রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাফিয়া ম্যানিয়া থেকে মেসি ম্যানিয়া

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৫৭ এএম

আল কাপোন। বুকে কাঁপন ধরানো একটি নাম। পুরো নাম আলফনসে গ্যাব্রিয়েল কাপোন। জন্ম নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে ইতালীয় অভিবাসী পরিবারে, ১৮৯৯ সালে। পড়ালেখায় মোটেও মন বসেনি। তাই অল্প বয়সেই নাম লেখান ফাইভ পয়েন্টস গ্যাং নামের মানহাটানভিত্তিক পাড়া-মহল্লার উঠতি মাস্তান গ্রুপে।

কিছুদিন সেখানে হাতেখড়ি নিয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সেই পাড়ি জমান শিকাগো।  

ওই সময় সেখানকার মাফিয়া বস ছিলেন জন টরিও। তার দলের নাম ছিল শিকাগো আউটফিট। কাপোন যোগ দেন তার দেহরক্ষী হিসেবে। কয়েক বছর পর প্রতিপক্ষ গ্রুপের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষে মৃত্যুমুখ থেকে কোনোমতে বেঁচে ফেরেন টরিও। ছেড়ে দেন মাফিয়াগিরি। নতুন বস বনে যান কাপোন।

১৯২৫ থেকে ১৯৩১কাপোনকে মনে করা হতো আমেরিকার পরাক্রমশালী গ্যাংস্টার। ১৯২৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি উইন্ডি সিটি খ্যাত শিকাগোয় ঘটে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর ‘সেইন্ট ভ্যালন্টাইনস ডে ম্যাসাকার। কে ছিল এর জন্য দায়ী? প্রায় ১০০ বছর পরও যে রহস্য এখনো অজানা। যদিও আঙুলের নিশানা আল কাপোনের দিকেই। এই সময়টাতে কাপোনকে মানুষ চিনত স্কারফেইস নামে, যে নামে ১৯৩২ সালে নির্মিত হয় হলিউডি গ্যাংস্টার মুভি। বলাবাহুল্য, এর কাহিনি গড়ে উঠেছিল কাপোনকে ঘিরেই। তবে স্কারফেইস বেশি জনপ্রিয়তা পায় ১৯৮৩ সালে রিমেইক হওয়ার পর যখন নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন বিখ্যাত মার্কিন অভিনেতা আল পাসিনো।

মাফিয়া ম্যানিয়া : শিকাগো ছিল আল কাপোনের অপরাধ জগতের সাম্রাজ্য। আর মায়ামি ছিল তার শান্তির নীড়। সেখানকার অভিজাত পাম আইল্যান্ডে বানিয়েছিলেন দুর্গের মতো বিশাল এক বাগানবাড়ি। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগের কয়েকটি বছর এখানেই কাটান আল কাপোন। বলা যায়, ওই সময় থেকেই আটলান্টিকের পাড়ে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের বন্দর নগরী মায়ামি পরিচিত হতে থাকে মাফিয়া তথা বিত্তশালীদের অন্যতম অবকাশকালীন কেন্দ্র হিসেবে। ম্যাজিক সিটি, ভাইস সিটি, গেটওয়ে টু দ্য আমেরিকা, গেটওয়ে টু লাতিন আমেরিকা, এমনকি ক্যাপিটল অব লাতিন আমেরিকাও বলা হয় মায়ামিকে। তবে মাফিয়া ম্যানিয়া হিসেবে মায়ামির বিস্তার মূলত ১৯৭০ থেকে ৮০-এর দশকে। মাদক নিয়ে ‘সিরিজ অব ওয়ার’ ওই সময়টায় ছিল যেন নিত্য ঘটনা। যে কারণে মায়ামির সমার্থক আরেকটি নাম দাঁড়িয়ে যায় ড্রাগ ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড। মাদক ব্যবসায় শুরুতে ছিল কিউবানদের আধিপত্য। পরে যা হাতবদল হয় কলম্বিয়ান ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবারের কাছে। তার চক্রের নাম ছিল মেডেলিন কার্টেল। মায়ামি পরিণত হয় কোকেইন, মারিজুয়ানা পাচারের প্রধান রুটে। বিশে^র মহাসম্পদশালী অপরাধীদের একজন ছিলেন কিং অব কোকেইন খ্যাত এসকোবার। ১৯৯৩ সালে গুলিতে নিহত হওয়ার সময় ৩০ বিলিয়ন ডলারের মালিক ছিলেন এসকোবার। এখনকার হিসাবে যা প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ওই সময়টায় মাদক কারবারে একে একে যুক্ত হয় ফ্যালকন ব্রাদার্স, গ্রিসেলডা ব্লাংকো, টনি মন্টানা, চার্লস লাকি লুসিয়ানো, মেয়ার ল্যান্সকি, ক্রিস পাসিয়েল্লোর মতো নাম। স্কারফেইস ছাড়াও নেটফ্লিক্স সিরিজ গ্রিসেলডা, নারকোসের পাশাপাশি ডকুমেন্টারি ‘কোকেইন কাউবয়েজ : দ্য কিংস অব মায়ামি’, মুনলাইটের মতো বেশ কিছু মুভি ও সিরিজ বানানো হয় মায়ামির মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘিরে। এ ছাড়া ১৯৮৪-৮৯ পর্যন্ত সময়কালে ক্রাইম ড্রামা সিরিজ ‘মায়ামি ভাইস’ বিশ্বের কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও ছিল জনপ্রিয়। মোদ্দাকথা, মায়ামির মাদক যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিউবাসহ লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাসও।

তবে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় কমিউনিটি নেতৃত্বকে সঙ্গে নিয়ে লড়াইয়ে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যার ফল গত এক দশকে অনেকটাই কমে এসেছে অপরাধ।

মেসি ম্যানিয়া: বছর কয়েক আগেও সকার (যক্তরাষ্ট্রে ফুটবলক সকার বলা হয়) মায়ামি তো বটেই, গোটা আমেরিকাতেই অতটা জনপ্রিয় ছিল না। আমেরিকার মেজর লিগ সকার (এমএলএস) নিয়ে যতটা না, তার চেয়ে বেশি উন্মাদনা রাগবি, বাস্কেট কিংবা বেসবল ঘিরেই। মায়ামিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। রাগবির সেরা দল মায়ামি ডলফিনস, বাস্কেটবলে মায়ামি হিট কিংবা (রাগবি), বেসবলে মায়ামি মারলিনসের খেলার দিন তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না স্টেডিয়ামগুলোয়। সব ছাপিয়ে মায়ামির খেলাপাগল দর্শক এখন বুঁদ ইন্টার মায়ামি সিএফে (স্প্যানিশ ভাষায় ক্লাব ডি ফুটবল)।

অথচ দলটির জন্মই মাত্র বছর ছয়েক আগে, ২০১৮ সালে। মেজর লিগ সকারে ২৫তম ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে দলটির যাত্রা শুরু ২০২০ নাগাদ। শুরুর কয়েকটা বছর লিগের তলানির দিকেই ছিল যার অবস্থান। ২০২৩ সালেই খেলা ২২ ম্যাচে জয় মাত্র ৫টিতে। সব মিলিয়ে ২২ গোলের বিপরীতে হজম করেছিল ৩৬টি। এমএসএলের ইস্টার্ন কনফারেন্সের একদম নিচে ছিল ইন্টার মায়ামির অবস্থান। তবে হঠাৎই যেন ভোজবাজির মতো পাল্টে যেতে থাকে সবকিছু। আর এই সবকিছুরই পরিবর্তনের রূপকার লিও মেসি। ফরাসি ক্লাব পিএসজি ছেড়ে নানা জল্পনা-কল্পনাকে তুড়ি মেরে ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই মেসি যোগ দেন ইন্টার মায়ামিতে। যার মালিকানায় ডেভিড বেকহামের মতো একসময়ের মহাতারকার নাম থাকলেও তখন পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলের অখ্যাত-আনাড়ি ক্লাব ছিল ইন্টার মায়ামি। মেসি খেলা শুরুর পর ওই বছরই খেলা ১০ ম্যাচের ছয়টিতেই জয়, ড্র বাকি চারটিতে। প্রথম ৯ ম্যাচেই গোল করেন আর্জেন্টাইন এই জীবন্ত কিংবদন্তি। শুধু তা-ই নয়, দলটির ইতিহাসে প্রথম কোনো শিরোপা লিগস কাপ আসে মেসির হাত ধরেই। আর চলতি মৌসুমে (২৩ মার্চ পর্যন্ত) ইস্টার্ন কনফারেন্সে খেলা ৬ ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতে জয়, দুটি হার এবং একটি ড্রয়ে পয়েন্ট তালিকার দুইয়ে অবস্থান ইন্টার মায়ামির। যদিও ইনজুরির কারণে সবশেষ কয়েকটি ম্যাচে খেলতে পারেননি মেসি।

এবার নজর দেওয়া যাক মেসির প্রভাবে কীভাবে পাল্টে যেতে থাকে খেলার বাইরে ইন্টার মায়ামি তথা মায়ামির সার্বিক চালচিত্র। ২০২৩ সালের প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ইন্টার মায়ামির ফলোয়ার ছিল প্রায় ১০ লাখের মতো। মেসি যোগ দেওয়ার খবরের মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যেই তা বেড়ে যায় ৩ লাখ এবং চুক্তি সই করার পর তা দাঁড়ায় ৬০ লাখের মতো। গত বছরের শেষ দিকে সংখ্যাটি ছিল ১ কোটি ৬০ লাখের মতো। এত এত ফলোয়ার আমেরিকার বাস্কেটবল, রাগবি কিংবা বেসবলকোনো দলেরই নেই।

এ তো গেল ফলোয়ারের কথা। ইন্টার মায়ামির প্রতিটি খেলার দিনের টিকিটের দামই থাকে আকাশছোঁয়া। প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতে যা ছিল ১ হাজার গুণ বেশি। ইন্টার মায়ামির গোলাপি রঙের, বিশেষ করে মেসির ১০ নম্বরধারী জার্সির বিক্রিও বাড়ে বহুগুণ। বেড়েছে ইন্টার মায়ামি মনোগ্রামসংবলিত টুপি, পতাকাসহ নানা পণ্যের বেচা-বিক্রিও। এক হিসাবে দেখা গেছে, যোগদানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মেসি লেখা জার্সির বিক্রি ছিল দল পরিবর্তনের পর যেকোনো খেলায়, যেকোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।

শুধু ইন্টার মায়ামি দলটির মূল্যই ছয় কোটি থেকে বেড়ে দেড় শো কোটি হওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল মেসি যোগদানের পর; যা কিনা এমএসএলের সবচেয়ে দামি। দলটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা বাড়ে ১ হাজার ২০০ গুণ। এ বছর ইন্টার মায়ামির আয় সাড়ে ২২ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এমএসএলের খেলা সরাসরি সম্প্রচারকারী অ্যাপল টিভি প্লাসের সাবস্ক্রাইবার ১ লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায় মেসি মায়ামিতে যোগদানের চুক্তি সই করার পরপরই। মায়ামি লাগোয়া কাউন্টি ফোর্ট লডারডেলে ইন্টার মায়ামির নিজস্ব স্টেডিয়ামে দর্শকের সংকুলান না হওয়ায় এখন কাজ চলছে বেশি ধারণক্ষমতার আরেকটি স্টেডিয়াম নির্মাণের। ইন্টার মায়ামি ছাড়াও মোটা অঙ্কের আয় করতে শুরু করেছে মেজর লিগ সকারও।

মেসি আসার পর বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে মায়ামির সার্বিক অর্থনীতিতেও। মেসি যে এলাকায় বাড়ি কিনেছেন তার আশপাশে তো বটেই, গোটা মায়ামির আবাসন খাত রাতারাতি ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। দাম বেড়েছে বহুগুণ। বাড়ছে পর্যটক। ধরা হচ্ছে, মায়ামির পর্যটন খাতে আয় বাড়বে ৪০ কোটি ডলার। অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আকর্ষণীয় পর্যটন শহর হিসেবে বিশ্বে মায়ামি এমনিতেই পরিচিত একটি নাম। মেসি আসার পর যা বেড়েছে আরও। আমেরিকা তো বটেই, বিশ্বের নামকরা প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নজর এখন মায়ামির দিকেই।

সব মিলিয়ে বলাই যায়, রূপ বদলেছে মায়ামির। রক্তে মাখা রাস্তার মায়ামি এখন রৌদ্র করোজ্জ্বল সৈকত আর আকাশছোঁয়া অট্টালিকার শহর। প্রাণবন্ত এক কসমোপলিটান হাব। শুধু পর্যটনই নয়, শিল্পকলা আর সংস্কৃতি চর্চায়ও মায়ামি এখন অনেক বেশি নজর কাড়ছে। মেসির মতো মহাতারকার ইন্টার মায়ামিতে যোগদানে মায়ামির ললাটে এরই মধ্যে যেন সেঁটে গেছে আরও সমৃদ্ধ নগরীর তকমা। বিশ্বের স্পটলাইটের আলোকছটায় দিন দিন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে মায়াময় মায়ামি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত