সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঈদের আগে প্রবাসী আয়ে হোঁচট

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৭ এএম

সাধারণত ঈদের সময় বেশি রেমিট্যান্স পাঠান প্রবাসীরা। কিন্তু এ বছর ঈদের আগে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রবাসী আয়ে। মার্চ মাসে দুই বিলিয়ন ডলারেরও কম প্রবাসী আয়ের চিত্র দেখা গেছে। অথচ অর্থমন্ত্রী এক দিন আগেই বলেছিলেন, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বাড়ায় দেশের অর্থনীতির সংকট কেটে গেছে। গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যানে প্রবাসী আয়ের এ তথ্য জানা গেছে।

তথ্য পর্যালোচনা করে যায়, সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৯৯ কোটি ৬৮ লাখ বা ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দেশীয় মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১১০ টাকা ধরে) যার পরিমাণ ২১ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে আসা প্রবাসী আয় তার আগের মাস ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ কোটি ৭৭ লাখ ডলার বা ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ কম। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রবাসী আয় ছিল ২১৬ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

এ ছাড়া মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে ২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার বা ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। গত বছরের মার্চে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০২ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৯৯ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলার (১৯ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন)। তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ২৬ কোটি ১৭ লাখ ডলার, বিশেষায়িত একটি ব্যাংকের মাধ্যমে ৩ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ১৬৯ কোটি ১৭ লাখ ডলার এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৮১ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।

চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১০ কোটি মার্কিন ডলার, আর ফেব্রুয়ারিতে আসে ২১৬ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ১৬১ কোটি ৭ লাখ মার্কিন ডলার। আগের ২০২১-২০২২ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ১০৩ কোটি ১৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ মার্কিন ডলার। যা সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিট্যান্স।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১০ অথবা ১১ এপ্রিল দেশে ঈদ উদযাপিত হবে। তার আগে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা।

২০২৪ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ২১১ কোটি ৩১ লাখ (২.১১ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ফেব্রুয়ারি মাসে তার চেয়েও বেশি ২১৬ কোটি ৬০ লাখ (২.১৬ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন। যা ছিল আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

ফেব্রুয়ারি মাসে গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল। ২০২৩ সালের মার্চে ২০২ কোটি ২৫ লাখ (২.০২ বিলিয়ন) ডলার এসেছিল।

আর এর ওপর ভর করে দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ডলারের ‘অস্থির’ বাজার ‘সুস্থির’ হতে শুরু করেছে। কমতে শুরু করেছে ডলারের তেজ। মান বাড়ছে টাকার। কয়েক দিন আগে যেখানে ১২৪ টাকা পর্যন্ত দরে রেমিট্যান্সের ডলার কিনছিল ব্যাংকগুলো; এখন তা ১১৩/১১৪ টাকায় কিনছে। গতকাল সোমবার আমদানি বিল নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম নেওয়া হয়েছে ১১৬ থেকে ১১৭ টাকা, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ১২২ থেকে ১২৪ টাকা।

খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটেও ডলারের দরে বড় পতন হয়েছে। সোমবার প্রতি ডলার ১১৮ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাস দেড়েক আগেও তা ১২৬-১২৭ টাকায় বিক্রি হতো।

তবে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর এখনো অনেক কম; ১১০ টাকা। অর্থাৎ এক ব্যাংক আরেক ব্যাংক ১১০ টাকায় ডলার কিনছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে যে ডলার বিক্রি করছে, সোয়াপ কারেন্সির আওতায় টাকা-ডলার অদলবদল করছে সেটাও ১১০ টাকা নিচ্ছে।

মাস দুয়েক আগে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দর ১১০ টাকায় উঠেছিল।

গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা প্রায় ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।

আগের দুই মাস অক্টোবর ও নভেম্বরেও বেশ ভালো রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। অক্টোবরে এসেছিল ১৯৭ কোটি ৭৫ লাখ (১.৯৮ বিলিয়ন) ডলার; নভেম্বরে ১৯৩ কোটি (১.৯৩ বিলিয়ন) ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) ১৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বেশি।

গত অর্থবছরের এই সাত মাসে ১৬ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। যা ছিল আগের অর্থবছরের (২০২১-২২) চেয়ে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি।

ব্যাংকগুলোর আড়াই শতাংশ বাড়তি প্রণোদনায় প্রবাসী আয় বাড়ছিল বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। এ ছাড়া অনেক ব্যাংক বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করায় প্রবাসী আয় বাড়ছিল বলে জানিয়েছেন তারা।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১৩৩ দশমিক ৪৪ কোটি (১.৩৩ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। একক মাসের হিসাবে যা ছিল সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

২০২০ সালের প্রথম দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দেশে দেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় লকডাউন; সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। কমতে শুরু করে রেমিট্যান্স। সেই ধাক্কায় ২০২০ সালের মার্চে রেমিট্যান্স ১২৭ কোটি ৬২ লাখ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে তা আরও কমে ১০৯ কোটি ২৯ লাখ ডলারে নেমে আসে। এরপর থেকে অবশ্য রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সোমবার রেমিট্যান্সের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, মার্চ মাসে ১৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্সের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ২৬ কোটি ১৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। বিশেষায়িত কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৩ কোটি ৫২ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

বেসরকারি ৪৩ ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৬৭ কোটি ১৭ লাখ ডলার। আর নয়টি বিদেশি ব্যাংক এনেছে ৮১ লাখ ১০ হাজার ডলার।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত