বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সত্য’ আর ‘বাস্তবতা’

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৪, ১২:৪০ এএম

‘আরে ধুর! সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনো কিছুই আসল না বুঝলেন’ এই বাক্য দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ‘বাস্তবতা’ বোঝাবুঝির আত্মবিশ্বাসকে জ্বালানি সরবরাহ করে আসছিল। ‘আসছিল’, কারণ সেই জ্বালানি আর তেমনভাবে কাজ করছে না। আমাদের, তথা মানুষের বাস্তব কোনো কিছুকে সাব্যস্ত করা এবং ধরে রাখার (আঁকড়ে রাখাও বলা যেতে পারে) প্রবণতা প্রবল। যদিও একটু তলিয়ে দেখলেই পরিষ্কার যে, দুটি মানুষ কখনোই একই বাস্তবতাকে দেখতে পারেন না। ফলে যে কোনো দুটি মানুষের কাছে ‘সত্য’ সবসময়ই একটু সূক্ষ্ম পার্থক্য সমেতই ‘সত্য’। তাই আমরা বলতে পারি যে, ‘সত্য’ নামক ধারণাটির প্রতি বিশেষ ধরনের আত্মবিশ্বাস ও পক্ষপাতই এক ধরনের সত্য। সহজ উদাহরণ, হালিম নামক খাবারটিকে যিনি ভালোবাসেন এবং যিনি বাসেন না তাদের দু-জনের ‘সত্য’ ভিন্ন। তখনই আবার আরেক দল মানুষ দাবি করতে পারেন যে, অন্তত দুটি বিষয় এ ক্ষেত্রে নিশ্চিত, ১. হালিম নামক একটি খাদ্যবস্তু আছে, ২. সেই খাদ্যবস্তুকে ঘিরে পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়টি আছে। যদিও এবারের গল্পটি আরেকটু ভেতরের। সে প্রসঙ্গে অচিরেই হাজির হচ্ছি। এবারের আলাপের মুখ্য আগ্রহ, অনলাইন আর অফলাইনের জীবনকে আলাদা করে একটিকে ‘অবাস্তব’ এবং অপরটিকে ‘বাস্তব’ হিসেবে ধরে নেওয়ার বিষয়ে। যদিও প্রশ্ন থাকে, কোনটি ‘আসল’ আসলে? এ ক্ষেত্রে আমি স্মরণাপন্ন হবো প্রিয় ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ বদ্রিলার্দের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সিমুলেশনস সিমুলাক্রাম।  আমি দৃঢ়ভাবে বোধ করি যে, এই দুটি ধারণার প্রাথমিক বোঝাপড়া না থাকলে এ সময়ের সোশ্যাল মিডিয়ার সত্য বুঝতে পারা দুরূহ হবে। সে সঙ্গে আমরা যে হাইব্রিড সমাজে বসবাস করি সেটিকেও আমরা বুঝতে পারব না।

সিমুলাক্রামের মানে যদি খুঁজতে চাই তাহলে কোনো ব্যক্তি বা কোনো কিছুর রিপ্রেজেন্টেশন বা পরিবেশন, একটি অসন্তোষজনক নকল। মানে আপনার ছবি বা ক্লোন দুটোই ‘আসল’ আপনার অসন্তোষজনক নকল।  এখানে অবশ্য মূল আগ্রহের বিষয়টি থাকবে কার কাছে কি বা কোনটি সন্তোষজনক বা অসন্তোষজনক। যেমন সম্প্রতি একজন ব্যক্তি ডাক্তার (নকল) সেজে ইন্টারভিউ দিয়েছেন এবং সেই বিষয়টি ‘ভাইরাল’ও হয়েছে।  প্রশ্ন উঠছে, তিনি ‘নকল’ ডাক্তার সাজার পরও কেন তার ইন্টারভিউ নেওয়া হলো।  পুরো বিষয়টি কার কাছে সন্তোষজনক? যিনি ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন তার, যিনি দিচ্ছিলেন তিনি, নাকি যারা দেখছিলেন তাদের কাছে? যিনি ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন তার আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেল যে, তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতে বাকিদের দোষারোপ নিয়ে সন্তুষ্ট নন। এই দ্বিতীয় ভিডিওটি দেখলে মনে হবে তিনি অসন্তোষও অনেকের প্রতি। আমি আপনাদের সহজেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নিরুৎসাহিত করব।  বরং সিমুলেশন ধারণাটিকে জানতে উৎসাহিত করব। সহজ করে বললে বলা যায় যে, সিমুলেশন একটি পরিস্থিতি বা প্রক্রিয়ার নকল। যদি আমরা বিয়েবাড়িতে সাজসজ্জার রীতিতে ‘ইমিটেশন’ (গয়না) পরে যাওয়ার প্রবণতার দিকে খেয়াল করি তাহলে আসল ‘সোনার’ গয়না আর ‘ইমিটেশন’ ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করব কীভাবে? দুটোই অলংকরণের হাতিয়ার। এখন অলংকরণের কোনটিকে আপনি অপেক্ষাকৃত শ্রেয়তর সন্তোষজনক মনে করবেন? ‘সোনার গয়না’? কেন? যদি এমন হয় অলংকরণে ‘ইমিটেশনের’ ব্যবহার ‘সোনার গয়না’র চেয়ে বেশি প্রভাবক ভূমিকা পালন করে তাহলে? আপনি কি কখনো ‘মোনালিসা’ কেমন ছিলেন জানেন? যদিও ‘মোনালিসা’ আপনার উপলব্ধি জগতে কি কম উপস্থিত? আপনার যাপিত জীবনের কতখানি ‘আসল’? কেন সেটিকে ‘আসল’ বলেন?

সিমুলেশন ১ : স্মৃতি

সালটা ২০০৮-৯ হবে বাংলা ব্লগের রমরমা কাল। সামহ্যয়ারইন ব্লগে একজন লিখলেন যে, তার স্বামী ভীষণ অসুস্থ এবং তিনি ব্লগারদের কাছে চিকিৎসা বাবদ সাহায্য চান। সেই পোস্টে বিপুল সাড়া পড়ল। একে একে ব্লগাররা এনগেজ হতে থাকলেন। সেকালে অনেক ব্লগার বেশ মোটা অংকের টাকা জোগারে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একদিকে ব্লগ কমিউনিটি ও অন্যদিকে ব্লগ প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা সবারই মনোযোগ বিষয়টিতে। পোস্টটি ক্রমাগতভাবে আরও মনোযোগ পেতে থাকল। পোস্টদাতা পরিস্থিতির প্রমাণস্বরূপ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, নানান রকম টেস্টের ইমেজ দিয়ে ব্লগ পোস্টটিকে আরও অথেনটিক করে চললেন। এদিকে মানবতাবাদী কাজে ব্লগারদের বিপুল উৎসাহ, অন্যদিকে একটি ‘নিক’ (ডিজিটাল আইডি/পরিচয়) থেকে আসা পোস্টকে ঘিরে ভীষণ তৎপরতা। সোশ্যাল মিডিয়ার দুই জমানার পার্থক্য এ ক্ষেত্রে আপনাদের একটু বুঝতে হবে। সেই ‘নিক’-এর কোনো ছবি নেই, কেবল বর্ণনা। তিনি কে? তার জেন্ডার কী এর সবকিছুই পোস্টদাতার ভাষ্যমতোই আমরা মেনে চলছি। এখনকার ফেসবুকের মতো ছবি, মেইল অ্যাড্রেস, পেশার বিবরণ, কার সঙ্গে মেশেন এসব নিয়ে কোনো বিস্তারিত ছবি বা বর্ণনা বা অনলাইন কর্মকান্ড নেই (ফলে অনেকেই এই আইডিকে এখন ফেইক আইডি হিসেবেই গ্রাহ্য করতেন বলে অনুমান করি)। ব্লগে উনার নানান অ্যাকটিভির মধ্য দিয়ে তৈরি ইমেজের ওপর ভিত্তি করেই সব তৎপরতা। সেই সময়ে এক দূরদর্শী ব্লগার বললেন, ব্লগারদের আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার আগে সরেজমিনে, ‘বাস্তব’ পরিস্থিতি বিচার করে আসা দরকার। সেই বিবেচনায় আমরা কয়েকজন গেলাম সেই ব্লগারের বাসায়। সেখানে কিছুক্ষণ থেকে, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে, আলোচ্য দাবিটি স্বচ্ছ নয় এবং তাদের সাহায্য করা ঠিক হবে না। মনে পড়ে সেই সময় এই অনলাইন প্রতারণা বিপুল জনরোষ তৈরি করেছিল।

সিমুলেশন ২ : সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়ে কভিডের সময় নকল টেস্ট সার্টিফিকেট বানিয়ে জনৈক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন এবং তার সহযোগীও গ্রেপ্তার হন। সম্প্রতি তিনি আবার আলোচনায় আসেন বইমেলা ২০২৪-এর বই প্রকাশ করে এবং বইমেলায় ও অনলাইনে ‘হেনস্তার’ মুখোমুখি হন। সেটি নিয়েও অনেক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে, অনলাইনে। একই রকমভাবে ঘটে বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে তরুণীর সম্পর্কের বিষয়ে। খুব সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনা যেখানে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন বাসের হেলপার রমজান মাসে পর্দা না করার কারণে একজন নারীকে বাসে উঠতে অসম্মতি জানাচ্ছেন। অনেক মানুষ ওই হেলপারের কাজকে সমর্থন জানিয়ে ভিডিওটি শেয়ারও করছেন। পরবর্তী সময় ‘ফ্যাক্ট ওয়াচ’ নামক প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করে যে, পুরো ভিডিওটি বানানো ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা যেখানে আমরা এমন একজন ব্যক্তিকে প্রথাগত রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশ হতে দেখি, যিনি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।

আপাতদৃষ্টিতে যে সরল অনুসিদ্ধান্তগুলো আমরা টানতে পারি, তার একটি তালিকা প্রস্তাব করছি। আমি মনে করি আপনারা তালিকাটিকে আরও দীর্ঘ করতে পারবেন।

১. সব ক্ষেত্রেই উল্লিখিত কেন্দ্রীয় চরিত্ররা ‘ভাইরাল’ হতে চেয়েছেন।

২. এগুলোকে তারা সামাজিক পুঁজি (দেখুন : সোশ্যাল ক্যাপিটাল) হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

৩. ‘নৈতিকতা’কে ব্যবহার করেছেন ধনাত্মক আব ঋণাত্মক খ্যাতির কৌশল হিসেবে।

৪. পুরো বিষয়টির সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

৫. ফ্যাক্ট ওয়াচ নামক প্রতিষ্ঠানটি আমাদের ‘সত্য’ জানতে সহায়তা করেছে।

সিমুলেশন ৩ : The simulacrum is never that which conceals the truth-- it is the truth which conceals that there is none. The simulacrum is true.

আমি আপনাদের কাছে যে উদ্ভট (!) প্রস্তাবনাটি করতে চাইছি তা হলো ‘সত্য’ এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা, সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে (ইউজার/প্রোজিউমারকে) আসল ‘সত্যে’ পৌঁছানোর যে প্রস্তাবনা দেয় তার মধ্য দিয়ে সেটি সিমুলেশনকে আড়াল করে। এই সিমুলেশনে আসল বা নকল ডাক্তার বলে কিছু নেই। যা আছে তা হলো আপনাদের কাছে যা মনোযোগ তৈরি করবে এবং জারি রাখবে। এটি আপনাদের ‘আসল’ ডাক্তার সম্পর্কে যে পূর্ব ধারণা সেটিকে চ্যালেঞ্জ করে আপনাদের এনগেজ রাখে মাত্র। অচিরেই প্রথম কেসে উল্লিখিত ভিডিওটি ‘আসল’ কিনা মানে আসলেই সেই ব্যক্তি আছেন কিনা, কেউ ইন্টারভিউ করেছে কিনা সেসবের কোনো গুরুত্ব নেই। যা আছে তা হলো আপনি সেটিকে ‘আসল’ হিসেবে গণ্য করছেন কিনা। মানে কোন ইমেজকে আপনার ‘আসল’ বা ‘নকল’ মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেবল এ.আই. বা ফেসবুককে দোষ দিয়ে লাভ নেই। প্রমাণ সেই কেসটিতে, যেখানে আমরা জানতে পারি, ‘রমজান মাসে পর্দা না করার কারণে একজন নারীকে বাসে উঠতে অসম্মতি’ দেওয়ার পুরো ভিডিওটি বানানো। এই বানানো বিষয়টিতে আপনি যতই মনঃক্ষুন্ন হন না কেন, সেটিও একটি নির্মাণ। রমজান মাসে ‘নৈতিকতা’ জনিত সংবেদনশীলতা এবং ‘হারাতে বসা’ ‘রমজানের’ পবিত্রতাকে রক্ষা করতে হাজির হয়েছেন একজন পুরুষ এবং নট-ইনসিডেন্টলি যিনি ‘অপরাধ’টি করেছেন তিনি একজন ‘নারী’। যা একটি জনতুষ্টিবাদী বয়ানের সহগ। এটি আপনার ‘প্রিয়’ সত্যকে আবারও শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। তাহলে দেখা গেল যে, সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, অ্যালগরিদম এবং উদ্যমী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা জনতুষ্টিবাদী বয়ানই তৈরি করছেন। আবার দেখবেন যে, এর ক্রিটিকাল বিশ্লেষণও জায়গা পাচ্ছে।

যারা এসবের মধ্য দিয়ে কেবলই আদি/মৌলিক সত্যটি খুঁজতে চাইবেন তারা বারংবার ‘ধরা’-ই খাবেন। সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিষ্ঠান, অ্যালগরিদম এবং উদ্যমী কনটেন্ট ক্রিয়েটররা তিন পক্ষই যে ‘সত্য’র দিকে ইঙ্গিত করবেন তা সত্য নয়। সত্যের আবহ মাত্র। হ্যাঁ, অবশ্যই এখানে পুরুষতান্ত্রিকতা আছে, নারীকে দুশ্চরিত্র বানানো আছে। যদিও তা পরিপ্রেক্ষিত নির্ভর। ঠিক তার কয়েকদিন পরেই আপনি দেখবেন যে, ‘ছাদের কার্নিশে’ বসা ‘সাহসী’ নারীর ইমেজকেও সে একইভাবে ভাইরাল করছে। একটি ‘আমার পক্ষ’ বনাম ‘তোমার পক্ষ’ নামক ডাইকোটমি সচল রাখছে।

সিমুলেশন ৪ : সিমুলাক্রামের ‘সত্য’

আর তাই ‘সত্য’র পেছনে ছুটতে থাকলে আপনি সিমুলেশনে আরও বেশি করে তলাতেই থাকবেন। আপনাকে সিমুলাক্রামের পদ্ধতিকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে কীভাবে ‘সত্য’ ও ‘মিথ্যার’ ইমেজ বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তে ক্রিয়াশীল। আপনি যদি মনে করেন, প্রচলিত ক্ষমতার পদবি পাওয়াই ক্ষমতা, তাহলে আপনি ক্ষমতার সৃষ্টিশীলতার সিমুলেশনকে ধরতে পারবেন না। আপনার রাজনীতির বোধ যত বেশি আদি-উৎসভিত্তিক হতে থাকবে, তত বেশি করে আপনি রাজনৈতিক ক্ষমতা হারাতে থাকবেন। যত বেশি করে আপনি কেন্দ্রীয় হিরো বা ভিলেন খুঁজবেন তত বেশি আপনি সিমুলাক্রামের গভীরে যেতে থাকবেন।

একবিংশ শতকের রাজনীতিক সত্তার কাজ ‘সত্য’র অনুসন্ধান নয় বরং কেন ‘সত্য’ বা ‘বাস্তব’ বাস্তব বা সত্য, সেই প্রশ্নগুলো করতে থাকা। কেননা সিমুলেশনের কাজ আপনার ‘সত্য’, ‘মিথ্যার’ গঠনকে পরিচালিত করা। সেখানে ‘অবাস্তব’ বা ‘ইমেজই’ বড় বাস্তব। ৫৬০ টাকায় গরুর মাংস নয় বরং এই দামে গরুর মাংস নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল তৎপরতা অধিকতর বাস্তব।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক, সোশ্যাল মিডিয়া তাত্ত্বিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত