বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শিক্ষাক্রম নিয়ে ‘ছলেখেলা’!

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪৬ এএম

স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রমের চারটি আবর্তন শেষ হয়েছে; ২০১৯ সালে শুরু হলো শিক্ষাক্রমের পঞ্চম আবর্তনের কাজ। বর্তমান লেখাটি শিক্ষাক্রম কোর কমিটির সম্মানিত সদস্য ড. এম তারিক আহসানের সাক্ষাৎকার (‘শিক্ষায় এই রূপান্তরটা দরকার ছিল’, দেশ রূপান্তর ২৬/১২/২০২৩) এর প্রতিক্রিয়া। তার দাবি, হাজারের বেশি স্টেকহোল্ডারদের ‘এনগেজড’ করে তাদের পরামর্শ, মতামত নিয়ে এই কারিকুলামটা ‘ডিজাইন’ করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিভাবকদের একটা বিশাল গ্রুপের থেকে মতামত নিয়েছেন। তাই যদি হবে তবে এখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন কেন?

প্রচলিত শিক্ষাক্রমের প্রধান ত্রুটির ভিত্তি হিসেবে ড. আহসান উল্লেখ করেন, ইংরেজদের ‘অবজেক্টিভ’ ছিল ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল জব মার্কেটের চাহিদা পূরণ করা’, এবং ‘কলোনি টিকিয়ে রাখার জন্য ফলোয়ার তৈরি করা’। আগের চারটি আবর্তনের শিক্ষাক্রমের মূল্যায়নে তিনি বলেছেন, সেগুলো ছিল ‘মুখস্থ-নির্ভর, কন্টেন্ট-নির্ভর এবং পরীক্ষা-নির্ভর ব্যবস্থা’। তারপর তিনি দাবি করেন নতুন শিক্ষাক্রমে ‘জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসঙ্গটি সংকুচিত করে দক্ষতাকে বেশি ফোকাস করা হয়েছে’। তার মতে বেশি সৃষ্টিশীল কাজ, সমস্যা সমাধান, এন্টারপ্রেনারশিপ এবং লোকাল বিজনেস রিলেটেড স্কিলগুলো ডেভেলপ করা দরকার; মানে, এসবেরই চেষ্টা করা হচ্ছে ‘নতুন’ শিক্ষাক্রমে! এবার ড. আহসানের দাবির সারবত্তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

১. ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন’

‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন’ কোনো নতুন ধারণা নয়। কিন্তু তাদের দাবি, তারা একটি নতুন ধারণার আওতায় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন করছেন। অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের মূল বিষয় ‘করে শেখার’ (Learning by doing) কথা অ্যারিস্টটল বলে গেছেন ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। এমন অভিজ্ঞতা-জাত শিখন এ অঞ্চলে একসময় ‘গুরুগৃহে’ প্রচলিত ছিল। পরে জাতীয়ভাবে শিক্ষাক্রম তৈরির শুরু থেকেই পরীক্ষানিরীক্ষা-নির্ভর

প্রকৃতি বিজ্ঞান শিক্ষায় অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের জন্য শিক্ষাক্রম ও শিখনের কিছু অংশ ব্যবহারিক কাজ (২৫% নম্বর), অনুসন্ধান, নির্ধারিত কাজ (Assignment) ইত্যাদি হিসেবে শিক্ষার্থীদের করানো হয়ে আসছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, সংগীত ইত্যাদিতে এ ধারার শিখনের প্রাধান্য থাকে। বাংলাদেশ শিক্ষাক্রমের চতুর্থ আবর্তনে (২০১২) প্রকৃতি বিজ্ঞানের গন্ডি ছাড়িয়ে অধিকাংশ বিষয়ে ‘অনুসন্ধানমূলক কাজের’ (Investigation) ব্যবস্থা রাখা আছে। এক্ষেত্রে পুরো কোর্স অভিজ্ঞতাভিত্তিক করার দরকার নেই, সম্ভবও নয়।

উল্লেখ্য, ডেভিড কোব (১৯৮৪) Experiential learning model তৈরি করেছিলেন বয়স্কশিক্ষা (Andragog) তথা প্রশিক্ষণ কোর্সের জন্য, শিশু-কিশোরদের শিক্ষার (Pedagog) জন্য নয়।

২. ইংরেজ আমল

ড. তারিক আহসান এদেশের শিক্ষায় ইংরেজদের যে বাজে উদ্দেশ্যগুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রবক্তা ছিলেন লর্ড মেকলে (মেকলের মিনিটস, ১৮৩৫); সে মিনিটস তো বাস্তবায়িতই হয়নি! কারণ প্রায় একই সময়ে আন্তরিক গবেষক উইলিয়াম অ্যাডাম প্রকাশিত ৩৪২+পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে (Vernacular Education in Bengal and Behar, 1838) এদেশের স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ কোম্পানি আমলে ১৮৫৪ সালে উডের ডেসপাচের ভিত্তিতে প্রথম শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করা হয়।

৩. ‘মুখস্থ ও প্রতিযোগিতা’ এবং ‘পরীক্ষা-বিরোধী’ বুলি

যুক্তরাষ্টের শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী বি এস ব্লুম এবং তার দল (১৯৫৬) আধুনিক যুগে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্যগুলোকে Taxonomy of Educational Objectives  শিরোনামে ‘চিন্তন (Cognitive), ভাবাবেগ (Affective)  এবং মনোপেশিজ (Psychomotor)’ তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম ক্ষেত্রটি কোনো বিষয় জানা, বোঝা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ (সৃষ্টি) এবং মূল্যায়ন করতে পারার। দ্বিতীয়টি কোনো বিষয়ের প্রতি আবেগ/দরদ তৈরি হওয়া বিষয়ক। প্রথম ক্ষেত্রের বিষয়গুলো ভালোমতো জানা-বোঝা হলে সেগুলোর প্রতিও শিক্ষার্থীর দরদ আসে। আর এরূপ দরদ এলে ‘জ্ঞানী’ ও ‘দরদী’ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ‘মনোপেশিজ দক্ষতা’ অর্জন করে।

শিক্ষার কিছু বিষয় মুখস্থ করা ও মনে রাখা জরুরি। প্রতিযোগিতা (competition) শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে একটি আবশ্যিক বিষয়। প্রতিযোগিতাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করলে শিক্ষার্থীরা উৎসাহই হারিয়ে ফেলবে। প্রতিযোগিতাহীন সহযোগিতা (Cooperation) কোনো দক্ষতায় রূপ না নিয়ে মূূল্যায়ন ও পরীক্ষায় জালিয়াতির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।      

৪. পরিমার্জনাধীন শিক্ষাক্রমের তিনটি গুরুতর সমস্যা 

১) ফলাফল-ভিত্তিক শিক্ষাক্রম সারা বিশ্বে চলছে ছয় দশক ধরে; এখনো শিখনফল লেখার জন্য নতুন নতুন সক্রিয় ক্রিয়াপদ (Action verb) তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষাক্রমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ‘যোগ্যতার নির্যাস’ (Essence of Competency) নষ্ট হওয়ার ভয়ে গোঁ ধরে বসে আছেন, ‘শিখনফল’ তারা লিখবেনই না। শিক্ষাক্রমকে শিখনফলের সূক্ষ্ম স্তরে না পৌঁছানোতে লেখকরা বই লিখতে হিমশিম খাচ্ছেন, শিক্ষকরা শিক্ষণ-পরিকল্পনা করতে বিপদে পড়ছেন, মূল্যায়নকারীরা তো মূল্যায়ন করতেই পারবেন না।

২) নবম-দশম শ্রেণিতে ১৯৬১ সাল থেকে শাখাভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি এবং ১৯৬২ সাল থেকে ম্যাট্রিকুলেশনের পরিবর্তে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (ঝঝঈ) পরীক্ষা চলে আসছে। ৬০-৬২ বছর পর এখন এ শিক্ষাকে একমুখী করার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।

৩) শিক্ষাক্রম রূপরেখার মূল্যায়ন পরিকল্পনা: শিক্ষক/অভিভাবক/বন্ধুদের দিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেুণি পর্যন্ত ১০০%, চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৬০%, নবম-দশম শ্রেণিতে ৫০%, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩০%। শিক্ষকদের হাতে এত বেশি নম্বর কোন খাতে ব্যবহৃত হবে? কোচিং, প্রাইভেটের হিড়িক কীভাবে ঠেকাবেন? নিরীহ শিক্ষার্থীদের কীভাবে নিজ শিক্ষকের অবিচার থেকে রক্ষা করবেন?

শিক্ষামূল্যায়ন এখন তিনটি চিহ্নের মাধ্যমে করা হবে; বৃত্ত, বর্গ ও ত্রিভুজ। এসব চিহ্নের মাধ্যমে গঠনকালীন মূল্যায়ন (Formative Assessment) হতে পারে; কিন্তু তার হার কোনো শ্রেণিতে ৩০%-র বেশি বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। আর সারা বিশ্বে চূড়ান্ত মূল্যায়ন (Summative Test) হয় প্রধানত চিন্তন ক্ষেত্রের এবং ফলাফল দেওয়া হয় গ্রেডিং পদ্ধতিতে। বাংলাদেশে এ পদ্ধতি একটু দেরিতে শুরু করা হয়েছে; এ থেকে ফিরে আসা ঠিক হবে না।

লেখক : শিক্ষাক্রম গবেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত