সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অদৃশ্য উপনিবেশ অভূতপূর্ব নয়

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ০১:৪০ পিএম

প্রথিতযশা বাংলাদেশি লেখক, গবেষক ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি পণ্ডিত ও গণবুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রসিদ্ধ। দেশের তরুণ লেখক ও চিন্তকদের মধ্যে সলিমুল্লাহ খানের অনুসারী রয়েছে। সম্প্রতি কলোনিয়াল কলকাতা, রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধিজীবিতা, বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের মতো বিষয়ে তার মন্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : ফ্রাঞ্জ ফানো উপনিবেশকে একরকম শরীরীভাবে ব্যাখা করেছেন। কিন্তু আমরা বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির ভেতর দিয়ে আসার পর দেখছি কলোনি অশরীরীভাবে বিরাজ করছে। এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা এবং মোকাবিলা করবেন?

সলিমুল্লাহ খান : প্রথমেই বলি কলোনিয়ালিজম জিনিসটা যে অশরীরীভাবে অবস্থান করে সেটা নতুন নয়। বর্তমানে বিশ্বায়নের ফলে আমরা যেটাকে বলি ‘অদৃশ্য উপনিবেশ’ সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন নয়। তাহলে নতুন কী? নতুন হচ্ছে বর্তমানে এটা বিশ্বজনীন হয়েছে, আগে এটা পৃথিবীর একটা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। যেহেতু ফানোর কথা তুলেছেন সেজন্য বলছি, ফানো মূলত ফরাসি উপনিবেশে জন্মেছিলেন মধ্য আমেরিকায় ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে। ফ্রান্সে পড়াশোনা করে চাকরি নিয়ে গেলেন ফ্রান্সের আরেকটি উপনিবেশ আলজেরিয়ায়। সেই আলজেরিয়াতে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলে তিনি তার সামর্থ্য অনুসারে সেখানে অংশগ্রহণ করেন। অদৃশ্য উপনিবেশবাদ আলজেরিয়াতে ছিল এই অর্থে যে ফ্রান্স বলত যে আলজেরিয়া আমাদের উপনিবেশ নয়, আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বিপ্লবের পরে অর্থাৎ ১৯৬২ সালের মার্চ মাসের দিকে ফ্রান্স রাজি হয় আলজেরিয়াকে স্বাধীনতা দিতে। আমরা বিশ্বায়ন পরবর্তী যে অদৃশ্য উপনিবেশ দেখছি সেটা অভূতপূর্ব নয়।

দেশ রূপান্তর : কলকাতার সঙ্গে ঢাকার কালচারাল হেজিমনি প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আপনার মন্তব্য বেশ ভাইরাল হয়েছে। কালচারাল কলোনিয়াল ডিসকোর্স মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা কি রবীন্দ্রনাথকে চাঁদমারি করছি? অনেক আলাপে তো তাকে বাদও দিতে চায়...

সলিমুল্লাহ খান : এখানে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। আমার মনে হয় যারা আমার কথা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি, ইচ্ছে করেই হোক বা অক্ষমতাবশতই হোক- তারা বলছেন এসব। এখানে অদৃশ্য উপনিবেশ বলতে যেটা আমি বুঝিয়েছি, যেমন ধরেন বিপ্লব পূর্ববর্তী কিউবার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের আপনি কিছু মিল পাবেন। ১৯০৫ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা বিখ্যাত ছবি এঁকেছিলেন জাপানি এক শিল্পীর টেকনিক অবলম্বন করে। ছবির নাম ছিল ‘বঙ্গমাতা’, দুই এক বছরের মধ্যে সেই ছবির নতুন নামকরণ হলো ‘ভারত মাতা’। ঠাকুর পরিবারেরই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আধুনিক অগ্রগণ্য শিল্পী, বেঙ্গল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি এ কাজ করেছেন। এটা বোঝা দরকার যে যেটা ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নামে যেটা প্রতিষ্ঠিত ছিল সেটা কীভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে পরিণত হলো? বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে যা মনে করা হতো, সেটা বুঝতে অতুলপ্রসাদ সেনের  ‘মোদের গরব, মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা’ গানটির দিকে দৃষ্টি দিতে বলি আপনাকে। আপনি দেখবেন গানটিতে অনেকগুলো চরিত্রের উল্লেখ আছে। এখানে তিনটির একটি হলো মাঝি, আরেকটা বাউল, আরেকটা চাষা। কিন্তু নাম আছে দুজন ধর্ম প্রবর্তকের। ‘নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি ধারা।’ কবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যাপতি, চন্ডী, গোবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন এবং বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনল মালা জগৎ জিনে। দেখবেন এখানে বর্ণ হিন্দু নয় এমন কোনো বাঙালির নাম নেই। বাঙালি জাতীয়তাবাদের এটাই ছিল সীমাবদ্ধতা, এখানে ব্যাপারটা কলকাতার নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি জাতীয়তাবাদ অনিবার্যতই একটা সাম্প্রদায়িক রূপ ধারণ করেছিল। বাঙালি মুসলমানরা সেখানে চাষা, বাউল এবং মাঝিতে পরিণত হয়েছে। এই জিনিসটা যদি বুঝে থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন আমার কথাকে যারা ভুল ব্যাখা করছে কথাটা কোন পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলাম সেটা না জেনেই।

দেশ রূপান্তর : গানের উদাহরণ আপনি দিলেন, যেখানে বাঙালি মুসলমানেরা নামহীন সে প্রসঙ্গে আবার ফ্রান্স-আলজেরিয়া সম্পর্কের ভেতর আলবেয়ার কামুর ‘দি আউটসাইডার’ এর কথা বলা যায়। সেখানে মার্সেলের হাতে এক্সিডেন্টলি একটা খুন হয়। খুনের শিকার ব্যক্তির নাম নেই কেন এবং তাকে কেন আলজেরীয় হতে হলো?

সলিমুল্লাহ খান : কামুর এই উপন্যাস বেরিয়েছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে। ফরাসি ঔপনিবেশিক সমাজের এক সদস্য যাদের ফরাসি ভাষায় বলা হয় Pied-Noir  সে এক আরবকে খুন করেছে, যার নাম নেই সেই উপন্যাসে। যে রকম আমাদের পূর্ববঙ্গের চাষার নাম থাকে না। তো এটা হচ্ছে অনেকটা অদৃশ্য কলোনি। ১৮৭০ থেকে ফ্রান্সের এক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলজেরিয়াতে আর উপন্যাসটা লেখা হয়েছে সত্তর বছর পরে। একটা তথ্য জানাই, বাস্তব ইতিহাসে যা নেই সেটা কল্পনা করে কামু তার উপন্যাসে লিখেছে। কেউ একটিও এমন উদাহরণ দিতে পারবে না যে, কোনো আলজেরিয়ানকে হত্যার দায়ে কোনো ফরাসির ফাঁসি হয়েছে অথবা দন্ড হয়েছে ফরাসি উপনিবেশের সময়ে। কিন্তু কামু তার উপন্যাসে লিখেছেন আরব বা আলজেরীয়কে হত্যার দায়ে মার্সোর মৃত্যুদন্ড হয়েছে। এটা হচ্ছে ইতিহাসের বাস্তব ঘটনার যে ধারা তার বিপরীত। আপনি বলতে পারেন যে, শিল্পীর তো স্বাধীনতা আছে।  কিন্তু এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়, এটা সম্ভব নয়। এমনকি কেনিয়াতেও কোনো কোনো কেনিয়ান ভদ্রলোককে হত্যা করার জন্য অনেক ইংরেজের শাস্তি হয়েছে কিন্তু ফরাসি উপনিবেশে এমন কোনো উদাহরণ নেই। সেজন্য বলছি আলজেরিয়ার উপনিবেশে যারা ফরাসি লোক বসবাস করেছে তাদের ছিল একাধিপত্য। এটাকে বলে কলোনির সেটেলার কলোনি। যেমন এখন ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনের ওপর সেটেলার কলোনি। আর ইংরেজরা ভারতবর্ষে, বাংলাদেশে যখন এসেছিল সেটাকে বলে ট্রেড কলোনি। এটা ছিল তাদের কারবারের জায়গা আর ওইটা হলো তাদের বসতির জায়গা।

দেশ রূপান্তর : তাহলে কামু যেমন ফরাসি কলোনিয়াল ন্যারেশনে আরবকে নামহীন রাখেন বা আইনের কাল্পনিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন, আমাদের রবীন্দ্রনাথও কি তেমনি ইংরেজ কলোনির প্রডাক্ট? আমাদের এই বোঝাপড়ার ভেতরে কোথাও কি একটা অসহিষ্ণুতা দেখতে পান?

সলিমুল্লাহ খান : ইউরোপের কলোনিয়ালিজম একরকম, যে কারণে ফ্রান্স কামুকে গ্রহণ করেছে। কিন্তু আমাদের সমস্যাটা এখানে ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথও একজন বাঙালি। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নতুন পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়। পূর্ব বাংলার যে বাঙালিরা আগে ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে স্থান পায়নি তারা নিজেদের জন্য আলাদা কিছু তৈরির জন্য সংগ্রাম করেছে। এটা ভালো কী মন্দ বা কী জন্য করেছে সেটা বলছি না, সেটার ফলাফল এখনো অনিশ্চিত। সেই কারণে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে কলকাতার সঙ্গে ঢাকার। ঢাকা একটা অতি প্রাদেশিক রাজধানী থেকে এখন একটা স্বাধীন দেশের রাজধানী হয়েছে। এখন ঢাকায় যতই বায়ু দূষিত হোক না কেন এটা বর্ধিষ্ণু শহর। কারও কারও হয়তো মনে হতে পারে এটা কলকাতার শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে একটা চ্যালেঞ্জ। এটা নিয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমার বক্তব্য হলো রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে আলোচনা, সেটা সবসময়ই ছিল। রবীন্দ্রনাথ একজন লেখক হলেও তিনি একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সুতরাং তাকে আলোচনায় আনতে হবে এবং তিনি আধা-রাজনীতিকও বটে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ইস্যুতে রবীন্দ্রনাথ প্রথম দিকে সমর্থন করেছিলেন। তিনি জাতীয়তাবাদের ওপর বক্তৃতা দিতে জাপানেও গিয়েছেন। তিনি বলেছেন নতুন যে জাতীয়তাবাদ দেখা দিচ্ছে এটা অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়। এবং জাপানে গিয়ে জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদে পরিণত হবে সেটার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। অনেকে সমালোচনা করে যে তিনি ইংরেজদের সমর্থক। কিন্তু তিনি ইংরেজদেরও সমালোচনা করেছেন। কিন্তু যখনই স্বদেশে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠেছে, দেখা যায় তিনি কোথাও স্পষ্টভাবে এদেশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলেনি। যেমন ধরেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে সামাজিক অন্যায় সেটা তিনি মাঝে মাঝে কেবল প্রকাশ করেছেন কেবল, তেমন শক্ত অবস্থান নেই। তার কাছে অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল কিন্তু সেটা হয়নি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র তারা ঠিক বুঝতে পারেনি তারা আগে ভারতীয় নাকি আগে বাঙালি। এখানে বাঙালি মানে ভারতের অধীনস্ত বাংলা নাকি স্বাধীন বাংলা? এই প্রশ্ন যখন আসবে দেখা যাবে যে এইখানে রবীন্দ্রনাথের কোনো পরিষ্কার উত্তর নেই, বঙ্কিমেও নেই, অবনীন্দ্রনাথেও নেই।

দেশ রূপান্তর : কালচারাল হেজিমনি মোকাবিলা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও কি ঘৃণাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে? অন্যদিকে, আর ভারতেও ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতি গেড়ে বসছে। সেখানকার মুসলিম বিদ্বেষের প্রভাবে এখানেও কি হিন্দুবিদ্বেষ মাথাচাড়া দিচ্ছে? 

সলিমুল্লাহ খান : আমাদের এখানে উসকে দেওয়ার কিছু নেই। আত্মরক্ষার জন্য দাঁড়ানোটা কি উসকে দেওয়া হতে পারে? এটা ইস্যু নয়। ভারতের যে রাজনীতি এখন সেটা ভারতের নাগরিকরাই প্রতিবাদ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে মুসলিম এবং হিন্দু প্রশ্নটাকেই বিজেপি সরকার বড় করে তুলছে। বাংলাদেশে সেই পরিস্থিতি বিরাজ করছে না। বাংলাদেশে অফিশিয়ালি এবং দলগতভাবে কোনো হিন্দুবিদ্বেষ নেই। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পূর্বশ্রুতি অনুসারে যদি আপনি মনে করেন, জমিদার বিদ্বেষ বা কলকাতার বাবুদের আধিপত্য বিদ্বেষ থাকে সেটা তো হিন্দুবিদ্বেষ নয়, সেখানে ভুল করছেন কেন?

দেশ রূপান্তর : আমাদের এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটা কেন্দ্রীয় জায়গা জুড়ে আছে যে ‘বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়’। তো আপনার কি মনে হয় সেই আত্মপরিচয় সুনির্দিষ্ট করে কি আমরা আগাতে পেরেছি নাকি এখনো পরিচয় সংকটে ভুগছি?

সলিমুল্লাহ খান : বিষয়টা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় না। এটা হচ্ছে যে কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের যে সংকট। আপনি যখন একটা দেশে বসবাস করেন আপনি স্বাভাবিকভাবেই আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার চাইবেন। আত্মপরিচয়ের কথাটা হচ্ছে পরে। আমি এভাবে বলি, ফরাসি বিপ্লবের স্লোগান ছিল তিনখানা। প্রথম স্লোগান হচ্ছে স্বাধীনতা বা ফ্রিডম যা ওরা লিবার্টি বলত। দুই নম্বর হচ্ছে নাগরিকদের মধ্যে সমতা, ইক্যুয়ালিটি। তিন নম্বর তারা বলেছিল ভ্রাতৃত্ব। এখানে গন্ডগোলটা আছে। দেখা গেল শুধু সাদা লোক হলেই ভাই হয়, কালোদের তারা আর ভাই মনে করে না। আলজেরিয়ানরা এবং পরবর্তী সময়ে যাদের উপনিবেশ বানিয়েছে তারাও ফরাসি নাগরিক হবে কিন্তু তারা কিন্তু তাদের ভ্রাতৃত্বের মধ্যে আসে না। তখনই প্রশ্নটা আসে, আমি ফরাসি কিন্তু সাদা নই। ইংরেজরা কিন্তু এই সমস্যাটা রাখেনি। ইংলিশম্যান না হলে হবে না। আপনি ইংরেজি শিখতে পারবেন কিন্তু ইংলিশম্যান হতে পারবেন না। সমস্যাটা হলো ভারতের এ অঞ্চলে হিন্দু এবং মুসলমান দুটো থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালি বলতেই মনে করা হতো হিন্দু। অতুল প্রসাদের গান একটা উদাহরণ মাত্র, বন্দে মাতরম একটা উদাহরণ মাত্র। এই কারণে বাঙালি মুসলমান আইডেন্টিটির প্রশ্নটা আসছে। জসীম উদ্দীন দেখা করতে গেলে রবীন্দ্রনাথ বলে কি ‘আমি তো মনে করেছি তুমি চাষা মুসলমানদের নিয়ে লিখেছ।’ রবীন্দ্রনাথের চোখে বাঙালি মুসলমান বলতে চাষা মুসলমান। বাঙালি বলছে না সেটাকে। আপনি বলতে পারেন সেটাকে তিনি আনমনে বলেছেন। যেটাকে ফ্রয়েড বলেছে আনমনে বলা। এটাই হচ্ছে আসল কথা। সুতরাং বাঙালি মুসলমানদের আইডেন্টিটির কথা আসছে। এখানে হঠাৎ করে কেন আবুল মনসুর থেকে শুরু করবেন, কেন আবুল হাশিম থেকে শুরু করবেন? এটা তো শুরু হয়েছে বহু আগে থেকেই।

দেশ রূপান্তর : অনেকে বলেন আপনি ছফাকে দখল করে আছেন, অন্যদের থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন?

সলিমুল্লাহ খান : আমি তো মানুষের মুখে হাত দিতে পারব না। যার কাজ সে করবে। ছফা আমাদের দেশের একজন লেখক। আমি কিন্তু বলিনি যে ছফার থেকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা শুরু হয়েছে। ছফা হচ্ছে এই পরম্পরার একজন। কোথা থেকে শুরু হয়েছে সেসব মানুষ খুঁজে বের করবে। আমি ছফার একজন পাঠক, ছফার বইয়ের একজন রিভিউয়ার। আমি ছফাকে একঘরে করিনি।

দেশ রূপান্তর : আপনি কি কোনো জায়গায় বলেছিলেন যে ‘ছফা ফ্রয়েড বুঝতেন না’? এটা কি কোনো সমস্যা?

সলিমুল্লাহ খান : ছফা ফ্রয়েড বুঝতেন না এরকম বলিনি। আমি বলেছি ছফা ফ্রয়েড পড়েননি। মানুষ যে কথা বিকৃত করে এটা উদাহরণ। ছফা অনেক বই পড়েছেন। এমনকি ছফার দুই একটা ফ্রয়েডের বই পড়া থাকলে সেটাও বিচিত্র না। পড়া বলতে যেটা বুঝায় যেই পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে মার্কস পড়েছেন, লেনিন পড়েছেন, সে রকম পড়েননি। আমি তো এভিডেন্সের বাইরে কথা বলি না। আমি ছফার লেখায় কোথাও আমি ফ্রয়েডের রেফারেন্স পাইনি। একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, আপনিসহ আপনারা কয়জনে ফ্রয়েড পড়েছেন আমার সন্দেহ এজন্য যে, যত লোক ‘অবচেতন’ বলে শব্দটা ব্যবহার করে তারা কেউ ফ্রয়েড পড়েনি। যেমন সেলিনা হোসেন মগ্নচৈতন্য লিখেছেন। তিনি এটা পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে। আমি তো সবিনয়ে বলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ফ্রয়েডের দেখা হতে পারে কিন্তু ‘ফ্রয়েড তিনি বুঝেননি’। এটা আপনি একটা হেডলাইন করতে পারেন। বাংলা ভাষা পরিচয় নামে রবীন্দ্রনাথের বই আছে, সেখানে মগ্নচৈতন্য কথাটা আছে। মগ্নচৈতন্য মানে হচ্ছে যেটাকে ইংরেজিতে বলে সাব-কনশাস। ফ্রয়েডের লেখায় কোথাও এই অবচেতন কথাটা বা সাব-কনশাস কথাটা পাবেন না। এটা হচ্ছে অচেতন, মানে চেতন যদি ব্যবহার করতে চান। এটাকে আমি অনুবাদ করেছি অজ্ঞান, আনকনশাস হবে সাব-কনশাস নয়। অর্থাৎ যে লোক ফ্রয়েড পড়েছে রবীন্দ্রনাথসহ যদি তিনি পড়তেন তাহলে সাব-কনশাস লিখতেন না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, ফ্রয়েড কোথাও সাব-কনশাস কথাটা বলেননি। সাব-কনশাস আপনি বলতে পারেন, আপনার অধিকার আছে। কিন্তু এটা ফ্রয়েডের কথা নয়।

দেশ রূপান্তর : ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনার পক্ষে বিপক্ষে একরকম বিশাল আলোচনা চলছে। আপনি এটাকে কেমন উপভোগ করছেন? নাকি বিরক্ত?

সলিমুল্লাহ খান : লালন ফকিরের মতো করে দেখছি। তিনি ‘জ্যান্তে মরা’ বলে একটা কথা বলেছিলেন। এমনভাবে জীবন যাপন করো, যেন জ্যান্ত মরা। আমি যা বলিনি তা আমার নামে চালু করা আর আমি যা বলেছি তাকে ভুল ব্যাখ্যা করা- এটা হলো বিধিলিপি যেকোনো লেখকেরই। এটা নিয়ে কোনো কথা নেই।

দেশ রূপান্তর : আমাদের এখানে বুদ্ধিজীবিতা এবং অ্যাক্টিবিজম নিয়ে একটা গোলমেলে সমালোচনা আছে। বুদ্ধিজীবিতা এবং অ্যাক্টিবিজমের মধ্যে পার্থক্যের জায়গাটা কীভাবে নির্ধারণ হবে? অ্যাক্টিভিস্টরা কর্মসূচি দিয়ে চিহ্নিত হতে পারেন। বুদ্ধিজীবীর কাজ তো আবার কেবল কর্মসূচিভিত্তিক না...।

সলিমুল্লাহ খান : বুদ্ধিজীবিতা এ ধরনের শব্দ, এগুলো আমি পছন্দ করি না। আমার মনে হয়েছে যে মানুষকে প্রথমে নাগরিক হতে হবে। মানে আপনি ইচ্ছে করলেই পশু হতে পারেন না। Man is a Political Animal  অ্যারিস্টটলের এই কথার মানে হচ্ছে মানুষকে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকতে হয়। সমাজের অধিবাসী মানুষ হিসেবে তার দায়িত্ব আছে যার যার যোগ্যতা অনুসারে যে যার ভূমিকায় সে অভিনয় করবে। কাজেই আপনি যেটিকে অ্যাক্টিভিজম এবং বুদ্ধিজীবিতা বলছেন এই দুটো কিন্তু আলাদা নয়। অর্থাৎ একজন লোক বুদ্ধিজীবী হয়েছেন বলে তিনি কোনো কাজ করবেন না বা যিনি রাজনৈতিক সংগ্রাম করবেন তিনি কোনো বই পড়বেন না ব্যাপারটা সে রকম না। তবে ডিভিশনাল লেবার যেটা বলে শ্রমের বিভাজন যেটা বলেন, সেখানে একজন লোকের প্রধান পরিচয় বুদ্ধিজীবী হয়েছে, আরেকজন লোক অ্যাক্টিভিস্ট হয়েছেন। যেমন ফ্রান্সের জ্য পল সার্ত্রেকে অথবা ইংল্যান্ডের বার্ট্রান্ড রাসেলকে অথবা আমেরিকার নোম চমস্কিকে কেউ বুদ্ধিজীবী বলতে আপত্তি করবে না। এরা কিন্তু কোনো পলিটিক্যাল পার্টি করেন না। আপনি তাদের বুদ্ধিজীবী বলবেন নাকি অ্যাক্টিভিস্ট বলবেন? এডওয়ার্ড সাঈদ ফিলিস্তিনি লোক কিন্তু কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে ৪০ বছর মাস্টারি করেছেন। তিনি কিছুদিনের জন্য প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল কাউন্সিলের সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো দলের মেম্বার হননি। এরা রাজনৈতিক দলের লোক হননি, এরা বুদ্ধিজীবী। আবার পাকিস্তানের ইকবাল আহমেদ এরা যুগপৎ বুদ্ধিজীবী এবং অ্যাক্টিভিস্ট। এখানে আলাদা করার কিছুই নেই। আমার মতে যে লোক সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী তাকে অ্যাক্টিভিস্টও বলা যায়। আমাদের দেশের মাপে যদি বলেন, সেখানে বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক দায়িত্ব বলে একটা কথা আছে। আমাদের দেশে লোকেরা বিবৃতি দিয়ে থাকে। বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক দায়িত্ব বলতে কী বুঝানো হয় তার কোনো গন্ডি কিন্তু আমরা নির্ধারণ করিনি। আহমদ ছফাকে বিশুদ্ধ বুদ্ধিজীবী বলা হয় এই ধরনের লোককে র‌্যাডিকেল বুদ্ধিজীবীর উদাহরণ হিসেবে দেখেছি। কিন্তু বুদ্ধিজীবী আরও বহু রকমের আছে। আমাদের কমরেড মোজাফফর আহমদকে কি বুদ্ধিজীবী বলবেন না? শুধু গদ্য লিখলেই বুদ্ধিজীবী হয় না। আমি নজরুল ইসলামকে বুদ্ধিজীবী মনে করি, জসীম উদ্দীনকেও বুদ্ধিজীবী মনে করি। সব কবিই বুদ্ধিজীবী। যেমন ধরেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ এরাও বুদ্ধিজীবী। আমাদের দেশের কবিরাই হচ্ছেন বুদ্ধিজীবী। কেননা এখানে তেমন আর বুদ্ধিজীবী নেই। আর কর্মসূচিতে বুদ্ধিজীবীদের যাওয়া না যাওয়া নিয়ে যেটা বললেন সেটা তো জনমত। সংকটটা জনমতের। একজন মানুষের পক্ষে সব ইস্যুতে সাড়া দেওয়া সম্ভব নয়। দুই কারণে সম্ভব নয়। একটা হচ্ছে সময় ও সুযোগের সমন্বয়। আরেকটা জিনিস যেটা চোখে পড়ে না, সেটা হচ্ছে সে একমত নাও হতে পারে, অথবা তার দ্বিমত থাকতে পারে। 

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সলিমুল্লাহ খান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত