সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিক্ষকদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৩, ১১:৩৫ পিএম

বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে, বেড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেটধারীদের সংখ্যা। কিন্তু বাড়েনি প্রকৃত শিক্ষিতের হার। তৈরি হয়নি খুব একটা বেশি ‘শিক্ষিত’ আর ‘আলোকিত’ মানুষ। উপনিবেশিক শাসনামল থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতা লাভ করলেও, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ নিজের অজান্তেই তাদের প্রবৃত্তির মধ্যে ধারণ করে শাসন ও শাসকের মানসিকতা। শত বছরের শাসন থেকে স্বাধীন হলেও, মনের দিক থেকে এ জাতি আজও মুক্ত হতে পারেনি। তাই, এ দেশে লেখাপড়া করা হয় মূলত চাকুরে হওয়ার জন্য। বহুদিন ধরে নিষ্পেষিত হওয়া এ জাতি যেন সর্বদা এক প্রতিশোধের আগুনে জ¦লে। চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনোভাবে ক্ষমতার সামান্য স্বাদ পেলেই হয়ে উঠে প্রতিশোধপরায়ণ। এ দেশের মানুষের এমন মনস্তত্ত্বের জন্য উপনিবেশিক ইতিহাস, বর্তমানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আর অসুস্থ রাজনীতি দায়ী।

এ দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ আজও শুধুই সরকারি চাকুরে হতে চায়। যদিও ধনী শ্রেণির সন্তানরা ভিনদেশি পাঠ্যক্রমে শিক্ষিত হয়ে সরকারি চাকরির প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করে না। অল্প বয়সেই ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, তাদের অনেক কিছু দিতে না পারলেও অস্বাভাবিক উচ্চারণে ভাব প্রকাশ আর খানিকটা অহংকারী করে তোলে। এরা দেশের বেশির ভাগ মানুষকে আনকালচারড ভাবে। তাই অল্প বয়সেই এরা ইউরোপ আর আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চায়, নিজেদের কৌলীন্য ধরে রাখতে। দেশপ্রেম তো দূরে থাক, এরা ঠিকমতো এদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই তেমন যোগাযোগ না রেখে, এক ধরনের বিজাতীয় স্বার্থপর মানুষ হয়ে উঠতে চায়।

অন্যদিকে এ দেশের মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বেশির ভাগই সরকারি চাকুরে হতে চায়। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নয় বরং হতে চায় ‘কর্মকর্তা’। একবার সরকারি ‘কর্মকর্তা’ হয়ে এরা দেখাতে চায়, সবকিছু তাদের পদতলে। ক্ষমতা, অবস্থান, অর্থ সব যেন সরকারি চাকরির মধ্যে নিহিত। এই চাকরিই যেন তাকে জাতে ওঠায়। অন্যকে নিচু সারির বা ক্ষমতাহীন মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখায়। রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতার ম্যাপে মিশে যাওয়ার জন্য তথাকথিত ‘কর্মকর্তা’ হওয়ার যেন কোনো বিকল্প নেই। এ যেন হাজার বছরের নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার এক মোক্ষম অস্ত্র। তাই তো, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন পড়েও অনেকেই স্বাধীনভাবে তাদের পেশায় না নেমে সরকারি চাকুরে হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এসব চাকরির পরীক্ষায় টিকতে না পারলে, এদের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ে রাজ্যের হতাশা, বিষাদ আর ব্যর্থতা। অথচ কোনোভাবে এসব ক্ষমতা চর্চার সরকারি চাকরিতে ঢুকতে পারলে, এরা জনগণের সেবক না হয়ে, ‘স্যার’ ডাক শোনার জন্য ব্যাকুল থাকে। এ দেশে ‘স্যার’ বলতে শুধু ‘জনাব’ বোঝায় না। ‘স্যার’ সম্বোধন এ দেশে খানিকটা ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষক ব্যতীত ‘স্যার’ ডাকা হয় ক্ষমতাবান ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের, আর ডাকে তারা যারা থাকে অধস্তন বা ক্ষমতাহীন অথবা ক্ষমতার স্কেলে নিচের দিকে। অনেক আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ব্যক্তি এ দেশে পয়সা দিয়ে লোক পোষে, শুধু ‘স্যার’ আর ‘সাহেব’ ডাক শোনার জন্য। 

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ‘স্যার’ ডাকতে হয়, এই উপনিবেশিক চর্চা এ দেশে আজ শুধু একটা প্রথা নয়, এটা একটা বিনিময় প্রথাও বটে। তাদের ‘স্যার’ ডাকলে সেবা পেতে সুবিধা হয়; বুক টান টান করে, কলমের খোঁচায় তখন আপনার কাজটা করে  দেবে কোনো সরকারি চাকুরে। সেই কাজ করে দেওয়ার মধ্যে যত না থাকে দায়িত্ববোধ, তার থেকে বেশি থাকে ক্ষমতার চর্চা। নিজ দপ্তরের অধস্তন কর্মচারী আর কিছু ধান্ধাবাজ কপট মানুষদের কাছ থেকে ‘স্যার’ ডাক আর তোষামোদি বাক্য শুনতে শুনতে তারা এমন আচরণের ব্যত্যয় দেখলেই বেসামাল হয়ে পড়ে। যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যদিও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান তাদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আর জনগণকে করেছে রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতার উৎস। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কালজয়ী বিভিন্ন ভাষণে সরকারি চাকুরেদের সতর্ক করেছিলেন, কীভাবে বাংলার মেহনতি মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যাদের করের পয়সায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়, সে সব মানুষদের সম্মান দেওয়ার কথা বঙ্গবন্ধু একাধিকবার তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন।

দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় আসেন। চাইলে, তারাও একটা ক্ষমতাকেন্দ্রিক নির্বাহী চাকরি বা কোনো করপোরেট জব জুটিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে তারা শিক্ষকতায় আসেন স্বাধীনভাবে পাঠদান আর গবেষণা করবেন বলে। আসেন এক চূড়ান্ত সম্মানের জীবন বেছে নিতে। বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় পাবলিক ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ-১৯৭৩ করে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা চূড়ান্ত করেছিলেন। চারটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়কে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে শিক্ষকদের মুক্ত করেছিলেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর পরাধীনতা থেকে। যদিও পরবর্তীকালের বিভিন্ন সরকার নিজস্ব সিদ্ধান্তে অপ্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। এর ফলে মানহীন শিক্ষক যেমন রাজনৈতিক কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন কারণে তাদের সম্মানের স্খলনও হয়েছে। স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে, আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো অনেক শিক্ষকেরই নেই পর্যাপ্ত উচ্চশিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্য ও স্বীকৃতি। এমন অবস্থার জন্য ঘুণে ধরা বৈষম্যের রাজনীতিই দায়ী।

সম্প্রতি আরেকটি ঘটনা জানা গেল। একজন জেলা প্রশাসক এক স্কুলের শিক্ষকের জাতীয় সংগীতের পরীক্ষা নিচ্ছেন। সুরে না গেয়ে, তাকে বলা হচ্ছে আবৃত্তি আকারে বলতে। এভাবে তাকে অকৃতকার্য করে, তার বেতন বন্ধ করা হয়। ক্ষমতার কি চূড়ান্ত প্রদর্শনী! বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকদের শায়েস্তা করার কত ফন্দিফিকির। কলমের খোঁচায় কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই শাস্তি! এ দেশে এক দল লোক যেন স্বাধীনতা, জাতীয় সংগীত, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, এগুলোর একছত্র জিম্মাদার হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে পারলেই যেন সব কিছু করে পার পাওয়া সম্ভব। শিক্ষকদের মর্যাদা লুণ্ঠনের এক নির্মম প্রতিযোগিতা সর্বত্র।

পাশ্চাত্যেই শুধু নয়, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও কদরের প্রকৃষ্ট উদহারণ দেখা যায় প্রাচ্যেও। হংকং, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও শিক্ষক, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করা হয় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও। কিন্তু আমাদের সমাজ চলছে এক উল্টোপথে। মনে রাখা দরকার, এই পৃথিবীর বিনির্মাণ যাদের হাতে হয়েছে তারা সবাই ছিলেন শিক্ষক অথবা গুরু বা পণ্ডিত।

যে রাষ্ট্র শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে পারেনি, পারেনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে, সে রাষ্ট্রে টেকসই বা মজবুত উন্নয়ন অথবা মানবিক উন্নয়ন কোনো দিনই সম্ভব নয়। তাই, শিক্ষার মান নিশ্চিত করে, শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত করার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক নিয়োগে একই সঙ্গে দরকার শুধু মেধা আর দক্ষতার বিবেচনা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে এই মহান পেশাকে বাঁচাতেই হবে।   

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত