বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দরগা আখড়া আস্তানা ও লাল নিশান

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৩, ০১:৫৯ এএম

এই পাঠশালায় নাই আটচালা দালান

মেষ চড়িয়ে, বাঁশির সুরে মুরশীদে চালান,

হাজার মাজার, হাজার আখড়ায় জ্ঞানের চক্ষু খুলে যায়

মন দিয়া পড় আসল মাদ্রাসায়।।

- তারেক মাসুদ১.

ইলিয়াসশাহী আমলে বৃহৎবঙ্গে ইসলামি খেলাফতের যে রূপরেখা পাওয়া যায় তাতে লবণ একটু কম পড়ে। যেমন, বাংলার যে খেলাফত বহাল ছিল তা আসলে একান্ত বাংলারই ছিল, ইরান-তুরান-বাগদাদ-মিসরের নয়। কথাটি বলার কারণ হলো এই যে, খেলাফতের বঙ্গীয় রূপের যে বাহার, তার যে অবারিত ও অসাম্প্রদায়িক প্রকাশ ইতিহাসের আলোচনায়, এ বিষয়ে লবণের অভাব ঘটে থাকে প্রায়ই। বাংলার সুলতানি আমলের স্তুতিপাঠ করার জন্য নয়, আলাপটা আসলে বঙ্গজীবন-সংস্কৃতির গভীরতা সন্ধানের। যেখানে ইটের গাঁথুনি আর শাসনযন্ত্রকে ছাপিয়ে মরমি ও মানবিক এক সমাজের পরিচয় মেলে। এ সমাজ আগেই তৈরি ছিল, মুখিয়ে ছিল বিকাশের-আত্মপ্রকাশের জন্য; জনজীবনে, সাহিত্যে, সংগীতে, আধ্যাত্মিকতায় কিংবা রাজনীতিতে এ সময়কালকে অস্বীকার করার উপায় নেই। ধর্মরাজনীতির সাম্প্রদায়িক পাঠ কিংবা সেক্যুলার ইতিহাসচর্চার দ্বৈরথে না গিয়ে কেবলমাত্র অর্জনের দিক বিবেচনা করলেও বলা যায় সুলতানী আমলে বাংলার যে বিকাশ তা স্বর্ণযুগের পরিচায়ক। অথচ তা ইসলামি শাসনব্যবস্থার নমুনা বলে স্বীকৃত।

রাষ্ট্রযন্ত্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা ভালোমন্দের আলাপ এড়িয়েই বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক যে কাঠামো তখন পেয়েছিল এ বৃহৎ বঙ্গ তা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-আধ্যাত্মিকতার এক অনুপম মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। পরবর্তী মুঘল ও কোম্পানি আমলে এ প্রাতিষ্ঠানিকতার নানান রকমফের ঘটলেও, এমনকি পাকিস্তানি আমল ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিকতায় অদলবদল ঘটলেও, মূলধারার যে সাংস্কৃতিক অবলম্বন ও চর্চাকে আমরা প্রায় অবজ্ঞাই করে চলি সেটি হলো সুফি-ফকির-বাউল পরম্পরা। আমাদের সাংস্কৃতিক বোধ ও প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ভেতরের অন্যতম একটি গলদ এ পরম্পরাটিকে মূলধারা হিসেবে বিবেচনা না করতে পারা। যেটুকু আগ্রহ তার সবটাই বাউল গান ও সাহিত্যের দিকে, লোকায়ত ও লোকোত্তর চেতনার দিকে নয়। অথচ বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ হলো নাথ-সহজিয়া বৌদ্ধ দর্শনের ও যোগসাধনার বিস্তৃত আধ্যাত্মিক চর্চার ফসল। বাংলায় নাথ-সাহিত্যও বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত, গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস ও ময়নামতির গান তার অন্যতম নিদর্শন। বৈষ্ণব-পদাবলি,

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মর্সীয়া-জারিগান, মুর্শিদী পালাগান, কালীকীর্তন, রামপ্রসাদী এসব পরম্পরারই ধারাবাহিকতা; আজকের বাউল ও মরমি সংগীত যার ফলাফলস্বরূপ।

২.

ক্রমবর্ধমান নয়া ধর্মীয়-গোঁড়ামি, ওয়াহাবি-সালাফি আদর্শনিষ্ঠ ভাবনার দুনিয়াদারি যখন আসমানদারির মালিকানাও নিতে চায় তখন ইসলামি বিশ্বে ঘটে যাওয়া নানান ধর্মীয় অঘটনের খেসারত দিতে হয় মুসলমানদেরই। যদিও বঙ্গে আর্যধর্ম কখনোই অনার্যসুষমাকে ধ্বংস করতে পারেনি, কিন্তু আচারসর্বস্ব ওয়াহাবীধর্ম মোহাম্মদী গুরুবাদ ও ফকিরিকে ধ্বংস করেছে ঢের; আর্যধর্মের বড়াই করতে গিয়ে যেমন ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদের জন্ম, তেমনি ইসলামেও জন্মলাভ করেছে আরব জাতীয়তাবোধের কাষ্ঠ-শরিয়ত। যার ভেতর প্রাণের আরাধনা ও প্রেমের উপাসনা বিলুপ্ত হয়েছে, যুক্ত হয়েছে আধ্যাত্মশক্তিহীন নীরস ধর্মবোধ। ফ্রেমে বাঁধা এহেন ইসলামিক ও ধনতান্ত্রিক বাস্তবতা হৃদয় নয়, বুদ্ধির দাসত্ব করে; তার কাছে যা হৃদয়সঞ্জাত তাই বেদাত ও বেশরা। আজও দরগায়, বাউলের আখড়ায়, ফকিরের আস্তানায় এমন বেশরা ফকিরের চুল-দাড়ি কেটে দেয়া হয়, আগুন লাগে তার ডেরায়। অথচ জনপদ হতে জনপদে ছড়িয়ে পড়া এ ফকিররাই লোকায়ত সমাজের সুফি ভাবনা ও ইসলামের শাশ্বত প্রেমের জয়গাথা গেয়ে বেড়িয়েছেন শত শত বছর ধরে।

আচারধর্ম বা ধর্মের উপরিতলের রাজনৈতিক রূপের পাটাতন উল্টিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে সব ধর্মই যে মুক্তির কথা বলছে তা নিতান্ত স্বর্গ বা নরকে সীমাবদ্ধ নয়; এ মুক্তির গভীরতর একটি দর্শন প্রচ্ছন্ন থাকছে। এ মুক্তি যে আসলে স্বর্গোদ্যানের চিরকালীন ভ্রমণ নয়, তা জানতে হলে ধর্মতত্ত্বের নিবিড় পাঠ জরুরি। আর অনুধাবন করতে হলে, সম্যক উপলব্ধি করতে হলে পথ একটাই, ধর্মীয় মূল্যবোধ ছাপিয়ে তার আধ্যাত্মিক ও মরমি রূপটিকে দেখা। ধর্মের এ রূপই আসল বাকিটুকু বাইরের খোলস; ভেতরে কোমল-কুসুম, বাইরে বর্ম-রক্ষাকবচ। এ বর্ম বা রক্ষাকবচের নমুনাই হয়ে উঠেছে আজকের ধর্ম, যার ভেতরের প্রাণরস বা জীবনীশক্তি লোপ পাচ্ছে।

৩.

সুফি ইসলাম বলে বিশুদ্ধ ইসলামি আধ্যাত্মিকতা চিনে নেওয়ার বিপত্তিও আছে; এও এক মতবাদ ও আদর্শভিত্তিক ক্ষমতাচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভালো হয় মরমি-ইসলাম হিসেবে একে অনুধাবণ করা।

খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ও চিন্তক তারেক মাসুদ রচিত একটি গানের কয়েকটি লাইন উল্লেখ করে লেখাটি শুরু করেছিলাম। আধুনিক জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ভাবনার আলোয় আলোকিত তারেক মাসুদ তার গানে যে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন, তার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন এক ‘আসল মাদ্রাসার তত্ত’। ধর্মাশ্রিত সাংস্কৃতিক উপাদান ও পরিক্রমাকে যে উপেক্ষা করা যায় না বরং ভেতর থেকে ছেনে নিতে হয় স্বর্ণশস্য তার গভীর অনুসন্ধানী কথামালা রয়েছে এ গানটিতে। আর আলাপটি শেষ করছি তিউনিশিয়ার প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার নাসের খেমিরের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘বাবা আজিজ’-এর কয়েকটি সংলাপ দিয়ে। কেন্দ্রীয় চরিত্র সুফিগুরু বাবা আজিজ তার এক কিশোরী সঙ্গিনী ইশতারের সঙ্গে সুফি-ফকিরের দরগাতে উরস বা আধ্যাত্মিক মিলনমেলা নিয়ে কথোপকথনে বলছেন।

এ মিলনমেলাটি কোথায় হচ্ছে জানতে পারি? ইশতারের প্রশ্ন।

আমি জানি না আমার ছোট্ট পরী।

কিন্তু বাকিরা কি তা জানে? ইশতার আবার প্রশ্ন করল।

না, তারাও জানে না।

মিলনমেলা কোথায় হবে তা না জেনে কীভাবে যাওয়া যাবে? ইশতারের অবাক প্রশ্ন।

 হাঁটতে থাকো, হাঁটাই যথেষ্ট; যারা আমন্ত্রিত তারা সে পথ খুঁজে পাবেই। 

সমাজের সব শ্রেণির, ধর্মের, সম্প্রদায়ের জন্য অবারিত যে দুয়ার সেখানে সবমানুষের প্রতিনিধি আছে। সাধু আছে অসাধুও আছে, ভালো ও মন্দও আছে, ধনী ও গরিব আছে, সুখী ও অসুখীও আছে, আছে উন্মাদ ও পাঁড়মাতাল। কে নাই? কেন থাকবে না? এ স্থান যে সবার, পকেটমার থেকে রিক্তহস্ত, ভিখারি হতে দানবীর, আছে লম্পট ও কামুক লোলচক্ষু। এ এক জীবনবিস্তার, নেই তার সীমা, নেই তার পরিচয়ের শেষ। সীমার ভেতর অশেষ পরিচয়ের নানান পরিক্রমায় যে আত্মপরিচয়ের সন্ধান মেলে তা পাঠ করার তিমিরবিনাশী পথই গুরুশিষ্যের পথ, প্রেমের সে পথ; আত্মনিবেদন ও মানব-বিবর্তনের মরমি এক আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয় তা। দরগা-আখড়া-আস্তানার যে লাল নিশান তা জীবনব্যাপী আত্মসংগ্রামেরই প্রতীক, জান্তব জগৎ আর অগভীর-অচেতন যাপনের বিরুদ্ধে উড়িয়ে দেয়া এক সংগ্রামী আমন্ত্রণের ইশতেহার।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত