শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘ভাই লীগের’ দৌরাত্ম্য চলছে আওয়ামী লীগে

  • নির্বাচন-নেতৃত্বে বিকল্প চিন্তা
  • দলের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে
  • ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির কারণে দুর্বল হয়েছে সংগঠন
  • দলের রাজনীতি ফেরাতে মাঠপার্যায়ে নেতৃত্বে বদল, প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচন
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ১২:৩২ পিএম

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেনকে তুলে নিয়ে বাড়িতে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার সকালে সদর উদ্দিন নিজ বাড়িতে আটকে আলমগীরকে নির্যাতন করেন। আলমগীরের অভিযোগ, আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সদর উদ্দিন খানের ভাই রহিম খান চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে তার পক্ষে কাজ করতে বলেন সদর উদ্দিন। সেটা না মানায় তাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল আক্তার বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এলাকার লোকজন। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে।

শুধু কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলাই নয়, সারা দেশের বেশিরভাগ জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড সর্বত্র ‘ভাই লীগের’ এমন দৌরাত্ম্য চলছে আওয়ামী লীগে। দলটির ক্ষমতাবান একটি অংশের নেতারা সদর উদ্দিনের মতোই সব স্তরে ‘ভাই লীগ’ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলে কথিত ভাই লীগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে যেমন দুর্বল হচ্ছে, তেমনি ভাবমূর্তিও তলানিতে নামছে। এ ধরনের চর্চায় কিছু কেন্দ্রীয় নেতারও নাম শোনা যায়।

ওই নেতারা বলছেন, ‘ভাই লীগ’ রাজনীতি বিদায় করে সংগঠন শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংগঠন দুর্বল করার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতাদের ধীরে ধীরে বিদায় করতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজের অংশ হিসেবে আসন্ন তৃণমূল সম্মেলনে ‘ভাই লীগ’ বিদায় করা হবে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) বাদ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, বাদ পড়াদের অধিকাংশই সংগঠনকে দুর্বল করার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবার প্রতীক না দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তও ‘ভাই লীগ’ বিদায় করার পরিকল্পনা থেকে নেওয়া হয়েছে।

এ নেতারা বলেন, একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড মনোনয়ন দিয়ে থাকলেও স্থানীয় ক্ষমতাবানরা মনোনয়ন ভাগিয়ে নিয়ে যেতেন। তারা ‘ভাই লীগের’ অনুসারী। এর ফলে দলের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-কোন্দল, ক্ষোভ-বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতীক তুলে দেওয়ায় কিছুটা হলেও যোগ্যদের নির্বাচন করার সুযোগ মিলবে।

আওয়ামী লীগ ‘ভাই লীগে’ আবদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ তুলে ধরে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বলেন, গত এক যুগ ধরে ক্ষমতা, পদ-পদবি এসবে পরিবর্তন না আনার ফলে দলকে সংগঠিত ও শক্তিশালী না করে ব্যক্তি শক্তিশালী হওয়ার অসম লড়াই শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরে। ‘ভাই লীগ’ রাজনীতি ও স্থানীয় নির্বাচনই এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আগে দলের অভ্যন্তরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ কিছুটা ছিল। তবে গত এক যুগের মতো এতটা প্রকট আকার ধারণ করেনি।

তারা বলছেন, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগে পদ-পদবি, জনপ্রতিনিধি এসব বাছাইয়েও সামঞ্জস্য আনা সম্ভব হয়নি। ফলে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া নেতারা নিজেদের বলয়কে শক্তিশালী করার লড়াইয়ে নেমেছেন। যিনি একবার সংসদ সদস্য মনোনয়ন পেয়েছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবারও তিনিই থেকে যাচ্ছেন। আর তিনি তার এলাকায় আজীবন টিকে থাকার মানসিকতায় তার ব্যক্তি শক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতি করছেন। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনেও একই ব্যক্তি বারবার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় তিনিও একই পথ অনুসরণ করে যাচ্ছেন। তারা বিদায় নেওয়ার সময় হলে পরিবারের কাউকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে থাকেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এমন পরিস্থিতির কারণে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ হতাশ হয়ে রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছেন। অন্য একটি অংশ ‘ভাই লীগের’ আধিপত্যে রাজনীতির মাঠে টিকতে না পেরে দূরে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে কারও মতে, এতে করে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে দিনকে দিন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে একমত পোষণ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে কোনোবারই স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন হয়নি দেশে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তি তা করতে দেয়নি। স্থানীয় নির্বাচনও টালমাটাল অবস্থায় করতে হয়েছে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে। ফলে সংসদ নির্বাচন হোক আর স্থানীয় নির্বাচন হোক, কোনো নির্বাচনেই বড় পরিসরে প্রার্থী বদল করে নির্বাচন করার ঝুঁকি নিতে যাননি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।’

তিনি বলেন, ক্ষমতা থেকে গেছে একই ব্যক্তির হাতে। তবে সবাই যে ‘ব্যক্তি রাজনীতি’ করেছেন, সেটিও মনে করেন না মায়া।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, অস্বাভাবিক পরিবেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন করতে হয়েছে বলে অনেক জায়গায় আগের নেতৃত্ব বহাল রাখাকেই নিরাপদ মনে করা হয়েছে। এটাকেই ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছেন ‘ভাই লীগ’ করা নেতারা।

ব্যক্তি রাজনীতি যে আওয়ামী লীগের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে তার উদাহরণ গাজীপুরের সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সেখানে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী সাবেক মেয়র ও স্থায়ী বরখাস্তকৃত আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের মায়ের কাছে হেরে গেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান। ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীর প্রার্থী হলেও খেলাপি ঋণ থাকার কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তিনি মাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী করে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

এর আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে জাহাঙ্গীর আলমকে দলীয় পদ হারাতে হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় মেয়র পদ থেকে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর ওই নেতা বলেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রার্থী বদলানো হয়েছে। এবারের ধারাবাহিকতা আগামীতেও ধরে রাখা হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না রাখার সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি যারা জেঁকে বসে আছেন, তাদের কিছুটা হলেও ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যিনি যোগ্য, যারা কর্মীনির্ভর, দলের জন্য যিনি রাজনীতি করেছেন, তারই জিতে আসার সুযোগ-সম্ভাবনা থাকবে। এলাকার মানুষ ব্যক্তি রাজনীতি করা নেতাকে ভোট দেবে না, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, যোগ্যতার বিবেচনায় ভোটে জিতে আসার বিকল্প নেই এবার।

মির্জা আজম আরও বলেন, ‘ভাই লীগ’ রাজনীতির চর্চা যারা করছেন তাদের লাগাম টেনে ধরা হবে। রাজনীতি করা নেতারাই দলীয় পদ-পদবি পাবেন। তবে কোনো কিছুই এক দিনে করা সম্ভব হয় না, পরিকল্পনা করে এগোতে হয়। আওয়ামী লীগও সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

দলে ব্যক্তি বলয় তৈরি করা নেতাদের বিদায় করতে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নানা বিকল্প মাথায় রেখেই আওয়ামী রাজনীতি করছে বলে জানান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য। তিনি বলেন, ‘ভাই লীগ’ নেতাদের আশ্রয়দাতা অনেক ক্ষেত্রে কিছু কেন্দ্রীয় নেতারাও রয়েছেন। সেসব নেতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের হাতে এ আশ্রয়দাতা কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম রয়েছে।

সভাপতিমণ্ডলীর এ সদস্য বলেন, তৃণমূল সম্মেলনে আওয়ামী লীগের জন্য যারা প্রয়োজন তাদের হাতে দলীয় পদ তুলে দেওয়া হবে। দলের জন্য যাদের প্রয়োজন নেই তাদের দলীয় পদ-পদবি কেড়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ঈদের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল তৃণমূল সফরে নামবেন। জেলা-উপজেলায় বর্ধিত সভা করবেন, নেতাকর্মীদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনবেন। তার ভিত্তিতেও নতুন করে দল পরিচালিত হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত