সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হাজার কোটির সেমাই বাজারের সাতশ কোটি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০৯ এএম

ঈদে মিষ্টিজাতীয় খাবার হিসেবে সেমাইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এ কারণেই ঈদের দিন ধনী-গরিব সবার ঘরে সেমাই রান্না হয়। তাই দেশে গড়ে উঠেছে সেমাইয়ের বিশাল বাজার, যার আকার প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রোজার ঈদেই বিক্রি হয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকার সেমাই।

একসময়ে সনাতন পদ্ধতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান সেমাই তৈরিতে করলেও এখন অনেক করপোরেট কোম্পানি এই পণ্যটির উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। হাতে বানানো লাচ্ছা ও চিকন সেমাই (বাংলা, বার্মিজ ইত্যাদি সেমাই নামে পরিচিত) ছিল ভোক্তাচাহিদার তুঙ্গে। তবে সময়ের পালাক্রমে সেমাইর বাজার দখল করতে শুরু করেছে নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো। এতে পণ্যমান ও মোড়কজাতের উন্নয়নের পাশাপাশি দামেও এসেছে বেশ পরিবর্তন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে তৈরি করা লাচ্ছা সেমাই ছাড়াও মোড়কজাতকারী প্রায় ৪০টি ব্র্যান্ডের সেমাই বাজারে পাওয়া যায়।

উদ্যোক্তাদের একাংশ জানায়, দেশে বছরে সেমাইয়ের চাহিদা ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টন। যার বাজার মূল্য প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার। বর্তমানে সেমাইয়ের বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে বড় বড় কোম্পানি, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে বনফুল, প্রাণ, ইস্পাহানি, রাঁধুনি, ওয়েল ফুড, বসুন্ধরা, সেজান, বম্বে, রোমানিয়া, কোকোলা অন্যতম। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব কোম্পানির উৎপাদিত সেমাই বিশ্বের প্রায় ৩৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের চাহিদার অর্ধেকের বেশি লাচ্ছা ও চিকন সেমাই বগুড়া ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জেলার স্থানীয় কারখানায় তৈরি হয়। এরপর ঢাকার কেরানীগঞ্জ ছাড়াও করপোরেট কোম্পানিগুলো নিজস্ব কারখানায় সেমাই তৈরি করে থাকে। এর মধ্যে শুধু বগুড়ায় বছরে শতকোটি টাকার বেশি সেমাই উৎপাদন হয়।

এ ছাড়া ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে চিকন সেমাই উৎপাদনে ক্রমানুসারে প্রথম সেজান ব্যান্ডের কুলসন, দ্বিতীয়ত রাঁধুনি ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বনফুল। এসব ব্র্যান্ডের সেমাইর বাজার প্রায় ৯০ থেকে ১১০ কোটি টাকার। তবে এখনো খোলাবাজারের সেমাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, এখনো সেমাইয়ের প্রায় ৬০ ভাগ প্যাকেটজাত নয়, এমন সেমাই বিক্রি হচ্ছে।

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মার্কেটিং ম্যানেজার মোহাম্মদ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের খোলাবাজারে লাচ্ছা সেমাই বড় একটা অংশ দখল করে আছে। এরপর চিকন সেমাইর অবস্থান। শতকরা হিসাবে তা মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে ব্র্যান্ড ক্রমানুসারে সেমাইর মার্কেটে সেজান প্রথম। এরপর আমাদের রাঁধুনির অবস্থান। সব মিলিয়ে ব্র্যান্ডের কোম্পানিগুলো বাজার মূল্য ৮০ থেকে ১২০ কোটি টাকার বেশি রয়েছে।’

ঈদকেন্দ্রিক বিক্রি প্রসঙ্গে মাহমুদ জানান, বছর জুড়ে দেশের বাজারে যতটা সেমাই বিক্রি হয়, তার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই ঈদের সময়টায় হয়।

এদিকে রাজধানীর সেমাইয়ের বাজার ঘুরে দেখা যায়, ঈদ কেন্দ্র করে বেশ জমে উঠেছে সেমাই বাজার। তবে মুখরোচক এই পণ্যের চাহিদা বাড়ায় এবার সব ধরনের ছোট-বড় কোম্পানি প্রতি সেমাইর প্যাকেট ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ২০০ গ্রাম চিকন সেমাইয়ের প্যাকেট ১০ টাকা ও ৫০০ গ্রামের লাচ্ছা সেমাইর প্যাকেটে ৫০ টাকা বেড়েছে। এর মধ্যে প্রাণের ২০০ গ্রাম লাচ্ছা সেমাইর প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা। কুলসুন (২০০ গ্রাম) ৪৫ ও বনফুল ৫০ টাকা। এ ছাড়া প্রাণের ৪০০ গ্রাম ঘি সেমাই বিক্রি হচ্ছে ২০০, ৫০০ গ্রাম প্যাকেটের বম্বের ইনস্ট্যান্ট জাফরানি সেমাই ১৮০, বনফুল ২০০ ও অলিম্পিয়ার ৫০০ গ্রামের সেমাইর প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়।

কারওয়ান বাজারের হাজি মিজান স্টোরের স্বত্বাধিকারী মুনশি মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার সেমাই বাজার সবচেয়ে গরম। কোম্পানিগুলো ছোট-বড় সব ধরনের সেমাই প্যাকেটে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সব থেকে বেশি বেড়েছে জাফরানি ও ঘি সেমাইর দাম।

সূত্র বলছে, দেশের বাজারে খোলা (লাচ্ছা) সেমাই উৎপাদন ও সরবরাহের দিক থেকে প্রথম অবস্থানে রয়েছে বগুড়া। প্রতিবছর প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার খোলা সেমাই উৎপাদন করে থাকে বগুড়ার ছোট-বড় সেমাই কারখানাগুলোয়। তবে এসব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঈদের বাজার কেন্দ্র করেই প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার সেমাই উৎপাদন করে থাকে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি মাফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষের কাছে বগুড়ার সাদা ও পাতলা সেমাই বেশ জনপ্রিয়। এর মধ্যে আকবরিয়া, সেমলি, রাজা, খাজাসহ বেশ কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর আকবরিয়া একাই বছরে ৩০ থেকে ৩৩ কোটি টাকার সেমাই বিক্রি করে। এর বাইরে অন্যান্য কোম্পানি ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার সেমাই বিক্রি করে। সব মিলিয়ে বছরে বগুড়ার সেমাইর বাজার প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার বেশি। তিনি আর বলেন, ঈদ কেন্দ্র করে বগুড়ায় ৬০ কোটি টাকার সেমাই বিক্রি হয়। বছরের বাকি সময় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার সেমাই বিক্রি হয়। তবে আমাদের অঞ্চলের আকবরিয়া উৎপাদিত সেমাই বাণিজ্যিকভাবে না হলেও অস্ট্রেলিয়া কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে তাদের সেমাই রপ্তানি হয়।’

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেমাইয়ের বাজার মোটা দাগে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। এগুলো হলো সাধারণ বেকারির তৈরি, ছোট ছোট অঞ্চল বা এলাকাভিত্তিক ব্র্যান্ড এবং প্রতিষ্ঠিত বড় কোম্পানির কারখানায় উৎপাদিত সেমাই। সাধারণ বেকারির মধ্যে আবার অধিকাংশ শুধু ঈদকেন্দ্রিক। অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় ব্র্যান্ডও রয়েছে। যেমন : উত্তরবঙ্গে বগুড়ার আকবরিয়া একটি জনপ্রিয় সেমাইয়ের ব্র্যান্ড। ওই এলাকা থেকে এশিয়া, শ্যামলী, কোয়ালিটি, খাজা বেকারি, ফুড ভিলেজের মতো বেশ কিছু ব্র্যান্ড সারা দেশে সেমাই বিক্রি করছে।

বগুড়া এলাকার সেমাই ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বগুড়ায় অন্তত তিন শতাধিক চিকন সেমাইয়ের কারখানা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি কারখানা রয়েছে বগুড়ার মাদলা, বেজোড়া, ঢাকন্তা, বনানী, সুলতানগঞ্জপাড়া, চেলোপাড়া, শ্যামলাকাঁথি, নারুলী, নুরানী মোড় ও বৃন্দাবনপাড়ায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত