মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রোজার ঈদেই জুতার এক-তৃতীয়াংশ

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:০৭ এএম

রমজানের ঈদ দরজায় কড়া নাড়ছে। কদিন বাদেই মুসলমানরা সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদে মাতবেন। উৎসব রাঙাতে পোশাকসহ অন্যান্য কেনাকেটায় ব্যস্ত সবাই। আর এই কেনাকাটার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পাদুকা বা জুতা। গায়ের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পছন্দের এ পণ্যটি না কিনলে কি হয়? ক্রেতাদের প্রিয় এই পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই বিক্রি হয় রোজার ঈদে।

জুতা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, সারা বছর যে পরিমাণ জুতা বিক্রি হয় এর ৩০-৩৫ শতাংশ বা এক-তৃতীয়াংশ হয় রোজার ঈদে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে সবচেয়ে বড় বাজার হিস্যা রয়েছে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার ও বাটা সু বাংলাদেশের। এ ছাড়া বে এম্পোরিয়াম, ওরিয়ন, ওয়াকার, ভাইব্রেন্ট, জেনিস, ফরচুনা, জিলস, লোটো, লেদারেক্সসহ বেশ কিছু কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো দেশের বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে। নতুন নতুন ব্র্যান্ড আসায় পণ্যের বৈচিত্র্যও পাচ্ছেন ক্রেতারা।

স্থানীয়বাজারে জুতা বিক্রি করে সবচেয়ে বেশি আয় করা প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের কোম্পানি সচিব ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে জানান, একটা সময়, বিশেষ করে কভিডের আগে রোজার ঈদ ছিল জুতা বিক্রির সবচেয়ে বড় মৌসুম। এটি এখনো আছে। তবে পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন উৎসবেও পণ্যটির বিক্রি বাড়ায় এককভাবে রোজার ঈদের হিস্যা কিছুটা কমেছে। তারপরও জুতা বিক্রি থেকে আয়ের ৩০-৩৫ শতাংশ এখনো এই ঈদ থেকেই আসে। এটিই সর্বোচ্চ আয়ের মৌসুম।

২০২২-২৩ হিসাববছরে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার দেশ-বিদেশে জুতা বিক্রি করে ১ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকার বেশি আয় করে, যার মধ্যে স্থানীয় বাজারে বিক্রি থেকে আয় হয় ৯৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এ সময় বিভিন্ন দেশে জুতা রপ্তানি করে অ্যাপেক্সের আয় হয়েছে ৭১৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

দেশের বাজারে দীর্ঘদিন একচেটিয়া ব্যবসা করেছে বহুজাতিক কোম্পানি বাটা সু। বর্তমানে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে না পারলেও বাজার হিস্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কোম্পানিটি। রোজার ঈদই কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় মৌসুম। করোনার সময়ে ঈদকেন্দ্রিক ব্যবসা না হওয়ায় প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়েছিল বাটা সু। তবে সেই ধাক্কা গত দুই বছরে ভালোভাবেই সামলে নিয়েছে। ২০২২ সালে বাটা সুর আয় ছিল ৯৮৫ কোটি টাকা, যা আগের বছরেরে চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে কোম্পানিটির আয় আরও বেড়েছে। ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত বাটার আয় হয়েছে ৭৫৪ কোটি টাকা। শেষ প্রান্তিকের চূড়ান্ত হিসাব শেষে এ আয় আরও বাড়বে বলে প্রত্যাশা কোম্পানিটির।

এদিকে ব্র্যান্ডগুলোর আয়ের এক-তৃতীয়াংশ রোজার ঈদ থেকে এলেও দেশের অন্যতম পাদুকা শিল্পাঞ্চল ভৈরবের ব্যবসায়ীদের আয় পুরোপুরি রোজার ঈদকেন্দ্রিক। পুরো দেশে জুতার সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ভৈরব। এখানে রয়েছে ছোট-মাঝারি ও বড় ৭ হাজারের বেশি কারখানা। ঈদের সময় ঘনিয়ে আসায় বর্তমানে ক্রেতাদের পছন্দের এই পণ্য তৈরি ও পাইকারি বিক্রিতে এখন ব্যস্ত দেশের অন্যতম বড় পাদুকাশিল্পাঞ্চল ও মার্কেট কিশোরগঞ্জের ভৈরব।

ভৈরবের বিভিন্ন কারখানার মালিকরা জানান, মূলত শবেবরাতের পরদিন থেকে ঈদের তিন দিন আগে পর্যন্ত তাদের বিক্রির সময়। এ সময় তারা এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার জুতা পাইকারি বিক্রি করে থাকেন। এবার তাদের লক্ষ্য প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এই ৪২ দিনেই বিক্রি আসবে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

ভৈরব পাদুকাশিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আল আমিন মিয়া দেশ রূপান্তরকে জানান, ভৈরবে মূলত রোজার ঈদকেন্দ্রিক জুতা উৎপাদন হয়। এটিই এখানকার উৎপাদনকারীদের প্রধান মৌসুম। এখানে সারা বছর যে পরিমাণ জুতা উৎপাদন হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশই বিক্রি হয় রোজার ঈদে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানী ঢাকার পরেই দেশের পাদুকাশিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার নদীবন্দর ভৈরবে। ভারত বিভক্তির পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজধানী কলকাতা শহরে পাদুকাশিল্পে কাজ করা এখানকার কারিগররা নিজ এলাকায় এসে স্বল্প পরিসরে গড়ে তুলেছিলেন পাদুকাশিল্পের কারখানা। তখন ভৈরব অঞ্চল ছিল তাঁতশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের তাঁতশিল্পের বিপর্যয় শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে এখানকার তাঁতশিল্প বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কর্মহারা তাঁতশিল্পের মালিকরা তাদের শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে তোলেন পাদুকার কারখানা, যেগুলো বর্তমানে ফুলেফেঁপে আজকের অবস্থানে এসেছে।

বর্তমানে এখানকার হাতে তৈরি ৬-৭ হাজার কারখানার পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতিসমৃদ্ধ রপ্তানিমুখী ৩৫টির মতো বড় পরিসরের কারখানাও আছে। আর এসব কারখানায় দেড় লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। নারী শ্রমিক কাজ করেন ৩০ হাজারের মতো। পাদুকা তৈরির কাঁচামাল, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

৬টি বৃহৎ পাইকারি মার্কেট এবং ৫০টির বেশি পাদুকাশিল্প পল্লী নিয়ে এখানে গড়ে উঠেছে একটি বড় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বলয়। পৌর শহরের ভৈরব বাজার, কমলপুর, ভৈরবপুর, গাছতলাঘাট, শম্ভুপুর, জগন্নাথপুর, শিবপুর ইউনিয়নের শিবপুর, জামালপুর, ছনছাড়া, কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের কালিকাপ্রসাদ, আদর্শপাড়া, আতকাপাড়া, আকবরনগর, মিরারচর, গজারিয়া ইউনিয়নের গজারিয়া, বাঁশগাড়ি, মানিকদী, পুরানগাঁও, শিমুলকান্দি ইউনিয়নের শিমুলকান্দি, গোছামারা, মধ্যেরচর ইত্যাদি গ্রামে প্রায় ৫০টি পাদুকা তৈরির পল্লী গড়ে উঠেছে।

ভৈরবে উৎপাদিত জুতা আকর্ষণীয় ডিজাইন, তুলনামূলক কম দাম এবং গুণগত মানের কারণে সারা দেশে এখন বেশ জনপ্রিয়। ব্যবসায়ীদের কাছেও বাণিজ্যিকভাবে ভৈরবের জুতা ব্যাপকভাবে সমাদৃত। 

এদিকে ভৈরবের পাদুকাশিল্পের সাফল্য দেখে পাশের অঞ্চল কুলিয়ারচর, বাজিতপুর এবং বেলাব উপজেলাতেও পাদুকাশিল্প কারখানা গড়ে উঠছে এবং দিন দিন বিকশিত হচ্ছে। পোশাকশিল্পের মতো এখানে একটি বড় পাদুকাশিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলা সম্ভব সরকারি উদ্যোগে।

এসব কারখানা থেকে দেশের অনেক নামিদামি ও শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড জুতা প্রস্তুত ও সংগ্রহ করে থাকে। যার মধ্যে অ্যাপেক্স, বাটা, বে, পেগাসাস, আফজালসুজ অন্যতম। এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যসহ মালয়েশিয়া ও জাপানে বছরে কয়েকশ কোটি টাকার জুতা বিক্রি হচ্ছে।

এখানকার তৈরি জুতার মান ও মূল্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ক্রেতাদের বেশ সন্তুষ্টি রয়েছে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা হয় রংপুর সদরের ওমর ফারুক, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার জয়নাল আবেদীন, সিলেটের আমিনুর রহমান ও হবিগঞ্জের ঝুটন চন্দ্র লালের সঙ্গে। তারা প্রত্যেকে ২০-২৫ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানান। তাদের জুতার দোকান আছে। এর আগে তারা ঢাকা থেকে জুতা নিতেন। কিন্তু ১০-১২ বছর ধরে এখান থেকে জুতা নিচ্ছেন। এখানকার জুতার মান ভালো এবং দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় তারা বেশ ভালো মুনাফাও করতে পারছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত