রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চেয়ারম্যানে ডুবছে কারিগরি বোর্ড

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০:১৭ এএম

শিক্ষা খাতে সরকার সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বিষয়ে। এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের। কিন্তু এ বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খানের নজর অন্যদিকে। কারিগরি শিক্ষার যাই হোক, তিনি ব্যস্ত টাকা কামাতে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তন, অনুমোদন, পাঠের বিষয় খোলাসহ কোনো কাজই তাকে টাকা না দিয়ে হয় না। তাকে কোনো অনুষ্ঠানে নিতে গেলেও টাকা লাগে। প্রশিক্ষণ-কর্মশালায় উপস্থিত না থেকেও তিনি সম্মানী নেন। তার অনিয়মে ডুবতে বসেছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।

সূত্র জানায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট (এনপিআই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবকে অভিযোগ জানিয়েছে। অভিযোগটি হচ্ছে, তাদের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে দুই দফায় ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নামে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। এর জন্য দুই সদস্যবিশিষ্ট দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততার সঙ্গে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। রিপোর্ট পেয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

এনপিআইয়ের রেজিস্ট্রার মো. সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের আয়তন বাড়ানোর জন্য আগের ঠিকানা মহাখালী থেকে বর্তমান ঠিকানা বনশ্রী, খিলগাঁওয়ে যাওয়ার জন্য গত বছর ৪ ডিসেম্বর বোর্ডে আবেদন করা হয়। এর জন্য বোর্ড চেয়ারম্যান ২০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। এ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে শুরুতে তিনি কালক্ষেপণ করেন এবং পরে অনুমোদন দেবেন না বলে জানান। এরপর আমাদের পাশের পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে সরিয়ে দূরের কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেন। আমরা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাকে ১০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হই। তখন তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে প্রাথমিক অনুমোদন দেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আরও ১৫ লাখ টাকা চান। আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে টিকিয়ে রাখার জন্য চাপের মুখে তাকে আরও ১০ লাখ টাকা দিই। এরপর অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে পেতে হলে আরও ৫ লাখ টাকা দিতে হবে। তা না দেওয়ায় এখনো আমাদের প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একটি পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। পর্ষদ সদস্য সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর বোর্ড চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে সচিবের কাছে আরেকটি অভিযোগ দিয়েছেন। তাতে বোর্ড চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুফি ফারুক ইবনে আবুবকরের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনাবিষয়ক আইন, নীতিমালা ও গেজেট অমান্য করে নিজের খুশিমতো চালাচ্ছেন। পরিচালনা পর্ষদ আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাসে একবার বোর্ডসভা হওয়ার কথা। কিন্তু গত আট মাসে কোনো সভা ডাকা হয়নি। মনে করিয়ে দেওয়ার পরও তিনি এ ব্যাপারে কান দেননি।’

চিঠিতে বলা হয়, ‘পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও দায়িত্ব পালনে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কৌশলে কালক্ষেপণ করেন। ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার পরিবারের লোকজনের বিশেষ সম্পর্ক বিষয়ে জনশ্রুতি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। তিনি আলোচনা যাই হোক, নিজের ইচ্ছেমতো রেজল্যুশন তৈরি করেন এবং অনুমোদনের জন্য চাপ দেন। বোর্ড ও অর্থ কমিটির সভার বিবরণীতে তিনি এ কাজ অনেকবার করেছেন। চেয়ারম্যান তার অফিশিয়াল নম্বরের ফোন রিসিভ করেন না। তার ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করতে বাধ্য করেন।’

সুফি ফারুক বলেন, ‘চেয়ারম্যানের অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা ও একগুঁয়েমির কারণে কারিগরি শিক্ষা খাত এগিয়ে যাওয়ার বদলে প্রতিনিয়ত পেছাচ্ছে। পলিটেকনিকসহ কারিগরি শিক্ষার মেরুদ- হিসেবে পরিচিত ডিসিপ্লিনগুলোতে ভর্তি প্রতি বছরই আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।’

গত ১৩ জানুয়ারি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে বড় ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। চেয়ারম্যানের মেয়ে আনিকা সিদ্দিকা এনি কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স অফিসার ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে আবেদন করেন। চেয়ারম্যানের মেয়ের জামাই মো. আবির রহমান সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং উপপরিচালক হিসাব ও নিরীক্ষা পদে আবেদন করেন। আর চেয়ারম্যানের ছেলে লাবিব-ই-আকবর আবেদন করেন সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে। তাদের সঙ্গে আরও কিছু প্রার্থীর চাকরি অনেকটা নিশ্চিত বলে কারিগরি বোর্ডে কথা চাউর হয়েছে। বড় অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। এমন অভিযোগও রয়েছে, চেয়ারম্যান পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তিতে কিছু পদের শর্ত অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন।

সূত্র জানায়, কারিগরি বোর্ড চেয়ারম্যানকে কোনো বেসরকারি পলিটেকনিকের নবীনবরণসহ কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিতে গেলে কত সম্মানী দেওয়া হবে তা জানাতে হয়। লাখ টাকার নিচে সম্মানী দিলে তিনি অনুষ্ঠানে যেতে রাজি হন না এবং সম্মানীর টাকা তাকে আগেই দিতে হয়। বোর্ডের সব প্রশিক্ষণ-কর্মশালার জন্য তাকে সম্মানী দিতে হয়। এমনকি তিনি অনুপস্থিত থাকলেও সম্মানী নেন। অফিসে এসে তিনি ব্যাকডেটে নথিপত্রে স্বাক্ষর করেন। বোর্ডে সনদ বাণিজ্যও চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা দিলে শিক্ষার্থীদের নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া আর না দিলে ফেল করিয়ে দেওয়া কারিগরি বোর্ডে বড় কোনো ব্যাপার নয়। এ কথা জেনেও চুপ থাকেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান।

চিফ ইনস্ট্রাক্টর মো. আবু তারিক সিদ্দিকী কারিগরি বোর্ডে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি চেয়ারম্যানের সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। তিনি বোর্ডে সহকারী বিশেষজ্ঞ হিসেবে পদায়িত হলেও তাকে বোর্ডের অভ্যন্তরীণ আদেশে পরিদর্শন বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগের প্রকিউরমেন্ট শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সম্প্রতি প্রকিউরমেন্ট অফিসার ছুটিতে গেলে তারিক সিদ্দিকীকে সে পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব পালনকালে অফিসে ‘প্যানথম’ নামক প্রিন্টার ও বেনামি কোম্পানির ফটোকপিয়ার সরবরাহ করা হয়। এতে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার কেন্দ্র করিনি বলেই এ অভিযোগ। আমি সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে যাই না। গেলে শিডিউলড হারে সম্মানী নিই। আবার অনেক সময় নিই না। প্রশিক্ষণ-কর্মশালায় যেদিন থাকি না সেদিন সম্মানী নিই না। সাধারণত থাকার চেষ্টা করি।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, অভিযোগ সামনাসামনি করা উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত