বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অবিরাম অভিরাম ক্ষুদিরাম

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৩, ১১:৪৪ পিএম

তৃতীয় পর্বে ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে লিখেছেন ইসমত শিল্পী

আমি হাসি হাসি পরবো ফাঁসি, দেখবে ভারতবাসী... একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি... মানুষের মুখে মুখে ফেরা পীতাম্বর দাসের লেখা এই গান বাঁচিয়ে রেখেছে প্রথম বাঙালি শহীদ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে (১৮৮৯-১৯০৮)।

মেদিনীপুর জেলার হাবিবপুর গ্রামে ক্ষুদিরামের জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবীর মৃত্যু এবং একই বছরে পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু মারা গেলে বড় বোন তাকে লালন-পালন করেন। এর আগে তার দুই ভাই মারা যায়, তাই ক্ষুদিরামের বড় দিদি অপরূপা দেবী তিন মুঠো খুদ (চালের ভাঙা অবশিষ্ট) দিয়ে তার এই ভাইটিকে কিনে নেন। খুদ দিয়ে তাকে কেনা হয়েছিল বলে নাম হয় ক্ষুদিরাম। গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পর তমলুকের ‘হ্যামিল্টন’ স্কুল ও তারপর ১৯০৩ সালে মেদিনীপুরের ‘কলেজিয়েট’ স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা লাভ করেন ক্ষুদিরাম। পড়াশোনায় মেধাবী ক্ষুদিরাম ছিলেন দুরন্ত, দুঃসাহসী।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলন স্কুলের ছাত্র ক্ষুদিরামকে প্রভাবিত করে। ফলে পড়াশোনা ছেড়ে সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন। আরও কয়েকজনের সঙ্গে সেখানে শরীরচর্চার পাশাপাশি নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা শুরু হয় ক্ষুদিরামের। এ সময়ে পিস্তল চালনায় তার হাতেখড়ি। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় পোড়ানো ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত লবণে বোঝাই নৌকা ডোবানোর অভিযানে ক্ষুদিরাম অংশ নেন।

ক্ষুদিরামের প্রাণ ছিল দরদি। আর তার মধ্যে ছিল মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। কারও অসুখ শুনলে ক্ষুদিরামের প্রাণ কেঁদে উঠত। জনগণের সেবাই ছিল তার ব্রত। প্রকৃতির নানা দুর্যোগে মানুষের সাহায্যের জন্য তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে রিলিফ-ওয়ার্ক করেছেন।

স্বদেশি আন্দোলন শুরু। চারদিকে বিদেশি জিনিসের বয়কট চলছে। বিলিতি কাপড়, বিলিতি নুন লুট করার কাজে নেতারা লেগে গেছেন। চারদিকে ব্রিটিশ জাতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও আন্দোলন শুরু। এ সময়ে ১৯০৬ সালে মেদিনীপুরে মারাঠা কেল্লায় কৃষিশিল্প প্রদর্শনী মেলা বসে। এই মেলা প্রাঙ্গণে সোনার বাংলা নামে বিপ্লবী পুস্তিকা বিলি করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম প্রথম রাজনৈতিক অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ক্ষুদিরাম হঠাৎ সেই সময়ে পুলিশের বাধা পেলে পুলিশের বুকে এক প্রচণ্ড লাথি মেরে পালিয়ে যান। কেউ তাকে ধরতে পারে না। প্রায় তিন মাস পার হয়েছে, তখন তিনি ধরা পড়লেন। বিপ্লবীদের এই বই কোথা থেকে বেরিয়েছে সেই গোপন কথা জানার জন্য পুলিশ ক্ষুদিরামের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করে, কিন্তু একটি কথাও তিনি প্রকাশ করেননি, বলেননি সতীর্থদের নাম। মুখ বুজে সব সহ্য করেছেন। কোনো কথা আদায় করতে না পেরে তখন ব্রিটিশ সরকার ক্ষুদিরামকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার বিপ্লবীদের মুখে মুখে ক্ষুদিরামের প্রশংসা। ১৯০৭ সালে হাটগাছায় ডাকের থলি লুট এবং নারায়ণগড় রেলস্টেশনের কাছে বঙ্গের ছোটলাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা আক্রমণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ক্ষুদিরাম। একই বছরে মেদিনীপুর শহরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক সভায় সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যপন্থি রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

সুরেন্দ্রনাথ পরলোকগমন করলেও তার প্রেরণা রয়ে গেল বাংলার তরুণদের মধ্যে। দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার জন্য এগিয়ে এলেন ক্ষুদিরামসহ আরও অনেকে। তারা ছিলেন অগ্নিযুগের শহীদ।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলনের কর্মীদের প্রয়োজনভিত্তিক কঠোর সাজা ও দমননীতির কারণে কলকাতার প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড বাঙালিদের অত্যন্ত ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। যুগান্তর বিপ্লবী দল ১৯০৮ সালে কিংসফোর্ডকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের ওপর এ দায়িত্ব পড়ে।

কর্র্তৃপক্ষ কিংসফোর্ডকে কলকাতা থেকে দূরে মোজাফ্ফরপুরে সেশন জজ হিসেবে বদলি করে দিয়েছিল। ৩০ এপ্রিল ১৯০৮, দুই যুবক স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবের গেটের কাছে একটি গাছের আড়ালে অতর্কিত আক্রমণের জন্য অ্যামবুশ পাতেন। কিন্তু কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো অন্য একটি গাড়িতে ভুলবশত বোমা মারলে গাড়ির ভেতরে একজন ইংরেজ মহিলা ও তার মেয়ে মারা যান। এ ঘটনার পর ক্ষুদিরাম ওয়ানি রেলস্টেশনে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তিনি বোমা নিক্ষেপের সব দায়িত্ব নিজে স্বীকার করেন। ব্রিটিশ পুলিশের চরম নির্যাতনের মুখেও প্রফুল্ল চাকীসহ অপর কোনো সহযোগীর পরিচয় বা কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি। বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুসারে, মোজাফ্ফরপুর কারাগারে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর করধা হয়।

সব কিছু ত্যাগ স্বীকার করে অন্তত জীবন রক্ষা করা ক্ষুদিরামের পক্ষে কঠিন ছিল না। তার এই উজ্জ্বল উদাহরণে দেশের হাজারো তরুণ-তরুণী প্রেরণা লাভ করে। স্বাধীনতার বেদিতে ক্ষুদিরামের জীবনের এই উৎসর্গ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। বাংলা কাব্যে, সাহিত্যে, সংগীতে ও ইতিহাসের পাতায় এই আত্মবলিদানের মধ্য দিয়েই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে আছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত