মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুয়েট ফেরে ছাত্ররাজনীতির কোন জের?

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৪৭ এএম

দেশে রাজনীতি আছে কি না, এর চেয়ে দামি হয়ে গেছে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি থাকা না থাকার আলোচনা। চিকিৎসাশিক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বিষয়ক কেওয়াজের মধ্যে সামনে চলে এসেছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দেশসেরা শিক্ষালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি প্রসঙ্গ। আলোচনা আর আলোচনার জায়গায় নেই। এ নিয়ে আস্তিন তোলা, খিস্তিখেউরের এক আজাব চলছে রহমত-বরকত, নাজাতের মাসটিতে।

ঈদ সামনে রেখে এমনিতেই কিছু গোল পাকছে। রাজনীতি নিয়ে সরকার নির্ভার, ড্যামকেয়ার। অপজিশন সংসদে-রাজপথে কুপোকাত। এ নিয়ে ভাবারই দরকার মনে করে না সরকার। কিন্তু, বাজার পরিস্থিতিসহ অর্থনীতির গণ্ডগোল একটু ভোগাচ্ছে সরকারকে। তাও কথার বাড়িতে ফোকলা করে দেওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিকাণ্ড, শিক্ষাগুরুদের অনাচার নিয়ে গজানো আন্দোলন কিছু বাগড়া বাধাচ্ছে। সরকারি ক্যারিশমার তুড়িতে তা বেশিদূর এগোতে পারে না। বুয়েটের ঘটনাটি একটু প্যাঁচ খাইয়ে ফেলার অবস্থার দিকে যাচ্ছে। সেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না হলেও বন্ধের মতো। যদিও সেই বন্ধের নোটিস স্থগিত করেছে মহামান্য হাইকোর্ট। তবে, ছাত্রলীগ প্রায় বয়কট। ছাত্রদল বেখবরে। শিবির অ্যাবস্ট্রাক্ট। একে দেখা যায় না। বুঝে নিতে হয়।

আবরার ফাহাদকে নির্যাতন ও হত্যার জেরে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ বুয়েটে। সেখানকার শিক্ষার্থীরা রাজনীতি চায় না, নাকি ছাত্রলীগকে চায় না? এই ‘চাই-চাই না’ ভাবনার মধ্যেও আরেক রাজনীতি লুকিয়ে আছে। ছাত্ররাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা বা স্থগিতাদেশ বহাল রাখার দাবিতে বুয়েটে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে আন্দোলনকারীদের জোশ দৃশ্যমান। তারা ছাত্রলীগের পাণ্ডা প্রকৃতির ৬-৭ জনকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে অটল। ভিসি তাদের দাবিকে সায় দিয়ে বলেছেন, বিষয়টি ভেবে দেখবেন। আবার ছাত্রলীগ সদলবলে ক্যাম্পাসে ঢুকে বলেছে, ছাত্ররাজনীতি চলতে দিতে হবে। ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ বা বয়কটে রাখা চলবে না। এ দাবিতেও মাথা নেড়েছেন ভিসি। বলেছেন, ভেবে দেখা হবে। তার এমন ভাবনা ও অবস্থানের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ জায়গা থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, ছাত্ররাজনীতি কি অপরাধ? বুয়েট ক্যাম্পাসে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। অবস্থা একদম পরিষ্কার। মেঠো ভাষায় ফকফকা। ভিসি বেচারা যাবেন কই? সবদিকে মাথা নাড়া ছাড়া আপাতত তার গতি নেই। দিনশেষে নিয়োগকর্তা পক্ষের দিকেই মাথার শেষ নাড়া নাড়তে হবে তাকে। তার মাথা তো একটাই। এটাই বাস্তবতা।

বুয়েট পরিস্থিতি ধরে বাংলাদেশের ছাত্রদের রাজনীতি, রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন থাকা নিয়ে আবারও কিছু আলোচনা-বিশ্লেষণ জমেছে। এই আলোচনাটা জরুরিও। যা আগেও হয়েছে। কিন্তু, থেকেছে নিষ্পত্তিহীন। ফয়সালা আসেনি। এর বিপরীতে অপঘটনার অনিবার্র্যতায় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বন্ধ থাকেনি। থাকে না। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। কিছুদিন বড় জোর মিছিল-মিটিং বন্ধ থাকে, দেয়াল লিখন বন্ধ থাকে, তবে ধরন পাল্টে শক্তি প্রদর্শনের মহড়া চলে। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি স্থগিতের সুযোগে ছাত্রশিবির-হিযবুত তাহরীর ভেতরে-ভেতরে বেশ তাগড়া হয়েছে বলে তথ্য আছে ছাত্রলীগের কাছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন হচ্ছে, শিবির-হিযবুত পারলে ছাত্রলীগ কেন পারেনি, পারে না? এ না পারার কারণ শিবির-হিযবুতের যে মোটিভেশনাল কর্মসূচি ছোট ছোট অঘোষিত পাঠচক্র, নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছদ্মনামে পত্রিকা ও ভাঁজপত্র প্রকাশনা আছে; ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মতো সংগঠনগুলোর তা নেই। এখন ছাত্রলীগ যে ছাত্ররাজনীতির অধিকার ফিরে পাওয়ার ছুতায় বুয়েট ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছে তা কি আদৌ রাজনীতির জন্য? বা এ রাজনীতিটা কী? তারা কি বুয়েটে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্টকে কাজ করতে দেবে? নাকি বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বলতে সে কেবল নিজেদের দাপট প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে? সরকারি ছাত্র সংগঠনের যে বিনয়ী হতে হয় ছাত্রদের মন জয় করার চেষ্টা থাকতে হয় তা এ দেশের সরকারি ছাত্র সংগঠনে থাকে না। গড়পড়তা হিসাবে ছাত্রলীগ করা মানে ক্ষমতা এনজয় করা।

বুয়েটে ছাত্রলীগ এক ধরনের আতঙ্কের নাম। এর শিক্ষার্থীরা এক কথায় দেশসেরা মেধাবী। এই মেধার রাজ্যেই আবরার বারবার ফিরে আসে। কখনো কখনো সনি ফিরে আসে। দ্বীপও সেই তালিকারই একজন। বুয়েট থেকে কেবল ডক্টর জামিলুর রেজা চৌধুরী তৈরি হয়নি, এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৮৩ এর মধ্য ফেব্রুয়ারিতে প্রথম রক্তাক্ত প্রতিরোধের কমান্ডার ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের মুনীর উদ্দীন আহমেদ, ছাত্র ইউনিয়নের খন্দকার ফারুক তারা বুয়েটের ছাত্র ছিলেন। আবরারের নৃশংস হত্যাকান্ড ছাত্রলীগকে কালিমালিপ্ত করেছে- এটা বাস্তবতা। বুয়েটে এখন যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে, তারা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানোদের ভাই-ব্রাদার। তাই বুয়েট শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি বন্ধ রাখার পক্ষে না বুয়েটে ছাত্রলীগের রাজনীতি বন্ধের পক্ষে এ বিতর্ক থাকলেও ফয়সালা শেষতক ওপর থেকেই আসবে। দিন কয়েকের মধ্যেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি, শ্রমিক রাজনীতি কী? তা কাদের জন্য, কাদের নিয়ে, কাদের দিয়ে? রাজনীতি থাকলেই তো ছাত্র, শ্রমিক ইত্যাদি রাজনীতির প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের জবাব কারও জানার বাইরে নয়। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতি ভালো কিছু হয়ে থাকলে বিইউপি, এমআইএসটি, আদমজীর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন এ ‘ভালো’ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে? ক্যাডেট কলেজগুলোকেও কেন ভালোর বাইরে ফেলে রাখা হচ্ছে? এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বড় ভাইরা আছেন। তফাৎ হচ্ছে ওই বড় ভাইদের টেন্ডারবাজি-তোলাবাজি লাগে না। ওই বিষয়-আশয়ই নেই সেখানে। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড, ক্যালিফোর্নিয়া প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনোদিনও ছাত্ররাজনীতি ছিল? বা আছে?

চলমান ছাত্ররাজনীতিতে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, খুন, অরাজকতা, মাদকবাণিজ্য, সিট দখল হাসিল হয়। বড় ভাই ও মুরব্বি দলগুলোর ছাত্ররাজনীতি খুব দরকারি। লড়াকু-সাহসী আতিপাতি ভীষণ জরুরি। নইলে পেছনে পেছনে স্লোগানের দোহারি মিলবে কোথায়? হলে সিট দখল করবে কারা? ডাইনিংয়ে ফাও খাওয়ার ব্যবস্থা করবে কারা? টেন্ডারবাজি করানো হবে কাদের দিয়ে? দলীয় প্রোগ্রামে মাথা সাপ্লাই হবে কীভাবে? আগে ছাত্ররাজনীতি হতো ছাত্রদের স্বার্থরক্ষার জন্য আর বর্তমান ছাত্ররাজনীতি নিরীহ ছাত্রদের জীবন সংহার করে। এখানে আদর্শ অবান্তর। আদর্শে তারা কাছাকাছি। উদ্দেশেও বেশ মিল। আদর্শ থাকলে আদর্শকে আদর্শ দিয়ে মোকাবিলার বিষয় থাকত। হাতুড়ি, হেলমেট, রামদা, গুলি-বন্দুকের দরকার হতো না। বুয়েটের মতো মেধারাজ্যেও এই জগাখিচুড়ির কারণে ছাত্রশিবির-হিযবুত ম্যাগনেট হয়ে যায়। ছাত্রলীগ-ছাত্রদলসহ বাদবাকিরা শুকনা কাঠি। ছাত্রলীগেও ছদ্মবেশে শিবির ঢুকে যায়। গেরিলার সঙ্গে হাইব্রিডদের পারার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর ব্যবসা এক কথা নয়। ব্যবসা অত্যাবশ্যক হয়ে যাওয়ায় ক্ষমতার জন্য মৌলবাদের সঙ্গে অঁাঁতাত দোষের নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ এখানে নেহায়েত বাহানা মাত্র।

ছাত্ররাজনীতিতে পচন ধরেছে আরও আগেই। হালে সেটা দুর্গন্ধে উৎকট। এর সুবাদে আছে কেবল দলীয় স্বার্থ হাসিলের লাঠিয়াল হওয়ার গ্যারান্টি। বর্তমানই আগামীর ইতিহাস ও সম্বল। যা ভবিষ্যতে চাটার দল বিনির্মাণে ভূমিকা না রেখে পারে? শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি থাকা না থাকা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা নির্মোহ জরিপ চালানো গেলে প্রকৃত অবস্থাটা বোঝা যেত। সব অভিভাবকই তার সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু শিক্ষার জন্যই পাঠান। রাজনীতির নামে মাস্তানি দলবাজি চাঁদাবাজি গুন্ডামি শেখাতে চাইলে ঢাকায় গুলিস্তান-পল্টন বা ঢাকার বাইরে কোনো স্টেশন-টার্মিনাল বা নেতার বাড়ির আশপাশে পাঠালেই পারতেন। তবে, শিক্ষক কমিউনিটিতে গোলমাল আছে। তাদের অনেকেরই নিজ নিজ পছন্দের ও নিয়ন্ত্রণের ছাত্ররাজনীতি ভীষণ পছন্দের। ছাত্রদের তারা নিজেদের বাহিনীর মতো খাটান। লাল-নীল-সবুজের বাহারে শিক্ষক সমিতি, সিন্ডিকেট, সিনেটসহ নিজেদের নির্বাচনগুলো তারা ঠিকঠাক মতোই করেন-করান। যথারীতি কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচনও হয়। এসব নির্বাচনে ছাত্র নেতাদের বেশ খাটাখাটুনি করানো হয়। বছরের পর বছর যায়, ডাকসুসহ ছাত্রসংসদ নির্বাচন কিন্তু হয় না। শিক্ষাগুরুদের এদিকে বেশ অনীহা।

এ ক্ষেত্রে বড় দুই দলের মন-মননের সাথে শিক্ষকদের বেশ মিল। ছাত্র নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কর্র্তৃত্ব চর্চা দমানোতে তাদের এমন আন্তরিকতা সত্যিকার ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠায় থাকলে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে আজ এত নেতিবাচক কথা আসত না। ছাত্রনেতা মানেই পাণ্ডা-গুণ্ডা, চাঁদাবাজ-ধরিবাজের কলঙ্ক এত তীব্র হতো না। রাজনীতিকে শিক্ষার্থী-অভিভাবক কেউই লেঙ্গুড় ভাবত না। বরং গর্ব করত। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে ভূমিকাও রাখতে পারত ছাত্ররাজনীতি। চর্চা হতো পেশির বদলে মেধার। ছাত্ররাজনীতি বা ছাত্র আন্দোলন যে শিক্ষার্থীর জন্য কোনো সমস্যা নয়, সম্ভাবনার তার প্রমাণ গত শতকের ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৮, ৬৯, ৭১ কিংবা ৯০ সাল। ছাত্র সমাজের ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে জনতার বিজয় ছিনিয়ে আনার এমন রেকর্ড দুনিয়াতে কম। ছাত্রদের সেই বোধ-বুদ্ধি-চেতনা ধ্বংস করল কারা? রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরাও কেন এখন তাদের সন্তানদের ছাত্ররাজনীতিতে আনতে চান না? দেশের বাইরে পাঠিয়ে নিজেদের সন্তানদের এসব থেকে দূরে রাখেন? ফেরটা কোথায়?

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত