রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফাঁস হওয়া অডিও নিয়ে সঠিক তদন্ত দরকার

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৩, ১২:৪৩ এএম

দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে আছে। তার একটি হচ্ছে, ছাত্রলীগ নেত্রী কর্র্তৃক একজন নারী শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনা। যেটা আদালতের রায়ে একটা সুরহায় পৌঁছেছে। অন্যটি হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের কণ্ঠ সদৃশ ফাঁস হওয়া ফোন কল। যেখানে তাকে দুজন চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে কিছু আদান-প্রদানের কথা বলতে শোনা গেছে। যখন এই লেখাটি লেখছি (১৫ মার্চ) তখন উপাচার্যের ফাঁস হওয়া ফোন কলসহ বেশ কিছু অনিয়মের ঘটনা তদন্ত করতে ইউজিসির একটি প্রতিনিধি দল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘুরে এসেছে এবং তারা এসব ঘটনায় প্রাপ্ত তথ্যের প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পেশ করবে বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

এই লেখার বিষয় হচ্ছে, গত এক মাসে ইবি উপাচার্যের দুটি ফোন কল এবং সেই ফোন কল কে বা কারা ফাঁস করেছে সেটা খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালামের ফোন কলের প্রথম অডিও ফাঁস হয় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি। প্রথম অডিওর ৭ পর্ব ধারাবাহিকভাবে ফাঁস হয়। দ্বিতীয় অডিও ফাঁসের ঘটনা ঘটে গত ৭ মার্চ দিবাগত রাত ১২টার দিকে। ফাঁস হওয়া দুটি ফোন কলের অডিওতে দুটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে ইবি উপাচার্যকে নিয়োগ প্রার্থী ও তার আত্মীয়ের সঙ্গে ‘দাম-দাম’ করতে শোনা গেছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারিতে ফাঁস হওয়া ফোন কল নিয়ে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম দৈনিক প্রথম আলোকে (২০ ফেব্রুয়ারি) জানিয়েছেন, ‘কয়েক বছর আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগ খোলা হয়। সেখানে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেন অলিউর রহমান। তখন একটা বোর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু কোরাম পূরণ না হওয়ায় সেটি বাতিল হয়ে যায়। অলিউরের সঙ্গে উপাচার্যের মুঠোফোনে কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন উপাচার্য।’ তিনি নিয়োগপ্রার্থী অলিউর রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে স্বীকার করলেও ফাঁস হওয়া ফোন কল তার নয় বলে দাবি করেছেন। অথচ ফাঁস হওয়া ফোন কলে তাকে অলিউরের নাম ধরে ডেকে কথা বলতে শোনা গেছে। ফোন কল তার নয় বলে যে দাবি তিনি করেছেন তার কারণ হচ্ছে, উপাচার্য মহোদয় নিয়োগপ্রার্থী ‘অলি’কে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই জানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং তাকে নিয়োগ দিতে একটি সাজানো নিয়োগ বোর্ড করবেন বলেও নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ফলে এই ঘটনা স্বীকার করার প্রশ্নই আসে না।  তবে অডিও ফাঁসের পর ১৯ ফেব্রুয়ারি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ তিনটি বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রথম অডিওর একটি অংশ ফাঁস হয় গত ২২ ফেব্রুয়ারি। এর জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিস এবং প্রকৌশল অফিসের নিয়োগ পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে গত ৭ মার্চ ফাঁস হওয়া ফোন কলে শোনা যায়, ইবি উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে একজনকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়ে নিয়োগপ্রার্থীর আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। এই ফোন কলের বিষয়ে ইবি উপাচার্য সংবাদমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে আপাতত কিছু বলতে চাচ্ছি না। এই অডিও আমার হতেও পারে, নাও হতে পারে। আমি থানায় জিডি করেছি। পুলিশ বাকি ব্যবস্থা নেবে।’ (প্রতিদিনের বাংলাদেশ : ৪ মার্চ ২০২৩)

ফাঁস হওয়ার ফোন কলে যে নিয়োগ বাণিজ্যের কথা প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি, আওয়ামীপন্থি শিক্ষক সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও প্রগতিশীল শিক্ষকদের সংগঠন শাপলা পরিষদ উপাচার্যের কাছে ওই অডিওগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে, (১৫ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদে উপাচার্যের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর অভিযান করছে এবং আন্দোলনে যাবে বলেও জানিয়েছে।

এই ঘটনায় কীভাবে ফোন কল ফাঁস হচ্ছে তা খোঁজ করতে গত ২০ফেব্রুয়ারি প্রক্টরের নেতৃত্বে ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আননূর যায়েদ বিপ্লব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি সেল ও সহকারী প্রক্টররা মিলে ইবি উপাচার্যের কার্যালয়ে তল্লাশিও চালান। (‘অডিও ফাঁস : ‘ডিভাইসের খোঁজে’ ‘ইবির ভিসির কার্যালয়-বাসভবনে তল্লাশি’, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ২০ ফেব্রুয়ারি) এই ঘটনাটি লক্ষণীয়।

ফাঁস হওয়া অডিওগুলো যে ইবি উপাচার্যের না, এটা কিন্তু প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে এই অডিওগুলো যে ইবি উপাচার্যেরইÑ সেটা এখনো অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে এই ঘটনায় একটি তদন্ত হওয়া জরুরি এবং ইবি উপাচার্যের কণ্ঠ সদৃশ যে অডিওগুলো ফাঁস হয়েছে সেই ঘটনাগুলো সত্য কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু সেটা হয়নি। ঘটেছে তার উল্টো; কে বা কারা এই অডিও ফাঁস করছে সেই নেপথ্যের কারিগরদের খুঁজে বের করতে ইবি প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অনেকেই বলবেন, কারও ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস করা অন্যায়। এটা আইনসম্মত না। যারা এমন কথা বলেন তাদের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিখ্যাত সংবাদমাধ্যম উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ দারুণ একটা উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শাসকগোষ্ঠী যেটা জনগণের কাছে প্রকাশ করে সেটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে প্রচারণার কাজ। আর শাসকগোষ্ঠী যেটা জনগণের কাছ থেকে লুকাতে চায় সেটা প্রকাশ করা হচ্ছে সাংবাদিকতা। তথা তাদের অপকর্ম প্রকাশ করা সাংবাদিকতারই অংশ। আর সাংবাদিকতা কোনোভাবেই অন্যায় না।

ইবিতে যা হচ্ছে, সেটা গোটা জাতির সঙ্গে অন্যায়। কারণ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে একজনকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত মেধাবী তার যোগ্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অযোগ্য ব্যক্তি শিক্ষক হচ্ছে। একজন অযোগ্য ব্যক্তি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয় তখন সে অন্তত ৩০টি ব্যাচকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা এই ৩০টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা নানাভাবে রাষ্ট্র তথা দেশকে সার্ভিস দেয়, জাতিকে সার্ভিস দেয়। যখন শিক্ষার্থীরা অযোগ্য শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রকে সার্ভিস দিতে যায় তখন সেই সার্ভিস ভালো না হওয়ারই কথা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ মানে গোটা জাতি ও দেশের সঙ্গে অন্যায় করা।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

[email protected]

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত