মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২১ এএম

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য সরবরাহে সহযোগিতা না করে তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগকে বাধাগ্রস্ত করেছেন শেরপুরের নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া উম্মুল বানিন। আর এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে তথ্য কমিশন। নকলার ইউএনও কার্যালয়ে তথ্য চাইতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড পাওয়া দেশ রূপান্তরের নকলা উপজেলা সংবাদদাতা শফিউজ্জামান রানাকে অসহযোগিতার অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে তথ্য কমিশনের কার্যালয়ে যান ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন। কমিশনের কার্যালয়ের ষষ্ঠতলার এজলাস কক্ষে ব্যাখ্যা গ্রহণ ও শুনানি শেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় কমিশন।

গত ৫ মার্চ নকলার ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা একটি সরকারি প্রকল্পের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেছিলেন শফিউজ্জামান রানা। এ সময় আবেদন প্রাপ্তির অনুলিপি চান তিনি। তবে আবেদন প্রাপ্তির অনুলিপি দিতে গড়িমসির অভিযোগ করেন রানা। একপর্যায়ে অসদাচরণের অভিযোগে ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিনের নির্দেশনায় উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিহাবুল আরিফের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে রানাকে দণ্ডবিধির দুটি ধারায় ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তাকে পুলিশ ডেকে সাজা পরোয়ানার মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় দেশ জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ধারাবাহিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। দেশে এবং বিদেশের গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন রানার মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দেয়। এমন পরিস্থিতিতে রানার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা অনুসন্ধানে গত ৯ মার্চ তথ্য কমিশনের সদস্য সাবেক জেলা ও দায়রা জজ শহিদুল আলম শেরপুরে যান। তিনি কারাগারে থাকা রানাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেন।

অন্যদিকে সাজার বিরুদ্ধে আপিল ও জামিনের পর গত ১২ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পান রানা। ১৬ এপ্রিল শেরপুর জেলা প্রশাসনে আপিলের ওপর শুনানির দিন নির্ধারিত আছে। রানাকে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য দিতে অসহযোগিতার অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে গত ২২ মার্চ তথ্য কমিশন নকলার ইউএনওকে তলব করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল তিনি তথ্য কমিশনের কার্যালয়ে যান।

সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে কমিশনের কার্যালয়ে আসেন সাদিয়া উম্মুল বানিন। ষষ্ঠতলার অতিথি কক্ষে ৪০ মিনিটের মতো অবস্থান করেন। এরপর বেলা পৌনে ১২টার দিকে এজলাকক্ষে তার ডাক পড়ে। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা তখন বলেন, শুনানি ও কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি গণসংযোগ শাখা থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রায় আধঘণ্টা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুনানি হয়। সাদিয়া উম্মুল বানিনকে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার শুনানিতে প্রধান তথ্য কমিশনার ড. আবদুল মালেকসহ দুই সদস্য শহীদুল আলম ঝিনুক ও মাসুদা ভাট্টি উপস্থিত ছিলেন। দুপুর পৌনে ১টার দিকে এজলাস কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন সাদিয়া উম্মুল বানিন। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান। দ্রুত লিফটে উঠে পড়েন। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন উপস্থিত সাংবাদিকদের লিফটে উঠতে বাধা দেন। তবে কয়েকজন সাংবাদিক দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ইউএনওকে প্রশ্ন করেন। এ সময় ইএনও সাদিয়া উম্মুল বানিন হাতে থাকা ফাইল দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করেননি। যা বলার কমিশনকে বলেছি। তিনি (শফিউজ্জামান রানা) অপরাধ করেছেন। ফাইল নিয়ে টানাটানি করেছেন। একজন নারী কর্মকর্তাকে উত্ত্যক্ত করেছেন। এজন্যই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে।’

ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার সময় শফিউজ্জামান রানার এসএসসিপড়ুয়া ছেলে উপস্থিত ছিল। কোনো ব্যক্তি তার সন্তানের সামনে কোনো নারীকে উত্ত্যক্তের চেষ্টা করতে পারেন কি না এমন প্রশ্নে নিরুত্তর থাকেন সাদিয়া উম্মুল বানিন। শফিউজ্জামান রানা ইউএনও কার্যালয়ে ফাইল টানাটানি করেছেন, উত্ত্যক্ত করেছেন এমন কোনো প্রমাণ বা কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা এ সংক্রান্ত কোনো ফুটেজ আছে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দেননি তিনি। একপর্যায়ে বলেন, ‘প্রমাণ আছে।’ সাংবাদিকরা তখন বলেন, ‘তাহলে প্রমাণ দেখাচ্ছেন না কেন’ এমন প্রশ্নে আর কোনো কথা বলেননি সাদিয়া উম্মুল বানিন। একপর্যায়ে দ্রুত তিনি কার্যালয়ের সামনে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠে পড়েন।

নাম না প্রকাশের শর্তে কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুনানির সময় ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিনকে এজলাসের বাম দিকে থাকা ডায়াসে ডেকে নেওয়া হয়। ঘটনার পর তথ্য কমিশনের অনুসন্ধানের সময় নেওয়া স্থানীয় বিভিন্নজনের বক্তব্য তাকে পড়ে শোনানো হয়। কমিশনের কর্মকর্তারা তাকে বলেন, শফিউজ্জামান রানার বিরুদ্ধে নকলার ইউএনও কার্যালয়ের যে নারীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই নারী কর্মী কমিশনের অনুসন্ধানের জবানবন্দিতে বলেননি যে, তাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের যে অভিযোগ তিনি (সাদিয়া উম্মুল বানিন) এনেছেন, মুক্তিযোদ্ধার জবানবন্দিতে তা আসেনি। এ সময় কমিশনারদের প্রশ্নের জবাবে সাদিয়া উম্মুল বানিন বলেন, তিনি নির্দোষ এবং তিনি কোনো অন্যায় করেননি। একপর্যায়ে শুনানি শেষ করে ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়।

দুপুর ১টার পর কমিশনের কার্যালয় থেকে বলা হয়, তথ্য সরবরাহে অসহযোগিতার অভিযোগে ইউএনও সাদিয়া উম্মুল বানিনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে তথ্য কমিশন। তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইউএনও কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কমিশনের তরফে কী প্রশ্ন করা হয়েছে সেসব বিষয়ে প্রধান তথ্য কমিশনার বা অন্য দুই কমিশনার কোনো বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ঝিনুক বলেন, ‘আমরা তাকে ডেকেছিলাম। তার ব্যাখ্যা আমরা শুনেছি। ওখানে অন্য কী বিষয় (ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা) ঘটেছে সে বিষয়ে আমাদের কোনো তদন্ত বা বক্তব্য নেই। আমরা শুধু দেখেছি তিনি (সাদিয়া উম্মুল বানিন) তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়া ব্যাক্তিকে অসহযোগিতা করেছেন কি না।’

এরপর কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা লিটন কুমার প্রামাণিক সরবরাহিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ৭ মার্চ প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কলামে ‘তথ্য চেয়ে আবেদন করে দেশ রূপান্তরের সাংবাদিক জেলে’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি তথ্য কমিশন পর্যালোচনা করে স্বতঃপ্রণোদিত অনুসন্ধান করে। আজকের (গতকাল) শুনানিতে নকলার ইউএনওর বক্তব্য শুনেছে কমিশন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত