সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাফিয়া ম্যানিয়া থেকে মেসি ম্যানিয়া

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১২ পিএম

আল কাপোন। বুকে কাঁপন ধরানো একটি নাম। পুরো নাম আলফনসে গ্যাব্রিয়েল কাপোন। জন্ম নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে, ১৮৯৯ সালে। পড়ালেখায় মোটেও মন বসেনি। তাই অল্প বয়সেই নাম লেখান ফাইভ পয়েন্টস গ্যাং ‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‍‍‍‍‍‌‌নামের মানহাটানভিত্তিক পাড়া মহল্লার উঠতি মাস্তান গ্রুপে। 

কিছুদিন সেখানে হাতেখড়ি নিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সেই পাড়ি জমান শিকাগোতে। ঐসময় সেখানকার মাফিয়া বস ছিলেন জন টরিও। তাঁর দলের নাম ছিল শিকাগো আউটফিট। কাপোন যোগ দেন তাঁর দেহরক্ষী হিসেবে। কয়েক বছর পর প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষে মৃত্যুমুখ থেকে কোনোমতে বেঁচে ফিরেন টরিও। ছেড়ে দেন মাফিয়াগিরি। নতুন বস বনে যান কাপোন। 

আলফনসো গ্যাব্রিয়েল কাপোন

১৯২৫ থেকে ১৯৩১-কাপোনকে মনে করা হতো আমেরিকার পরাক্রমশালী গ্যাংস্টার। ১৯২৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি উইন্ডি সিটি খ্যাত শিকাগোতে ঘটে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ‘সেইন্ট ভ্যালন্টাইন ডে ম্যাসাকার। কে ছিল এর জন্য দায়ী? প্রায় একশো বছর পরেও যে রহস্য এখনো অজানা। যদিও আঙ্গুলের নিশানা আল কাপোনের দিকেই। এই সময়টাতে কাপোনকে মানুষ চিনতো স্কারফেইস নামে, যে নামে ১৯৩২ সালে নির্মিত হয় হলিউডি গ্যাংস্টার মুভি। বলাবাহুল্য, এর কাহিনী গড়ে উঠেছিল কাপোনকে ঘিরেই। তবে স্কারফেইস বেশি জনপ্রিয়তা পায় ১৯৮৩ সালে রিমেইক হবার পর যখন নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন বিখ্যাত মার্কিন অভিনেতা আল পাসিনো।

মাফিয়া ম্যানিয়া:
শিকাগো ছিল আল কাপোনের অপরাধ জগতের সাম্রাজ্য। আর মায়ামি ছিল তাঁর শান্তির নীড়। সেখানকার অভিজাত পাম আইল্যান্ডে বানিয়েছিলেন দুর্গের মতো বিশাল এক বাগানবাড়ি। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যাবার আগের কয়েকটি বছর এখানেই কাটান আল কাপোন। বলা যায়, ঐ সময় থেকেই আটলান্টিকের পাড়ে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বন্দর নগরী মায়ামি পরিচিত হতে থাকে মাফিয়া তথা বিত্তশালীদের অন্যতম অবকাশকালীন কেন্দ্র হিসেবে। ম্যাজিক সিটি, ভাইস সিটি, গেইটওয়ে টু দ্য আমেরিকা, গেইটওয়ে টু ল্যাটিন আমেরিকা এমনকি ক্যাপিটল অব ল্যাটিন আমেরিকাও বলা হয় মায়ামিকে। তবে মাফিয়া ম্যানিয়া হিসেবে মায়ামির বিস্তার মূলত: ১৯৭০ থেকে ৮০র দশকে। মাদক নিয়ে ‘সিরিজ অব ওয়ার- ঐসময়টায় ছিল যেন নিত্য ঘটনা। যে কারণে মায়ামির সমার্থক আরেকটি নাম দাঁড়িয়ে যায় ড্রাগ ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড। মাদক ব্যবসায় শুরুতে ছিল কিউবানদের আধিপত্য। পরে যা হাতবদল হয় কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবারের কাছে। তাঁর চক্রের নাম ছিল মেডেলিন কার্টেল। মায়ামি পরিণত হয় কোকেইন, মারিজুয়ানা পাচারের প্রধান রুটে। বিশ্বের মহাসম্পদশালী অপরাধীদের একজন ছিলেন কিং অব কোকেইন খ্যাত এসকোবার। ১৯৯৩ সালে গুলিতে নিহত হবার সময় ৩০ বিলিয়ন ডলারের মালিক ছিলেন এসকোবার। এখনকার হিসেবে যা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ঐ সময়টায় মাদক কারবারে একে একে যুক্ত হয় ফ্যালকন ব্রাদার্স, গ্রিসেলডা ব্লাংকো, টনি মন্টানা, চার্লস লাকি লুসিয়ানো, মেয়ার ল্যান্সকি, ক্রিস পাসিয়েল্লোর মতো নাম। স্কারফেইস ছাড়াও নেটফ্লিক্স সিরিজ গ্রিসেল্ডা, নারকোসের পাশাপাশি ডকুমেন্টারি ‘কোকেইন কাউবয়েজ: দ্য কিংস অব মায়ামি’, মুনলাইটের মতো বেশ কিছু মুভি ও সিরিজ বানানো হয় মায়ামির মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘিরে। এছাড়া ১৯৮৪-১৯৮৯ পর্যন্ত সময়কালে ক্রাইম ড্রামা সিরিজ ‘মায়ামি ভাইস' বিশ্বের কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও ছিল জনপ্রিয়। মোদ্দা কথা মায়ামির মাদক যুদ্ধের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে কিউবাসহ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাসও।

তবে গত শতাব্দীর ৯০র দশকে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃত্বকে সাথে নিয়ে লড়াইয়ে নামে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। যার ফল- গত এক দশকে অনেকটাই কমে এসেছে অপরাধ।

মেসি ম্যানিয়া:
বছর কয়েক আগেও সকার (যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলকে সকার বলা হয়) মায়ামি তো বটেই গোটা আমেরিকাতেই অতোটা জনপ্রিয় ছিল না। আমেরিকার মেজর লিগ সকার (এমএলএস) নিয়ে যতোটা না, তার চেয়ে বেশি উন্মাদনা রাগবি, বাস্কেট কিংবা বেসবল ঘিরেই। মায়ামিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রাগবির সেরা দল মায়ামি ডলফিনস, বাস্কেটবলে মায়ামি হিট কিংবা (রাগবি), বেসবলে মায়ামি মারলিনসের খেলার দিন তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না স্টেডিয়ামগুলোতে। সব ছাপিয়ে মায়ামির খেলাপাগল দর্শক এখন বুঁদ ইন্টার মায়ামি সিএফে( স্প্যানিশ ভাষায় ক্লাব ডি ফুটবল)। 

মায়ামিতে মেসি মেসি রব শুধু

অথচ দলটির জন্মই মাত্র বছর ছয়েক আগে ২০১৮ সালে। মেজর লিগ সকারে ২৫তম ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে দলটির যাত্রা শুরু ২০২০ নাগাদ। শুরুর কয়েকটা বছর লীগের তলানির দিকেই ছিল যার অবস্থান। ২০২৩ সালেই খেলা ২২ ম্যাচে জয় মাত্র ৫টিতে। সব মিলে ২২ গোলের বিপরীতে হজম করেছিল ৩৬টি। এমএসএল-এর ইস্টার্ন কনফারেন্সের একদম নীচে ছিল ইন্টার মায়ামির অবস্থান। তবে হঠাৎ-ই যেন ভোজবাজির মতো পাল্টে যেতে থাকে সবকিছু। আর এসব কিছুরই পরিবর্তনের রূপকার লিও মেসি। ফরাসি ক্লাব পিএসজি ছেড়ে নানা জল্পনা-কল্পনাকে তুড়ি মেরে ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই মেসি যোগ দেন ইন্টার মায়ামিতে। যার মালিকানায় ডেভিড বেকহামের মতো একসময়ের মহাতারকার নাম থাকলেও তখন পর্যন্তও বিশ্ব ফুটবলের অখ্যাত-আনাড়ি ক্লাব ছিল ইন্টার মায়ামি। মেসি খেলা শুরুর পর ঐ বছরই খেলা ১০ ম্যাচের ৬টিতেই জয়, ড্র বাকি চারটিতে। প্রথম নয় ম্যাচেই গোল করেন আর্জেন্টাইন এই জীবন্ত কিংবদন্তী। শুধু তাই নয়, দলটির ইতিহাসে প্রথম কোনো শিরোপা লিগস কাপ আসে মেসির হাত ধরেই। আর চলতি মৌসুমে (২৩ মার্চ পর্যন্ত) ইস্টার্ন কনফারেন্সে খেলা ৬ ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতে জয়, ২টি হার এবং ১টি ড্রয়ে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে অবস্থান ইন্টার মায়ামির। যদিও ইনজুরির কারণে সবশেষ কয়েকটি ম্যাচে খেলতে পারেননি মেসি। 

এবার নজর দেয়া যাক মেসির প্রভাবে কীভাবে পাল্টে যেতে থাকে খেলার বাইরে ইন্টার মায়ামি তথা মায়ামির সার্বিক চালচিত্র। ২০২৩ সালের প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ইন্টার মায়ামির ফলোয়ার ছিল প্রায় ১০ লাখের মতো। মেসি যোগ দেয়ার খবরের মাত্র চার ঘন্টার মধ্যেই তা বেড়ে যায় ৩ লাখ এবং চুক্তি সই করার পর তা দাঁড়ায় ৬০ লাখের মতো। গত বছরের শেষ দিকে এই সংখ্যাটি ছিল এক কোটি ৬০ লাখের মতো। এতো এতো ফলোয়ার আমেরিকার বাস্কেটবল, রাগবি কিংবা বেসবল-কোনো দলেরই নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন মেসি

এতো গেলো ফলোয়ারের কথা। ইন্টার মায়ামির প্রতিটি খেলার দিনের টিকিটের দামই থাকে আকাশছোঁয়া। প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে যা ছিল ১০০০ গুণ বেশি। ইন্টার মায়ামির গোলাপি রংয়ের বিশেষ করে মেসির ১০ নম্বরধারি জার্সির বিক্রিও বাড়ে বহু বহুগুণ। বেড়েছে ইন্টার মায়ামি মনোগ্রাম সংবলিত টুপি, পতাকাসহ আরো নানা পণ্যের বেচা-বিক্রিও। এক হিসাবে দেখা গেছে, যোগদানের প্রথম ২৪ ঘন্টায় মেসি লেখা জার্সির বিক্রি ছিল দল পরিবর্তনের পর যে কোনো খেলায়, যে কোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। 

শুধু ইন্টার মায়ামি দলটির মূল্যই ছয় কোটি থেকে বেড়ে দেড়শো’ কোটি হবার প্রত্যাশা করা হয়েছিল মেসি যোগদানের পর। যা কিনা এমএসএল-এর সবচেয়ে দামি। দলটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা বাড়ে ১২০০ গুণ। এ বছর ইন্টার মায়ামির আয় সাড়ে ২২ কোটি ছাড়িয়ে যাবার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এমএসএল-এর খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারী অ্যাপল টিভি প্লাসের সাবস্ক্রাইবার এক লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায় মেসি মায়ামিতে যোগদানের চুক্তি সই করবার পরপরই। মায়ামি লাগোয়া কাউন্টি ফোর্ট লডারডেলে ইন্টার মায়ামির নিজস্ব স্টেডিয়ামে দর্শকের সংকুলান না হওয়ায় এখন কাজ চলছে বেশি ধারণক্ষমতার আরেকটি স্টেডিয়াম নির্মাণের। ইন্টার মায়ামি ছাড়াও মোটা অংকের আয় করতে শুরু করেছে মেজর লিগ সকারও। 

বিশ্বকাপ জয় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে মেসি

মেসি আসার পর বড়ো ধরণের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে মায়ামির সার্বিক অর্থনীতিতেও। মেসি যে এলাকায় বাড়ি কিনেছেন তার আশপাশে তো বটেই গোটা মায়ামির আবাসন খাত রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। দাম বেড়েছে বহুগুণ। বাড়ছে পর্যটক। ধরা হচ্ছে, মায়ামির পর্যটন খাতে আয় বাড়বে ৪০ কোটি ডলার। অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আকর্ষনীয় পর্যটন শহর হিসেবে বিশ্বে মায়ামি এমনিতেই পরিচিত একটি নাম। মেসি আসার পর যা বেড়েছে আরো। আমেরিকা তো বটেই বিশ্বের নামকরা প্রযুক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নজর এখন মায়ামির দিকেই।

সব মিলিয়ে বলাই যায় রূপ বদলেছে মায়ামির। রক্তে মাখা রাস্তা’র মায়ামি এখন রৌদ্র করোজ্জল সৈকত আর আকাশছোঁয়া অট্টালিকার শহর। প্রাণবন্ত এক কসমোপলিটান হাব। শুধু পর্যটন-ই নয়, শিল্পকলা আর সংস্কৃতি চর্চায়ও মায়ামি এখন অনেক বেশি নজর কাড়ছে। মেসির মতো মহাতারকার ইন্টার মায়ামিতে যোগদানে মায়ামির ললাটে এরি মধ্যে যেন সেঁটে গেছে আরো সমৃদ্ধ নগরীর তকমা। বিশ্বের স্পটলাইটের আলোকছটায় দিনদিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে মায়াময় মায়ামি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত