বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতিতে বাধা নেই

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩৩ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন স্থগিত করেছে হাইকোর্ট। এর ফলে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি করতে আর কোনো বাধা থাকছে না। এই রায়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে ছাত্রলীগ। তাদের দাবি, আবারও বুয়েট ক্যাম্পাসে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতিতে ফিরবেন শিক্ষার্থীরা। উচ্চ আদালতের আদেশ মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার।

তবে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের আকাক্সক্ষা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূরণ করতে উপাচার্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ফেরার মাধ্যমে ‘অন্ধকার দিনগুলো’ যেন ফের ফিরে না আসে সেজন্য শিক্ষকদের পাশে থাকার আরজি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের এক নেতার কক্ষে নিয়ে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। তাদের তুমুল দাবির মুখে একই বছরের ১১ অক্টোবর ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে বুয়েট প্রশাসন।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের ওই প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে বুয়েটেরই শিক্ষার্থী এক ছাত্রলীগ নেতা গতকাল সোমবার সকালে হাইকোর্টে রিট করেন। পরে দুপুরে শুনানি শেষে ওই প্রজ্ঞাপন স্থগিতের আদেশ দেওয়া হয়।

ইমতিয়াজ হোসেন রহিম রাব্বির করা রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের সমন্বয়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়। ওই রিটে শিক্ষা সচিব, বুয়েটের উপাচার্যসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছিল।

রিটকারীর আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘সমাবেশ করা, রাজনৈতিক দল করা, বাকস্বাধীনতার অধিকার আমাদের সংবিধানে দেওয়া আছে। সেই সঙ্গে অরডিন্যান্সে বলা আছে, প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও প্রশাসন কিছু ব্যবস্থা নিতে পারবে। যেমন মিছিল-মিটিং নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু সংগঠন বন্ধ করার কোনো ক্ষমতা বুয়েটের নেই, সংবিধানেও নেই।’

এই আদেশের প্রতিক্রিয়ায় বুয়েটের উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার বলেছেন, ‘কোর্ট যা বলে, সেটা আমাদের মানতে হবে। কোর্টের আদেশ আমাদের শিরোধার্য। তবে সেটা করতে গেলে আমাদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সিন্ডিকেট বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।’

হাইকোর্টের আদেশের পর বিকেলে ছাত্রলীগের সমমনা একদল শিক্ষার্থী উচ্ছ্বসিত হয়ে বুয়েটের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তারা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘আজকের এই দিনে নেতা তোমায় পড়ে মনে’ এমন নানা স্লোগান দেন। এসব শিক্ষার্থী এর আগে ছাত্ররাজনীতি চালু না করার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন এবং বুয়েটে হিযবুত তাহরীর ও ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ তোলেন।

ফুল দেওয়া শেষে বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিক আলম বলেন, ‘আমরা আজকে খুবই উচ্ছ্বসিত। বলতে গেলে, আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, নিজের সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পেয়েছি। এটি আমাদের আজকে খুব বেশি খুশি করেছে। এ রায়ের মাধ্যমে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পেয়েছে। তার সাধুবাদ হিসেবে আজ আমরা এখানে জয় বাংলা স্লোগানের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছি।’

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি করার সংবিধান প্রদত্ত যে অধিকারগুলো ছিল সেটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে করতে পারিনি। তাই বুয়েট প্রশাসনের সংবিধানবিরোধী, শিক্ষাবিরোধী, মৌলিক অধিকারবিরোধী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি আইনের আশ্রয় নিয়েছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি হাইকোর্টে রিটের পর আদালত যে আদেশ দিয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধান এবং বুয়েটের যে অধ্যাদেশ রয়েছে, সেই আলোকে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করব।’

এদিকে গতকাল টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেন বুয়েটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন বিকেলে বুয়েট প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাইকোর্টের আদেশের প্রতিক্রিয়া জানান তারা। এ সময় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি ফেরার মাধ্যমে ‘অন্ধকার দিনগুলো’ যেন ফের ফিরে না আসে সেজন্য শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি আরজি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আমরা বর্তমান শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি পূর্ণ ভরসা এবং আস্থা রাখি। তাদের কাছ থেকেই আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, তারাই আমাদের প্রতিটি ক্লাসরুম, প্রতিটি ল্যাবের নায়ক। প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, লেকচারার যারাই আমাদের ক্লাস নিয়েছেন, আমরা গত চার বছরে শিক্ষার্থীরা এমনটা কখনো অনুভব করিনি যে তারাও চান পুনরায় ছাত্ররাজনীতি প্রবেশ করে সেই অন্ধকার দিনগুলো ফিরে আসুক। যারা কখনোই আমাদের অকল্যাণ চাননি এবং কখনোই চাইবেনও না। তারা সব সময়ই আমাদের সব শিক্ষার্থীর পক্ষেই ছিলেন। আমরা আমাদের বুয়েটের সব শিক্ষকের কাছে আরজি জানাচ্ছি, তারা যাতে এমন সংকটের মুহূর্তে আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আকাক্সক্ষাকে আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে লিখিত বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা আমাদের মাননীয় ভিসি স্যারের ওপর আস্থা পোষণ করি। তার সদিচ্ছা সব সময় আমাদের পক্ষেই ছিল বলেই আমরা বিশ্বাস করি। তিন দিনব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে তিনি আমাদের সব ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করেন, বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং আমাদের কথা শোনার চেষ্টা করেন। আমরা শিক্ষার্থীরা আমাদের মাননীয় ভিসি স্যারকে এই আরজি জানাচ্ছি, তিনি যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে নিয়ে আপামর বুয়েট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের যে আকাক্সক্ষা তা সব আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূরণ করেন।’

হাইকোর্টের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা বুয়েটের শিক্ষার্থীরা দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি সম্পূর্ণ সম্মান ও আস্থা রাখি। তবে বুয়েট ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ২৮ মার্চ মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে বহিরাগত রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আগমন এবং শোডাউনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালার লঙ্ঘন বলে মনে করেন বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’

বুয়েট প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ‘আমরা চাই এ বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত বিচার বিভাগে যথাযথভাবে তুলে ধরা হোক। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি না থাকার আমাদের যে দাবি তার যৌক্তিকতা নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং অটল।’

গত ২৮ মার্চ মধ্যরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি, দপ্তর সম্পাদকসহ অনেকেই বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বুয়েটশিক্ষার্থী ইমতিয়াজ রাব্বি। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর বুয়েটে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে নতুন করে রাজনীতি শুরুর পাঁয়তারা হিসেবে দেখেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যার পরিপ্রেক্ষিতেই ক্যাম্পাসে পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়া ও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় তারা পরদিন সকাল থেকেই প্রতিবাদে সরব হোন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত