রাফিতিই আমরা হামেশাই দেখি। হ্যাঁ, টয়লেট টেক্সেটের কথাই বলছি। যে রাজনৈতিক দল-ব্যক্তি নিয়ে কথা বলা মানা, আইনত দণ্ডনীয়, তাকে নিয়েও অনায়াসে যা তা লিখে দেওয়া হয় প্রাকৃতিক কর্ম সারতে সারতে। পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের দাঁড়িপাল্লায় তা অনেক ক্ষেত্রে আপত্তিকর ঠেকতে পারে। তবে স্বীকার করতেই হবে ব্যক্তির নিজেকে প্রকাশের যে এ সীমাবদ্ধতা-অবদমনটুকু এই সমাজ-রাষ্ট্রেরই তৈরি। তাই আঙুল তুললে সমাজ-রাষ্ট্রের ক্রমশ এগিয়ে আসা দেয়ালের দিকেই আগে তুলতে হবে। আরেকটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই যে নিজেকে লিখে দেওয়ার অভ্যাস, তা সভ্যতার সমান পুরনো। তাই দেখা যাবে তাজমহল বানিয়েছিল যে শ্রমিক, আঙুল কেটে নেওয়ার আগে, গোপনে সেও কোথাও লিখে দিতে চেয়েছিল তার নাম, লিখে দিয়েছে মিসরের পিরামিডে, চীনের গ্রেটওয়ালে বা বার্লিন প্রাচীরে বা কয়েদখানা দেয়ালে; যে কোনো দিন ছবি আঁকেনি, লিখতে-পড়তে জানে জানে না, গারদে বন্দি থাকতে থাকতে সেও আঁকতে চেয়েছে তার মেয়ের মুখ, মায়ের নাম; কয়লা ঘষে ঘষে। এটাই সভ্যতার ইতিহাস। তাই গ্রাফিতিকে বুঝতে গেলে আমাদের টাকার গায়ে লিখে দেওয়া ‘আসমা তোমাকে ভালোবাসি’ যেমন বুঝতে হবে, তেমনি বুঝতে হবে নামকরা গ্যালারির লিফটে লিখে দেওয়া ‘ফাক দ্য শিট’ও। তবেই বিদ্যমান সময়কে আরও একটু স্পষ্ট বোঝা যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত