মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গতি নিয়ে নাখোশ বাইকাররা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৩, ০৪:১৮ এএম

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার। এরই মধ্যে ঢাকাসহ শহরের ভেতরে মোটরসাইকেলের সর্বোচ্চ গতি ৩০ কিলোমিটার করাসহ বেশ কটি খসড়া নীতিমালা করতে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু খসড়া এই নীতিমালায় ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে বলে দাবি করছেন বাইকাররা। তারা খসড়া এই নীতিমালার কিছু সংশোধনের দাবি জানান।

বাইকাররা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার একটি ভালো উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য। কিন্তু শহরে একই রাস্তায় দুই ধরনের গতিতে চললে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ মোটরসাইকেল চলার জন্য শহরে সেভাবে লেন নেই। তাই এত কিছুর পরও যানজটের শহরে তবুও প্রয়োজন মোটরসাইকেল।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র খসড়া এই নীতিমালা বিষয়ে জানা যায়, বাংলাদেশে বিক্রয়, বিপণন ও সড়কে চলাচলকারী প্রায় সব মোটরসাইকেলই স্পোর্টি শ্রেণির, যা অপেক্ষাকৃত দুর্ঘটনাপ্রবণ। অন্যদিকে স্কুটি মোটরসাইকেল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। এজন্য নীতিমালায় স্কুটি মোটরসাইকেলের প্রসার এবং স্পোর্টির ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের চালককে কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক নির্ধারিত পোশাক ও রঙের হেলমেট পরিধান করার কথা বলা হয়েছে। আর জরুরি প্রয়োজনে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দূরের পথে মহাসড়কসহ সর্বত্র মোটরসাইকেলের চলাচল দেখা যায়। বিশেষ করে উৎসবের সময় মোটরসাইকেলের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই ঈদ বা দুর্গাপূজার মতো উৎসব বা পার্বণকালীন সময়ে ১০ দিন জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলতে পারবে না। যেকোনো সড়কে গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মোটরসাইকেলের আরোহী হিসেবে নেওয়া যাবে না।

এই খসড়া নীতিমালা তৈরিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), পুলিশ এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা কাজ করেছেন।

মো. যুবায়ের নামে এক বাইকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, যানজটের শহরে বাইক ২৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার গতিতে বেশির ভাগ সড়কে চলাচল করা হয়। অনেক সড়কে আবার ২০ কিলোমিটার গতিতেও চলাচল করা যায় না যানজটের জন্য। তবে যখন রাস্তা স্বাভাবিক থাকে তখন নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী মোটরসাইকেল ৩০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করলেও প্রাইভেট কার এই গতিতে চলবে না। তখন দুর্ঘটনার একটা আশঙ্কা রয়ে যাবে নতুন এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা অধরা ইয়াসমিন নামে এক নারী আড়াই বছর ধরে ঢাকায় স্কুটি চালায়। তিনি জানান, ‘গণপরিবহনে নারীদের যাতায়াতে হেনস্তার ঘটনার জন্য গণপরিবহনে ওঠা এক ধরনের হয়রানি। তার মধ্যে আবার গণপরিবহনে ভাড়া-নৈরাজ্যের স্বীকার হতে হয়। এজন্য গণপরিবহনে ব্যবহার না করে বিকল্প বাহন হিসেবে মোটরসাইকেল ও স্কুটি ব্যবহার করে অনেক নারী। এখন গতির বিষয় যে নিয়ম মানতে বলা হচ্ছে এই নিয়ম মানতে হলে বাইকারদের জন্য আলাদা লেন করে দেওয়া হোক।

নতুন এই নিয়মে শহরে বাইক চললে অন্য গাড়ির গতি কমে যাবে বলে দাবি করেন প্রাইভেট কারচালক মো. জাকির হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, শহরে মোটরসাইকেলকে যদি সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গতি সীমাবদ্ধ করে, তাহলে আমাদের প্রাইভেট কারসহ অন্য যানবাহনের গতি কমে যাবে। তখন আরও যানজট বাড়বে।

পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মো. রজ্জব আলী জানান, মোটরসাইকেল খসড়া নীতিমালার নামে চালকদের যেন হয়রানি না করা হয়, সেদিক বিবেচনায় আনা দরকার। এখন ঈদের সময় গণপরিবহন ভালোভাবে ব্যবস্থা না করে মোটরসাইকেল বন্ধ করার কথা বলছে। এগুলো তো বাস মালিকদের স্বার্থের জন্য করা হলো না?

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে দিনের পর দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে। এটা সবাই বিভিন্ন সময় আমাদের প্রতিবেদনে দেখে আসছে। কিন্তু নতুন যে নীতিমালার কথা বলা হচ্ছে এগুলো কি ভালোভাবে মনিটরিং করা হবে? আর আগে যে নীতিমালা ছিল সেগুলো তো সেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। তার মধ্যে নতুন যে নীতিমালা করা হয়েছে তার মধ্যে ঈদের সময় বন্ধের ছুটিতে মোটরসাইকেল চালানো যাবে না। কিন্তু তার আগে তো যাত্রীদের জন্য সে সময়ে গণপরিবহনের ভালোভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে বন্ধ করার তো কোনো মানে নেই। তবে সরকার দেশের দুর্ঘটনা কমানোর জন্য দুর্ঘটনার কারণ মনিটরিং করে আরও ভালো নীতিমালা করবে, সে প্রত্যাশা করছি।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে দেখা যায় মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হয়ে থাকে। তাই সরকার একটি নীতিমালা করতে চাচ্ছে এটি ভালো খবর। কিন্তু শুধু নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সড়কে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। এটিও চিন্তা করতে হবে সড়কে কীভাবে গণপরিবহনের মান বাড়িয়ে মোটরসাইকেল কমানো যায়। কারণ মোটরসাইকেল তো গণপরিবহনের বিকল্প বাহন হতে পারে না। আবার নীতিমালার নামে মোটরচালকদের যেন হয়রানি না করে সেটিও দেখতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত